বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

খাদ্যে ভেজাল, কী ভয়ংকর খেলায় মেতেছে ওরা!

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, জানুয়ারি ৭, ২০২২, ৪:১৪ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : সামুদ্রিক মাছ লইট্টা। সাদা রঙের এই মাছটি অনেকের বেশ পছন্দের। সুস্বাদু এই সামুদ্রিক মাছটি দ্রুত পচনশীল। তাই এই মাছকে তাজা দেখাতে বিক্রেতারা অবলম্বন করেন অবৈধ পন্থা। মাছে মেশান ক্ষতিকর রঙ। রঙের কারসাজিতে প্রায় পচে যাওয়া মাছও দেখে মনে হয় তরতাজা-টাটকা।

সম্প্রতি ফেসবুকে এমনই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে দেখা যায়, এক যুবক লাল রঙ ভর্তি একটি বালতি রেখেছেন। সেই রঙ মেশানো পানিতে একমনে চুবাচ্ছেন পাশে স্তূপ করে রাখা লইট্টা মাছ। এসময় সেই যুবক বলছিলেন, মাছ কীভাবে তাজা রাখতে হয় তা দেখাচ্ছি। মাত্র এক ড্রাম মাছ তাজা করলাম। কোনো কিছুর পরোয়া না করে ক্রেতাদের সামনেই লইট্টা মাছে রঙ মেশাচ্ছিলেন বিক্রেতা। তারপর তা সামনে সাজিয়ে রাখছিলেন বিক্রির জন্য।

চট্টগ্রাম নগরের স্টিল মিল মাছ বাজারের মাছ বিক্রেতার রঙ দিয়ে সামুদ্রিক মাছ তাজা করার ভিডিওটি দেখেছেন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। শুধু স্টিল মিল বাজার নয়, নগরের প্রায় মাছ বাজারেই এমন চিত্র দেখা যায়। বেশিরভাগ সময়ই মাছে রঙ মেশানো হয় ক্রেতাদের অগোচরে, আড়ালে। সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছের ফুলকা বেশি লাল দেখানোর জন্যও রংয়ের ব্যবহার করা হয় এসব মাছ বাজারে।

৬ জানুয়ারি সরেজমিনে নগরের স্টিলমিল, পাহাড়তলী রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরের বেশ কয়েকটি প্রধান মাছ বাজার ঘুরে রং যুক্ত মাছ বিক্রি করতে দেখা গেছে। এরমধ্যে স্টিলমিল বাজারে দেখা যায়, ফিসারিঘাট সহ অন্যান্য আড়ত থেকে বাজারে আনা এসব সাদা রঙের লইট্টা মাছ একটি ড্রামে রাখা হয়। পরবর্তীতে ড্রাম ভর্তি এসব মাছ একটি ঝুপড়িতে নিয়ে ১৫-২০ মিনিট পর নিয়ে আসা হয় ডালায় করে। তবে আড়ত থেকে আনা এসব সাদা মাছ মুহুর্তেই হয়ে যায় লালচে।

রঙ দেওয়া মাছ ঝুড়িতে সাজিয়ে অপেক্ষা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিক্রিও হচ্ছে। রঙ দেওয়া এসব মাছ দেখে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আকৃষ্ট হচ্ছেন ক্রেতারা। তবে তাদের বেশিরভাগই না বুঝে কিনছেন ক্ষতিকর রঙ মেশানো এসব মাছ। যদিও এই রঙ মেশানোকে খুবই স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন বিক্রেতারা। পরিচয় গোপন রেখেও বেশ কয়েকজন মাছ বিক্রেতার সাথে কথা হলে তাদের বেশিরভাগই এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তারা দাবি করেন, এগুলো মাছের প্রাকৃতিক রঙ, মাছগুলো মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে কিনে সরাসরি খুচরা বাজারে বিক্রি করেন তারা।

