রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্রেপ্তার প্রায় শূন্যের কোঠায়

প্রকাশিতঃ ২৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ৯:১৭ পূর্বাহ্ন


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলার ‘চরম’ অবনতি হয়েছে। গত ৫ মাসে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও সম্প্রতি এক নারীকে তুলে নিয়ে ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের’ পর আইনশৃঙ্খলা অবনতির বিষয়টি সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ১৭ আগস্ট চকরিয়ার সাবেক ছাত্রলীগ ও বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতা নাছির উদ্দিন নোবেলকে হত্যার পর মামলা হলেও কোনো আসামিকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।

একইভাবে ১৮ অক্টোবর রাতে মহেশখালীর কালারমারছড়ার ফকিরজোম এলাকার যুবলীগ নেতা রুহুল কাদেরকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার পর্যটন জোন সুগন্ধা পয়েন্টে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মোনাফ সিকদারসহ দুজনকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

৫ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে মহেশখালীর কালারমারছড়ার বাজার এলাকার আলাউদ্দিন নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের লিংক রোড এলাকার ঝিলংজা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কুদরত উল্লাহ সিকদারের অফিসে ঢুকে বেপরোয়া গুলি চালায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এতে তিনি ও তার বড় ভাই জেলা শ্রমিক লীগ সভাপতি জহিরুল ইসলাম সিকদার গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শ্রমিক লীগ সভাপতি জহির রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

এসব ঘটনায় মামলা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফলে প্রতিদিন বেড়েছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এতে সমুদ্রসৈকত এলাকায় দখল-বেদখল ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। যার সর্বশেষ পরিণতি ২২ ডিসেম্বর রাতে এক নারীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় মামলা নথিভুক্ত হলেও মূল অভিযুক্তদের কাউকে তিন দিনেও গ্রেপ্তার করা যায়নি।

এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মোনাফ সিকদারকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় করা মামলার বাদী তার বড়ভাই শাহজাহান সিকদার বলেন, হত্যাচেষ্টার মতো স্পর্শকাতর একটি মামলা হলেও ২ মাসেও কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে এখন মামলা করে আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

জেলা শ্রমিক লীগ সভাপতি জহিরুল ইসলাম হত্যায় তার ভাই স্থানীয় মেম্বার কুদরত উল্লাহ বাদি হয়ে মামলা করেছেন। এখানেও উল্লেখ করার মতো কোন অগ্রগতি নেই। মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি তাহের সিকদারকে বাদীপক্ষের সহায়তায় ঢাকা হতে গ্রেপ্তার করা গেলেও বাকি আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। একই অবস্থা চকরিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা নাছির উদ্দিন নোবেল হত্যা মামলারও। সেখানেও হত্যায় অভিযুক্ত কেউ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

চকরিয়ার নোবেল হত্যা, লিংক রোডের শ্রমিক লীগ সভাপতি জহির হত্যা এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোনাফ হত্যাচেষ্টা মামলায় অভিযুক্তরা জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিব রহমানের স্বজন, অনুসারীরা জড়িত বলে কাউকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না প্রচার পাচ্ছে। এতে অভিযুক্ত মেয়র মুজিবও।

গুলিবিদ্ধ মোনাফ সিকদার বলেন, কক্সবাজারে চলমান নানা অপকর্মের প্রধান হোতা মেয়র মুজিব। তার নেতৃত্বে জেলা শহরে হোটেল, জমিদখল, চাঁদাবাজি, লুটপাটসহ মামলাবাজি চলছে। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় প্রশাসন কিংবা সাধারণ মানুষ কেউ কিছু করতে পারছে না। মুজিবের অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই তার সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী বাহিনী দিয়ে হত্যা করা হয়। যেমন আমাকে (মোনাফ) মেরে ফেলতে চেয়েছিল।

অপরদিকে, স্বামী-সন্তানকে জিম্মি করে নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরা জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেন ও স্থানীয় সাংসদ সাইমুম সরোয়ার কমলের অনুসারী বলে আলোচনা আছে। ঘটনার পর থেকে সাদ্দাম ও এমপি কমলের সঙ্গে থাকা অভিযুক্তদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দুনেতার ছত্রছায়ায় থাকায় তারাও শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে চলতে পারছে বলে অভিমত সচেতন মহলের। তবে, অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম ও এমপি সাইমুম সরোয়ার কমল।

পর্যটন নগরী হওয়ায় হত্যাসহ সবকটি ঘটনাই সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পর্যটনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক নেতাসহ সারা দেশের সাধারণ ভ্রমণপিপাসুরা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, পর্যটন নগরী হিসাবে চলমান অপরাধকাণ্ডগুলো উদ্বেগজনক। সঠিক সময়ে সঠিক বিচার না হওয়ায় অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরাধীরা যেন বেপরোয়া হতে না পারে সেই পথ খোঁজা দরকার। পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে আরও আন্তরিক হওয়া সময়ের দাবি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাসানুজ্জামান সংঘটিত অনেক ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দাবি করে বলেন, যখন যেখানে যে ঘটনা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। অনেক ঘটনার তদন্ত চলমান, তাই আইনশৃঙ্খলা যে একেবারে অবনতি হয়েছে তা বলা যাবে না। জেলা ও পর্যটন এলাকা হিসাবে জনসংখ্যা এবং পর্যটকের উপস্থিতি মতে পুলিশের লোকবল কম। এরপরও অপরাধ ও অপরাধী নিয়ন্ত্রণে জোর প্রচেষ্টা থাকে। পর্যটন এলাকা কেন্দ্রিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। যেকোন অপরাধ সংগঠিত হলে পর্যটনের কথা মাথায় রেখে ঘটনার গভীরে গিয়ে প্রতিবেদন করা দরকার। গণমাধ্যমের সেই সহযোগিতা পেলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজারে প্রতিদিন লাখো পর্যটক আসেন। তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুরো জেলায় ৫টি পর্যটন স্পটে মিলে মাত্র ২১১ জন ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্য রয়েছেন। হিমছড়ি ও মহেশখালীর মতো পর্যটন স্পটগুলোতে একজন পুলিশও নেই। এরপরও ট্যুরিস্ট পুলিশ পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাতদিন সর্বাত্মক চেষ্টা করে।