বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ মাঘ ১৪২৮

ভ্যাট আইনের সুফল নেই, রাজস্ব ফাঁকি ঠেকানো যাচ্ছে না

প্রকাশিতঃ বুধবার, জানুয়ারি ১২, ২০২২, ১:০৫ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ রফিক : প্রায় আড়াইবছর হলো দেশে নতুন ভ্যাট আইন চালু হয়েছে। কিন্তু নতুন আইনটির সুফল পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভ্যাট আইনের মূল উদ্দেশ্য, রাজস্ব আদায়ে শক্তিশালী স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবস্থা চালু করা। কিন্তু গত আড়াই বছরে এ ব্যবস্থার শতকরা ৫০ ভাগও চালু করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

ফলে ভ্যাট ‘ফাঁকিবাজরা’ পার পেয়ে যাচ্ছেন। ভ্যাট ফাঁকির তালিকায় আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শুরু করে দেশের স্বনামধন্য শিল্পগ্রুপ আবুল খায়ের, কেএসআরএম, বিএসআরএমসহ শতশত ছোট, মাঝারি এবং বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে চট্টগ্রাম কাস্টমস এক্সসাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট অফিসে আছে অসংখ্য মামলা। রহস্যজনক কারণে বছরের পর বছর এসব মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেছেন, ‘অনেক মামলা আটকে থাকার কারণে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। মামলা জট রাজস্ব আদায়ে অন্যতম বাধা। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও কঠিন।’

তবে ভ্যাট ‘ফাঁকিবাজ’ চট্টগ্রামের কিছু শিল্পগ্রুপের সাথে ভ্যাট অফিসের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার আঁতাত আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভ্যাট গোয়েন্দার নিরীক্ষায় উঠে আসছে এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভ্যাট ফাঁকি নিয়ে সৃষ্ট মামলা এবং প্রতিষ্ঠানের তথ্য চাইতে তিনদিন আগে নগরের আগ্রাবাদে কাস্টমস এক্সসাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রাম অফিসে যান একুশে পত্রিকার এ প্রতিবেদক। এসময় সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তা আকবর হোসেন এই প্রতিবেদকের কাছে তথ্য সরবরাহ করতে উপকমিশনার অনুরূপা দেব’কে নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি ভ্যাট ফাঁকি দেয়া প্রতিষ্ঠানের নাম বা মামলার পরিসংখ্যান প্রদানের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান।

এ প্রতিবেদককে তিনি (অনুরূপা দেব) বলেন, ‘কয়টি শিল্পগ্রুপ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ‘ফাঁকি’ নিয়ে মামলা চলমান আছে সেটির কোন তালিকা আমাদের কাছে নেই। এছাড়া মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা কাউকে ভ্যাট ফাঁকিবাজ প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যায়িত করতে পারি না। কারণ মামলার উদ্ভব হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে। মামলা নিষ্পত্তি করারও একাধিক ধাপ আছে।’

ভ্যাট ফাঁকিবাজদের তথ্য চাইলে এ প্রতিবেদককে রাজস্ব আদায়ের একটি পরিসংখ্যান ধরিয়ে দেন উপকমিশনার অনুরূপা দেব। অভিযোগ আছে, ঢাকঢোল পিটিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। পরে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের অফিসে ডেকে নিয়ে মোটা অংকের লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টির ‘রফাদফা’ করা হয়। এই কারণে ভ্যাট ফাঁকিবাজদের তথ্য জানা থাকলেও তা কৌশলে এড়িয়ে যান দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। ভ্যাট অফিসের এক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রেখে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভ্যাট ফাঁকি দিতে কর্মকর্তাদের সাথে গোপন আঁতাত করেন ব্যবসায়ীরা। ফলে ভ্যাট ফাঁকির বড় বড় ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে।’

২০১২ সালে দেশে নতুন ভ্যাট আইন করা হয়। ২০১৭ সালে আইনটি চালুর কথা থাকলেও ব্যবসায়ীদের আপত্তিতে তা দুই বছর পেছানো হয়। অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাটহারের পরিবর্তে একাধিক ভ্যাটহার করে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে নতুন আইন চালু হয়। তবে আইনটি ঘষামাজা করে পুরোনো আইনের মতোই বাস্তবায়ন করা হয়। নতুন আইনে নানামুখী ছাড়ের কারণে বছরে প্রায় ৩০-৩২ হাজার কোটি টাকার কাঙ্খিত রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে ২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন চালুর সময় এনবিআরের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রতিবছর ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। প্রথম বছর, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভ্যাট আদায় বাড়েনি; বরং আড়াই হাজার কোটি টাকা কমেছিল। ওই বছর ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৮৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। আগের বছর, অর্থাৎ পুরোনো আইনের আওতায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায় হয়েছিল।

