বুধবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮

নিঝুম দ্বীপ, চিত্রা হরিণের আর্তনাদ

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০১৫, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

Deerনিঝুম দ্বীপের ৪০ হাজার চিত্রা হরিণ বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছে। এসব হরিণের আশ্রয় ও খাদ্য সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। হরিণের খাদ্য সংকট দূরীকরণের লক্ষ্যে যে নতুন বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তা জোয়ারে ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে তীব্র খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হরিণের খাদ্য নিশ্চয়তা ও যোগান জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপটির অপরূপ সবুজ বনানী কেওড়া, বাইন, গেওয়াসহ নানা প্রজাতির সারি সারি বৃক্ষরাজি। দ্বীপ জুড়ে বিচিত্র রকমের পাখির কল-কাকলি। তারই মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে মায়াবী চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণ। পাশে বিশাল সমুদ্র সৈকত ইতোমধ্যে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি নিঝুম দ্বীপ ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। সত্তর দশকের ৪ জোড়া হরিণ থেকে বংশবৃদ্ধি করে আজ প্রায় ৪০ হাজার হয়েছে।

১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৪ জোড়া হরিণ নিয়ে ঘুরতে আসেন নিঝুম দ্বীপে। তিনি হরিণগুলো ছেড়ে দেন দ্বীপে। তারপর ক্রমশ সেখানে হরিণের সংখ্যা বাড়েই চলেছে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, নিঝুম দ্বীপের একটি মা হরিণ বছরে দু’বার কমপক্ষে দুটি করে মোট ৪টি বাচ্চা জন্ম দেয়। বন কর্মকর্তারা হিসাব করে দেখেছেন বর্তমানে নিঝুমদ্বীপে প্রায় ৪০ হাজারের মতো হরিণ রয়েছে। এখান থেকে প্রতিবছর ২০ হাজার হরিণ রপ্তানি করা সম্ভব।

কিন্তু হরিণ শিকারিচক্র ও ঘূর্ণিঝড় কোমেনসহ প্রতিনিয়তই প্রাকৃতিক দুর্যোগে হুমকির মুখে নিঝুম দ্বীপের চিত্রা হরিণগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে অধিক জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে নিঝুমদ্বীপের চিত্রা হরিণের আশ্রয় ও খাদ্য সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। হরিণের খাদ্য সঙ্কট দূরকরণের লক্ষ্যে যে নতুন বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তা জোয়ারে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে এ খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

সম্পদ আর সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ বঙ্গোবাসাগরে জেগে ওঠা একটি রহস্যময়ী দ্বীপ নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপের এই অসীম সৌন্দর্য্যের মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে এ দ্বীপ সফরে এসে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করলেও দীর্ঘ একযুগে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট নোয়াখালী জেলার বিছিন্ন উপজেলা হাতিয়ার বিছিন্ন ইউনিয়ন ১১নং ইউনিয়নের নিঝুম দ্বীপ। এ ইউনিয়নের ও অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে নিঝুম দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দ্বীপটি আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে নিঝুমদ্বীপের সংরক্ষিত বন দেওয়ালের মতো জনজীবন ও প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করে আসছে। নিঝুমদ্বীপের সীমানা চিহ্নিত না করায় বন উজাড়সহ ভূমিদস্যুরা ইতোমধ্যে দখল করে নিয়েছে শত শত একর বনভূমি।

রাতের অন্ধকারে বনে ঢুকে জাল পেতে নির্বিচারে নিধন করছে চিত্রা হরিণ। সংকুচিত করছে জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বন, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ৪০ হাজার  চিত্রা হরিণের বিচরণক্ষেত্র। দ্বীপের সৌন্দর্য্য ও হরিণ রক্ষার্থে বন সংক্ষরণ অবশ্যই প্রয়োজন। আর সেই বন নষ্ট ও উজাড় হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় বন বিভাগের যোগসাজসেই বন নষ্ট হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকার কাঠ পাচার করছে পাচারকারীরা। তাছাড়া বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় হলে হরিণ রাখার জন্য নেই উঁচু কোনো স্থান। গরম কালে হরিণের খাওয়ার জন্য কোনো মিঠা পানির ব্যবস্থা নেই। নেই হরিণ অসুস্থ হলে বা বন্য বা পাগলা কুকুরে কামড় দিলে চিকিৎসার ব্যবস্থা। নিঝুম দ্বীপে নেই কোনো পশু হাসপাতাল। নেই পর্যাপ্ত পরিমাণে বন প্রহরী। বন প্রহরীদের জন্য নেই ভালো আবাসন ব্যবস্থা। ঝরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে বন প্রহরীদের থাকার ঘর।

অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় বন বিভাগের যোগসাজসেই পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত হরিণ নিধন করে পাচার করছে। বনডাকাতরা দ্বীপের টহলরত বন প্রহরীদের মারধরও করেছে।

সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের আওতাভুক্ত বাগান বন্দোবস্ত দেয়ার অভিযোগ বনবিভাগের। এ সময় রাস্তারচর, দমারচর, কালামচর, চরমিজান, চরমাহিদসহ সংরক্ষিত উদ্যানের বনভূমি বন্দোবস্তের পিছনে বনবিভাগের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করেন স্থানীয়রা। বনবিভাগের অভিযোগ সৃজনকৃত বন ও বর্ধিত অংশগুলি তারা বিভিন্ন নামে নামকরণ করে জরিপ কিংবা অবমুক্ত না করে ইচ্ছামাফিক বন্দোবস্ত দেয়। স্থানীয় ভূমি ও বনডাকাতদের দখলের নেশায় সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের বনকাটা তীব্র আকার ধারণ করেছে। মানবসৃষ্ট দুর্যোগে নিঝুম দ্বীপের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন।

সরেজমিন দেখা যায়, ছোঁয়াখালী খালের পশ্চিম পাশে, ডুবাইর খালের মাথায়, বাজার খালের দক্ষিণে, বৌ বাজারের পশ্চিমে সৈন্দর্যের লীলাভূমি হরিণের আশ্রয়স্থল পর্যটক জোনের হাজার হাজার একরের বনভূমি কেটে ফেলে। জাতীয় উদ্যানের বন কারা, কেন কাটছে জানতে চাইলে স্থানীয় বিট অফিসার হাসান আল তারিক জানান, ‘দিবালোকে ও রাতের অন্ধকারে স্থানীয় বনডাকাতরা অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বন কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

জাহাজমারা রেঞ্জ অফিসার দেলওয়ার জানান, সংরক্ষিত বনকাটার অভিযোগ করে থানাতে অনেকগুলি মামলা হলে পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয়, আসামি রাস্তায় ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ দেখছে না।

স্থানীয় অভিজ্ঞজনদের অভিমত, নিঝুমদ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষার পূর্বশর্ত জরিপ অধিদপ্তর কর্তৃক জিপিএস (গ্লোবাল পজেশন সিস্টেম) সার্ভের মাধ্যমে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনের সীমানা নির্ধারণ করা। এটাই এখন সময়ের দাবি। এতে করে সংরক্ষিত বনভূমিতে সহজ অনুপ্রবেশ ও দখল রোধসহ রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র ও বৃক্ষ নিধন।

নিঝুম দ্বীপে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমানা চিহ্নিত করে এর জীববৈচিত্র বিশেষ করে চিত্রা হরিণ রক্ষায় দীর্ঘ মেয়াদী ও কার্যকরী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণ খুবই জরুরি। নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ ডিয়ার জোন বা হরিণের বিচরণ ক্ষেত্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট স্থান থেকে পর্যটকদের চলাচলের জন্য কাঠের রাস্তা কিংবা ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় অথবা পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন এলাকাবাসী।

এখানে সরকারি কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় পরিবেশ ধ্বংস করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন অবকাঠামো নষ্ট করে দিতে পারে নিঝুমদ্বীপের সংরক্ষিত বৃহৎ প্রাকৃতিক সবুজবেষ্টনী ও এর ৩০ হাজার হরিনের অস্তিত্ব।

স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘নিঝুম দ্বীপের পর্যটকদের সব চেয়ে আকৃষ্ট করে এখানকার চিত্রা হরিণগুলো। খালের মধ্য দিয়ে দ্বীপে প্রবেশের সময় দুই ধারে গভীর বনে তাকালে চোখে পড়ে হরিণের দল। বিশেষ বিশেষ সময় হরিণগুলো নদীতে পানি খেতে আসে। তখন নদীতে ট্রলারে বসে একসঙ্গে অনেক হরিণ দেখা অনেকটা সহজ হতো। কিন্তু অবৈধভাবে বন উজাড় করায় দ্বীপের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দিন দিন পর্যটক সংখ্যা কমে আসছে। নিঝুমদ্বীপে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভবনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ। একে এক্সক্লুসিভ জোন ঘোষণা করা হলেও শুরু হয়নি তার কার্যক্রম।’

পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খেয়ে পরিকল্পিত কার্যকরী অংশগ্রহণমূলক পদক্ষেপই পারে নিঝুম দ্বীপকে বাঁচাতে। নিঝুমদ্বীপে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র বিশেষ করে চিত্রা হরিণ রক্ষায় দীর্ঘ মেয়াদী ও স্থানীয় সমন্বিত কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণ একান্ত জরুরি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করছে এলাকাবাসী।

জাহাজমারা রেঞ্জের রেঞ্জার দেলোয়ার হোসেন খাঁন বলেন, ‘সংরক্ষিত বন কাটার অভিযোগ করে থানাতে অনেকগুলি মামলা হলেও পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয়। আসামি রাস্তায় ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ দেখছে না। ১১টি চর নিয়ে ৪০৩৯০ একর ভূমিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন ঘোষণা করায় অবৈধভাবে বন উজাড় করে দ্বীপের সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলেছে।