বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বেসিকের টাকা মেরে লাপাত্তা মোর্শেদ-মাহজাবিন, চার বছরেও প্রতিবেদন দেয়নি দুদক

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০২২, ৩:০২ অপরাহ্ণ


আবছার রাফি : বেসিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের ২৭৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জাতীয় পার্টি নেতা-নেত্রী দম্পতি মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও সাবেক এমপি বেগম মাহজাবিন মোরশেদের বিরুদ্ধে মামলার চার বছর পার হলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বিপুল অঙ্কের এই খেলাপি ঋণের দায় নিয়ে মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতি বর্তমানে পলাতক। তারা সপরিবারে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের অশাওয়া শহরে বসবাস করছেন বলে জানা যাচ্ছে।

এর আগে বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক। এর মধ্যে একটি মামলায় মোর্শেদ মুরাদের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। অপর মামলায় বেসিক ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে ১৪১ কোটি ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১০৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় মাহজাবিন মোর্শেদের বিরুদ্ধে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আত্মসাৎ করা ঋণের টাকা কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে দুদকের মামলায় তাদের জামিন দেয় আদালত। কিন্তু শর্তানুযায়ী কিস্তি পরিশোধ না করা ও আদালতে হাজির না হওয়ায় গত বছরের ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিল তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে চট্টগ্রামের একটি আদালত।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের আইনজীবী মাহমুদুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মোর্শেদ ও মাহজাবিন অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে ছিলেন। আত্মসাৎ করা টাকা কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে আদালত তাদের জামিন দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ। মামলাটির সর্বশেষ কী অবস্থা সে বিষয়ে আমার কাছে কোন তথ্য নেই। আদালতের পেশকারের কাছ থেকে জেনে নিন।’

পরে চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করে জানা যায়, গত বছরের ৩১ অক্টোবর মামলাটির সর্বশেষ ধার্য্য তারিখ ছিল। ওইদিন আসামি সৈয়দ মোজাফফর হোসেন হাজির ছিলেন। অপর আসামি মাহজাবিন মোরশেদ পলাতক রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা আছে। এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তা এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য্য করা আছে।

শুধু বেসিক ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎই নয়, মোর্শেদ মুরাদের নামে-বেনামে তার পারিবারিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৯০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাত করার তথ্য পাওয়া গেছে। মোর্শেদ পরিবারের কাছে শুধু রাষ্ট্রমালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০২ কোটি টাকা ঋণের জিম্মাদার মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম। আর বর্তমানের পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) ৭৬ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১১৩ কোটি টাকাসহ অন্যান্যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই পরিবারের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো ৩৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই পরিবারের ৯৯০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য মিলেছে। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেশি বলে জানান দুদক ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম চট্টগ্রামের সুপরিচিত ব্যবসায়ী সেকান্দর হোসেন মিয়ার সন্তান। তাদের পৈতৃক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল ইব্রাহিম কটন মিল। বড় অঙ্কের দায়দেনাসহ বাবার রেখে যাওয়া ইব্রাহিম কটন মিল প্রায় ১১ বছর আগে বিক্রি করে দেন মোর্শেদ। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ক্রিস্টাল গ্রুপ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান। নিজে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে থেকে মা গুলশান আরা বেগমকে করেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান। আর ভাই রাশেদ মুরাদ ইব্রাহিমকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, আরেক ভাই ফয়সাল মুরাদ ইব্রাহিমকে অর্থ-পরিকল্পনা পরিচালক এবং স্ত্রী মাহজাবিন ও ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা রাশেদসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের করা হয় গ্রুপটির পরিচালক। প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স নামে একটি বীমা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে মোর্শেদ মুরাদ পরিবারের মালিকানায়।

ক্রিস্টাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড, ক্রিস্টাল ল্যান্ড মার্ক লিমিটেড, ক্রিস্টাল ফিশারিজ লিমিটেড, ইব্রাহিম ফার্মস লিমিটেড, ম্যাক্স ট্রেড লিমিটেড, এমআরএফ ফিশারিজ লিমিটেড, ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেড, হামিদা দোজা লিমিটেড, আইজি নেভিগেশন, বে নেভিগেশনসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়িক মন্দা ও ঋণখেলাপির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।

সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের ১ কোটি শেয়ার বা ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ মালিকানা ছিল মোর্শেদ মুরাদের হাতে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা হিসাবে ফারমার্স ব্যাংকে মোর্শেদ মুরাদের শেয়ার ছিল ১০ কোটি টাকার। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির অন্যতম পরিচালক ছিলেন তিনি। ওই সময় ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে ঋণ সুবিধাও নিয়েছে তার পরিবার।

২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় রয়েছেন মোর্শেদ মুরাদ পরিবারের সদস্যরা। এর চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার ভাই রাশেদ মুরাদ। মোর্শেদ মুরাদ পরিচালক ছিলেন ইউনিয়ন ইনস্যুরেন্সেরও। এর আগে আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালকও হয়েছিলেন তিনি।

ক্রিস্টাল গ্রুপের কাছে প্রায় ১১৩ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে রূপালী ব্যাংকের। ওই ঋণের পুরোটাই খেলাপি হয়ে যাওয়ায় সম্প্রতি ঋণের জামানত বিক্রির জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ব্যাংকটি।

এদিকে মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও সাবেক এমপি বেগম মাহজাবিন মোর্শেদ দম্পতি দেশে থাকা তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য কানাডা থেকে প্রায়ই যাতায়াত করেন ভারতে। সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। কানাডা বাঙালি কমিউনিটিতে তেমন একটা যাতায়াত নেই তাদের। পরিবারটির সবাই বিলাস বহুল গাড়িতে চলাফেরা করেন।

জাপার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী বেগম মাহজাবিন বর্তমানে জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি তাদের নিয়োগ দেন পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। মোর্শেদ চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি। আর তার স্ত্রী মাহজাবিন মোর্শেদ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের (মহিলা আসন-৪৫) সাবেক সদস্য। মোর্শেদ মুরাদ সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোর্শেদ মুরাদ ও মাহজাবিন মোর্শেদের মোবাইল নম্বরে ফোন করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।