রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

‘দূষণে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে বঙ্গোপসাগর’

প্রকাশিতঃ ১৩ জানুয়ারী ২০২২ | ১:১১ অপরাহ্ন


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : বাংলাদেশের স্থলভাগের চেয়েও বড় সীমানাখণ্ড বঙ্গোপসাগর। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এ সাগরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্লাস্টিকসহ নানা দূষণের কারণে আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে সাগর ব্যবহার অযোগ্য হয়ে ওঠতে পারে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের।

এ কারণে জনগণের মাঝে সমুদ্র সংক্রান্ত জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে একটি সমুদ্রসাক্ষর জাতি গঠনের লক্ষ্যে প্রাইমারি থেকে পাঠ্যপুস্তকে সমুদ্র সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট (বুরি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর।

বুধবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট (বুরি) মিলনায়তনে ‘সমুদ্র রক্ষা, পূনর্গঠন ও টেকসই ব্যবহারের জন্য সমুদ্রসাক্ষর জাতি গঠনের গুরুত্ব বিষয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এ তথ্য জানান তিনি।

সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, প্রাইমারি থেকে পাঠ্য পুস্তকে সমুদ্র সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত না হলে জনগণকে সচেতন করা কঠিন হয়ে যাবে। এতে করে সমুদ্র দূষণ অব্যাহত থাকবে এবং বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়ে বেশি সমুদ্রে বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আমি মনে করি।

সেমিনারে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলেন, সেন্টমার্টিনের সৈকতের পানিতে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ১ থেকে ২৭২ সিএফইউ ফিকাল কলিফরম অর্থাৎ ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ১০০ মিলিলিটার পানিতে যদি ২০০’র ওপরে টোটাল কলিফরম পাওয়া যায় সেটাকে দূষিত হিসেবে ধরা হয়। ফিকাল কলিফরম যেটাকে ‘ই-কোলাই’ বলা হয় সেটি প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১০০ থেকে ২০০’র ওপরে পাওয়া যায় তাহলে তাকে দূষিত ধরা হয়। গবেষকরা পরীক্ষা করে– সৈকতের পানিতে এবং সৈকত থেকে ১ কিলোমিটার দূরের পানিতেও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পান। পর্যটক মৌসুমের সঙ্গে সাধারণ সময়ের তফাৎ দেখা গেছে পর্যটন মৌসুমে ৬৩ শতাংশ এবং সাধারণ সময়ে ৩৭ শতাংশ।

এভাবে দূষণ অব্যাহত থাকলে আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করে সেমিনারে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে প্রাইমারি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কোন পাঠ্য পুস্তকে সমুদ্র সংক্রান্ত কোন বিষয় পড়ানো হয় না। অনেকে সাগর দূষণ কথাটাও মানতে নারাজ। অথচ আমাদের অজ্ঞতার কারণে সৃষ্টিকর্তার এমন অমূল্য দানের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছি না। তাই প্রাইমারি থেকে পাঠ্য পুস্তকে সমুদ্র সংক্রান্ত কোন বিষয় পড়ানো জরুরি। এতে করে শিশুরাও জানতে পারবে সমুদ্র কত অমূল্য সম্পদ। সাধারণ জনগণের মাঝে সমুদ্রের গুরুত্ব বুঝানো গেলে একদিকে দূষণ ঠেকানো যাবে। অপরদিকে সুনীল অর্থনীতি সমুদ্রপাড়ের বাসিন্দা সমাজ ও দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর কোন সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের পাঁচ ভাগের বেশি রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি উল্লেখ বিজ্ঞানীরা আরও বলেন, সমুদ্র যে কত বড় সম্পদ এবং আল্লাহর নেয়ামত এটি শুধু সমুদ্র সম্পর্কে যিনি জানতে চেষ্টা করেন তিনিই শুধু জানেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর এবং বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও মৎস্য অনুষদের ডিন ড. বাশেদউন্নবী রাফি ও নৌ-বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত চিফ হাইড্রোগ্রাফার শেখ মাহমুদুল হাসান।

বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট ও সমুদ্র সংক্রান্ত জ্ঞান প্রচারকারী সংগঠন অক্টোফিনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে অতিথি হিসাবে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুল আলম, সহকারী অধ্যাপক ড. মো. সাইদুল ইসলাম সরকার ও ড. এনামুল হক। আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউটের কেমিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাইদ মোহাম্মদ শরিফ ও ভূ-তাত্ত্বিক ওশানোগ্রাফি বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া, অক্টোফিনের মোসাম্মত ইসরাত জাহান, সানজিলা শারমীন, হৃষিকা বড়–য়া, ইমরান ও জাহিন প্রমূখ।

সেমিনারে বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক সমুদ্র দূষণের কারণে বঙ্গোপসাগরের পানিতে নানা ধরনের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সমুদ্র রক্ষায় একটি সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সমুদ্র দূষণ বন্ধে পর্যটন এলাকায় ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধেরও পরামর্শ দেন বিজ্ঞানীরা।

সেমিনারে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে গত ২ বছর ধরে কক্সবাজার উপকূলে কাছিম আসছে না জানান নেকমের ব্যবস্থাপক সমুদ্র বিজ্ঞানী আবদুল কাইয়ুম।

ড. ওয়াহিদুল আলম বলেন, সাগরের পানিতে মাইক্রোবায়াল পলিউশন বা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দূষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পর্যটন শিল্পও হুমকীর মুখে পড়তে পারে বলে আশংকা করেন। দিনব্যাপী এই সেমিনারে অক্টোফিনের সদস্য এবং সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।