বর্তমানে ২ লাখ ৮৮ হাজার প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় নিবন্ধন বা ভ্যাট নিবন্ধন আছে। নতুন ভ্যাট আইন চালুর সময় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে ভ্যাটের মেশিন বসানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। আইনটি চালুর এক বছর পর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে ভ্যাটের মেশিন বসানো শুরু হয়। গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৭৮টি প্রতিষ্ঠানে এই মেশিন বসেছে, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ১ শতাংশের কিছুটা বেশি। কিন্তু দুই মাস আগে এই মেশিন সাড়ে ২০ হাজার টাকায় বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা সাড়া দিচ্ছেন না।

জানা গেছে, সম্প্রতি তথ্য গোপন করে সারা দেশে মোট ৩৯টি প্রতিষ্ঠানে ৯৭৭ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উদঘাটন করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক আছে সাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে ৪৬৮ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এরমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একাই ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ৪৬২ কোটি টাকা।

ভ্যাট জালিয়াতির সঙ্গে চট্টগ্রামের যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- টি কে গ্রুপের মালিকানাধীন এলাহী নূর চা বাগান, এলিট পেইন্ট অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, শিপব্রেকার গ্রান্ড ট্রেডিং এন্টারপ্রাইজ, ইউনিভার্সেল রিফাইনারি, গাড়ি নির্মাতা সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ। শুধু চট্টগ্রাম নয়, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সারা দেশে ৩৯টি প্রতিষ্ঠান ৯৭৭ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ভ্যাট ফাঁকির দায় স্বীকার করে ৯টি প্রতিষ্ঠান ১২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধও করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ১০০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ৭৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে এরপরই আছে এবি ব্যাংক। ওয়ান ব্যাংক ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা, মেঘনা ব্যাংক ৬৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, হাবিব ব্যাংক ৪৫ লাখ ৭ হাজার টাকা, লংকা-বাংলা ফাইন্যান্স লি. ২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, দ্য ইউএই বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ রেইস ম্যানেজমেন্ট ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

ভ্যাট ফাঁকির তালিকায় আছে-নাসির গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ, মুন্নু সিরামিকস লিমিটেড, ডক্টর টি ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা সিএনজি, তানভীর পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ, ইউনিভার্সেল রিফাইনারি, বেঙ্গল মাইন্স ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন, ক্লাসিক্যাল হোমট্রেক্স, গ্রামীণ ব্যাংক, ই-অরেঞ্জ, ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স, পারটেক্স গ্রুপ, অ্যাকটিভেট মিডিয়া।

জানা গেছে, কয়েকমাস আগে ভ্যাট ফাঁকির দায় স্বীকার করে যে ৯টি প্রতিষ্ঠান ১২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সেগুলো হলো-ওয়ান ব্যাংক ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, বাংলাদেশ রেইস ম্যানেজমেন্ট ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা, মুন্নু সিরামিকস ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ইউনিভার্সেল রিফাইনারি ১২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা এবং গ্রান্ড ট্রেডিং এন্টারপ্রাইজ ১৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলার কারণে রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হচ্ছে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু কর্মকর্তার ভুল অ্যাসেসমেন্টের কারণে অনেক ক্ষেত্রে মামলার উৎপত্তি হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমস এক্সসাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচমাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৪ দশমিক ২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই মাসে ৬৫৪ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা, আগস্ট মাসে ৬৭৮ দশমিক ৬০ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে ৬৯৩ কোটি টাকা, অক্টোবরে ৬৩৫ দশমিক ৬ কোটি টাকা এবং নভেম্বর মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৮৮২ দশমিক ২৭ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৩ হাজার ১৮৬ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা।

একজন ভ্যাট গোয়েন্দা কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, জনবল সংকটের কারণে এনবিআর’র পক্ষে সব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভ্যাট ফাঁকির তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয় না। অনেক ব্যবসায়ী এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তাকে অনৈতিক সুবিধা দিয়েও ভ্যাট ফাঁকির তথ্য গোপন করার সুযোগ পেয়ে থাকে। অসাধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অসাধু এনবিআর কর্মকর্তাদের ওপর সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত।

জানা গেছে, বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি ধরতে এনবিআর’র আছে কেন্দ্র্রীয় গোয়েন্দা ইউনিট। তাদের হাতে আছে চট্টগ্রামসহ দেশের ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকা। এ ইউনিট অভিযানে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও ব্যবসায়ী লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি উদ্ঘাটন করে। পাশাপাশি কাস্টমস আইন ও ভ্যাট বিধিমালা অনুযায়ী যেকোন আমদানি পণ্য চালান বা পণ্য বহনকারী যানবাহন বা ব্যক্তিকে আটক, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে গোয়েন্দা ইউনিটকে। কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে অনেক কম, এমনটাই মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘নতুন ভ্যাট আইন নিষ্ফল উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। সংসদে পাস হওয়া আইন থেকে নানা বিচ্যুতি হয়েছে। একাধিক ভ্যাট হারসহ বিভিন্ন খাতে ছাড় দিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে। আইনের সুফল পেতে যে ধরনের অটোমেশন দরকার, তা করা হয়নি। এ ছাড়া উৎপাদক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সার্বিকভাবে ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও এনবিআর—কেউই লাভবান হচ্ছে না।’