স্টিল মিল বাজারে খায়রুল নামের এক মাছ বিক্রেতা বলেন, ‘আমরা মাছে অল্প করে জর্দার রঙ মেশাই। এগুলো খারাপ না। খারাপ হলে ভাতের সাথে তো জর্দার রঙ মেশানো হতো না। মাছে সামান্য পরিমাণ রঙ দিলে তা আকর্ষণীয় আর তাজা দেখায়। কিন্তু এতে শরীরের কোন ক্ষতি হয় না। আমি নিজেও এই মাছ খাই। আজ পর্যন্ত তো আমার কোনো সমস্যা হয়নি।

এসময় সাবের আহমেদ নামে এক সবজি বিক্রেতা প্রতিবেদককে জানান, তাদের এই কারসাজির ভেতরের ঘটনা। তিনি বলেন, দ্রুত পচনশীল মাছ তাজা দেখাতে তারা মাছের মুখের অংশে রঙ মেশান। এছাড়া অবিক্রিত মাছ বরফে সংরক্ষণের পর একটু খারাপ হয়ে যায়। সেগুলো টাটকা বোঝাতে সম্পূর্ণ মাছ রঙে চুবিয়ে তারপর বিক্রি করা হয়। বেশিরভাগ মাছ বিক্রেতা শুধুমাত্র জর্দার রঙ কিনে এনে সেগুলো লইট্টা ও কার্প জাতীয় মাছে ব্যবহার করেন। আবার অনেকে এই কাপড়ের রঙের সাথে ফরমালিনও মেশান।

এ বিষয়ে জানতে স্টিল মিল বাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির অফিসে গিয়ে তালা ঝুলতে দেখা যায়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জর্দার রঙ স্বাস্থ্যকর নয়। এসব মাছে মেশালে তা ধোয়ার পরও পুরোপুরি যায় না। রঙ মেশানো এসব মাছ খেলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আক্তারুজ্জামান বলেন, যেকোনো ধরনের রঙ কেমিক্যাল। এসব রঙ মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে পাকস্থলি, লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের ব্যাপকভাবে ক্ষতি করতে পারে। এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।

এদিকে এমন অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যারা ব্যবস্থা নেবেন তারা দায় বর্তাচ্ছেন একে অন্যের উপর। দায়িত্বশীলরা জানেনই না এ বিষয়ে আইনের নির্দেশনা কিংবা তাদের করণীয় কী?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাছে রঙ, ফরমালিন বা ভেজাল কিছু মেশানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ফুডগ্রেড রঙও মাছে মেশানো যাবে না। আমাদের বিভিন্ন অভিযানে আমরা রঙ মেশানো মাছ পেলেও রঙ পাই না। কারণ তারা রঙ মেশানোর পরই সেগুলো সরিয়ে ফেলে। আমরা বুঝতে পারি যে তারা অবৈধ কর্মকাণ্ড করছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারি না।

তিনি বলেন, আমরা মৎস্য সুরক্ষা আইনের আওতায় আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। তারপর আমরা অভিযানে গেলে এ বিষয়টি দেখি। যদিও মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের আওতায় এ বিষয়ে বেশকিছু আইন ও নির্দেশনা রয়েছে। মূলত তারাই এ ধরণের ভেজাল মিশ্রণ সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করার এখতিয়ার রাখে। এমন অনিয়মের বিপরীতে তারা অভিযান পরিচালনাসহ জরিমানা করার এখতিয়ার রাখে।’

মৎস্য ও মৎস্যপণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০২০-এর অষ্টম অধ্যায় অনুযায়ী ভেজাল মিশ্রণ, অদ্রব্য অনুপ্রবেশ এবং নিষিদ্ধ ঔষধ ও রাসায়নিক ক্ষতিকারক পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনাে ব্যক্তি মৎস্য ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি বা অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করার জন্য তাতে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করলে উক্ত কাজ হবে একটি অপরাধ এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ৭(সাত) বৎসরের, কিন্তু ৫ বৎসরের নিচে নয় কারাদণ্ড এবং অন্যূনতম ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

রয়েছে মােবাইল কোর্ট আইনও। মৎস্য ও মৎস্যপণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) আইনের ২০০৯ এর প্রয়ােগে বলা হয়েছে- এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে, মােবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ৫৯ নং আইন) এর তপশিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে, মােবাইল কোর্ট দণ্ড আরােপ করতে পারবে। কিন্তু এ বিষয়ে তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ কিংবা অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায় যায় না চট্টগ্রামের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরকে।

মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, চট্টগ্রামের উপপরিচালক শাহজাদা খসরুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন। একুশে পত্রিকাকে বলেন, এ ধরণের কর্মকাণ্ডের বিপরীতে অভিযান পরিচালনা করে জেলা মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারা। আমরা এক্সপার্ট অরিয়েন্টেড বিষয়গুলো ডিল করে থাকি। যখন কেউ এক্সপার্ট করতে চায় সেটার গুণগত মান নিশ্চিতের জন্য পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেই। আমাদের কাজ হলো এতটুকুই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টা জেলা মৎস্য অফিস দেখবে। কারণ তারা এক্সটেনশন ডিপার্টমেন্ট। তারপরও যেহেতু আমাকে জানিয়েছে আমি বিষয়টা দেখবো। আমার আইনের কোনো এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে আমি এর বিরুদ্ধে অভিযান চালাবো। তারপরও আপনি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন। তিনি এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারবেন।

এদিকে, যেসব মাছে রঙ মিশ্রণের সুযোগ রয়েছে, সেসব ক্রয়ে ভোক্তাদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যতই ফরমালিন বা রঙ দেওয়া হোক না কেন, টাটকা মাছ চিনে নেওয়ার জন্য কৌশলের কথা জানিয়েছেন তারা। এগুলো হলো-

• টাটকা মাছের চোখ সবসময় স্বচ্ছ হবে। সময়ের সাথে সাথে এই চোখ ঘোলাটে, মৃত হয়ে আসে। যত সময় যায়, চোখ তত নিষ্প্রাণ। ফরমালিনে মাছের মাংস পচে না ঠিকই, কিন্তু চোখের জীবন্ত ভাব নষ্ট হওয়া ঠেকানো যায় না। চোখ দেখলেই চিনে নিতে পারবেন তাজা মাছ।

• টাটকা মাছ কখনোও শক্ত হবে না, আবার নরমও হবে না। যদি আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে দেখেন যে মাছ একদম শক্ত, বুঝবেন যে সেটা ফ্রিজে রাখা ছিল। আর যদি আঙ্গুল দিলেই দেবে যায় ভেতরে, বুঝবেন মাছের বয়স হয়েছে। তাজা মাছে আপনি আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে দেবে যাবে। কিন্তু আঙ্গুল সরিয়ে নিলেই জায়গাটা ঠিক হয়ে যাবে।

• মাছের কানকো দেখাটা টাটকা মাছ চেনার একটা ভালো উপায়। যদিও মাছের কানকোতে এখন রঙ মিশিয়ে রাখেন দোকানিরা। তাই শুধু কানকো দেখে মাছ কিনবেন না। টাটকা মাছের কানকো হবে তাজা রক্তের রঙের এবং পিচ্ছিল, স্লাইমি ভাব থাকবে।

• তাজা মাছের গন্ধ হবে জলের মত, সামুদ্রিক মাছ হলে সমুদ্রের মত। শসার গন্ধের সাথেও মিল পেতে পারেন। যে মাছ থেকে বাজে গন্ধ আসবে, সেটা নিঃসন্দেহে তাজা মাছ নয়।

• মাছের রঙ দেখে তাজা মাছ চেনা যায়। মাছের শরীর রঙ যদি চকচকে রূপালী বদলে হলদে, লালচে বা অন্য রঙের আভা দেখা যায় তাহলে মাছটি তাজা নয়। তাজা মাছ চকচক করবে, সময় যাওয়ার সাথে সাথে চকচকে ভাব একেবারেই ম্লান হয়ে যাবে তা সে যতই ফরমালিন দেয়া হোক না কেন।