বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

টায়ার পুড়িয়ে জ্বালানি তেল: দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জীবন, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য-পরিবেশ

প্রকাশিতঃ Wednesday, January 26, 2022, 10:49 am


এম কে মনির, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের এসকেএম এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে টায়ার পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে জ্বালানি তেল। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন স্থানীয়রা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠা এস এস ইন্ডাস্ট্রিজ নামে এই টায়ার পোড়ানো কারখানা পরিবেশ দূষণ, জনদূর্ভোগ ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি সৃষ্টি করে আসলেও এখনো কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসএস ইন্ডাস্ট্রিজের টায়ার পোড়ার উৎকট গন্ধে রাতে ঘুমানো যায় না। দীর্ঘদিন এ গন্ধ বাধ্য হয়েই নিঃশ্বাসে নিতে হচ্ছে। এলাকার শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষরা এলার্জি, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ফুসফুস ক্যান্সারসহ জটিল শারীরিক রোগে ভুগছেন। বাতাসে ও ছরার পানিতে কালো পাউডার-ধোঁয়া মেশার ফলে পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি। জনদূর্ভোগ বেড়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠেছে ওই এলাকাটি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ৮ বছর আগে এসকেএম জুটমিলস সড়কের ভিতরে উত্তর মাহমুদাবাদ (আলী চৌধুরী পাড়া) এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে স্থানীয় হাজী খায়রুল বশর চৌধুরীর কাছ থেকে ১০ বছরের চুক্তিতে ২ একর পাহাড়ি সমতল জায়গা লিজ নিয়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে টায়ার পোড়ার কারখানা স্থাপন করেন নরসিংদী জেলার ব্যবসায়ী রাজু ও কুমিল্লার জহির।

এরপর থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের কোন প্রকার অনুমোদন না নিয়েই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাড়ির অব্যহৃত বা পুরোনো টায়ার এনে দূষণে সহায়ক চুল্লিতে পোড়ানো হয়। পরে আগুনে গলানো টায়ার থেকে অপরিশোধিত (ফার্নেস অয়েল) জ্বালানি তেল উৎপাদন করে বিটুমিন পরিবহনের ট্যাঙ্ক গাড়িতে ভর্তি করে অন্যত্র পরিবহন করা হয়। যা ড্রামজাত করে বিভিন্ন ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করে আসছে এস এস ইন্ডাস্ট্রিজ।

টায়ার পুড়িয়ে উৎপাদিত এসব তেল-আলকাতরাকে সড়কে ব্যবহৃত বিটুমিনের পরিবর্তে নিম্নমানের সামগ্রী হিসেবেই ধরা হয়। যা ব্যবহারে সড়কের স্থায়িত্ব কম হয়। শুধু সড়ক সংস্কারে নয় এসব জ্বালানি তেল বিভিন্ন কারখানায় জ্বালানি তেল হিসেবেও বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে টায়ার পুড়িয়ে পাওয়া পাউডার ও লোহার তার যাচ্ছে ছাপাখানায় ও স্টীল রি-রোলিং মিলে।

সরেজমিনে হত ২৪ জানুয়ারি আলী চৌধুরী পাড়া এলাকায় অবস্থিত ওই কারখানা এলাকায় গিয়ে একের পর এক পুরোনো টায়ার বোঝাই ট্রাক ও তেল সংরক্ষণের খালি ড্রাম কারখানার ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকতে দেখা যায়। তবে কারখানার ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে এ প্রতিবেদককে বাধা দেন কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী। তবে কারখানার ভিতরে ৪টি বড় বিটুমিনের ট্যাঙ্ক লরি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দিনের বেলায় টায়ার পোড়া বন্ধ থাকলেও পুরোনা টায়ার এনে স্তূপ করাসহ সব ধরণের কাজ চলমান ছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এস এস ইন্ডাস্ট্রিজ সবাইকে ম্যানেজ করে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী দুর্ভোগ পোহালেও দেখার যেন কেউ নেই। মানুষ মরলে তাদের কী? যারা এসব দেখভাল করবে তারা তো টাকা পাচ্ছে। জনগণের কষ্ট দেখার কী দরকার। এস এস ইন্ডাস্ট্রিজ প্রভাবশালীদের হাতের মুঠোয় নিয়ে জনগণের সীমাহীন দুর্ভোগ তৈরি করেছে।’

বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এস এস ইন্ডাস্ট্রিজের নিশ্চয়ই বড় কোন প্রভাবশালী কারও সাথে যোগসাজশ আছে। না হয় এর আগে সেখানে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ৩ জনকে ধরে নিয়ে গেলেও ১ ঘন্টার মধ্যে আবার তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলো। ৭-৮ বছর ধরে আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অনেক কষ্ট সহ্য করছে। উৎকট গন্ধে তারা রাতে ঘুমাতে পারে না। পরিবেশেরও চরম ক্ষতি হচ্ছে। আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে শীঘ্রই উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ জানাব।’

পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগের কথা স্বীকার করে কারখানার জায়গাটির মালিক খায়রুল বশর চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘টায়ার পোড়ানোর ফলে মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে সেটা মানি। তবে সেসব দেখভাল করা আমার দায়িত্ব না। আমি তাদের আগেই বলেছি আমি ঝামেলা পোহাতে পারব না।’ দায় এড়িয়ে গেলেও টায়ার পোড়ানোর কারখানাটিকে পাহাড়ের ভিতরের একটি জনমানবশূন্য এলাকা আখ্যা দিয়ে পরিবেশের তেমন সমস্যা হবে না বলে দাবি করেন খায়রুল বশর চৌধুরী। একপর্যায়ে পরিবেশ অধিদপ্তর তার থেকে বয়সে অনেক ছোট বলেও উল্লেখ করে তিনি। খায়রুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘আমার বয়স ৬৫ আর পরিবেশ অধিদপ্তর হয়েছে মাত্র ৮-১০ বছর হবে। পরিবেশের তখনো জন্মই হয়নি।’ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেই পরিবেশ দূষণের বিষয়টিকে সামান্য বলেই উড়িয়ে দেন পরিবেশ দূষণে সহায়তাকারী এ ব্যক্তি।

এসএস ইন্ডাস্ট্রিজের অন্যতম মালিক জহিরুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কর্ম তো আর নেই দেশে। কী করব? এই ব্যবসাটা করলাম। এখন যদি আপনারা এরকম ডিস্টার্ব করেন তাহলে কেমনে হবে।’ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে কিনা জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাড়পত্র আমরা নিয়েছি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রটি এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। আমাদের সাথে টায়ার পোড়ার কারখানায় অংশিদার হিসেবে মোস্তাফিজ নামে পুলিশের একজন এসপিও আছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ, আমাদের ব্যবসাকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন।’

তবে পুলিশের ওই এসপি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে কোন তথ্য না দিয়েই ফোন কেটে দেন জহিরুল। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসায়ের কোন প্রকার বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন তিনি।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এস এস ইন্ডাস্ট্রিজের টায়ার পোড়ানোর ফলে প্রতিনিয়ত বাতাসে মিশছে কার্বন মনো অক্সাইড, নাইট্রোজেন ও মিথেনসহ ১৬ ধরণের রাসায়নিক ক্ষতিকারক গ্যাস। এসব গ্যাস সৃষ্টির মাধ্যমে বায়ু, পানি, মাটিসহ পরিবেশের সব উপাদান যেমন দূষিত হচ্ছে তেমনি মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র্যও। বন্যপ্রাণিদের আবাসস্থলও ধ্বংস হচ্ছে। মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ওই এলাকার জনস্বাস্থ্য।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহাদাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে তার দপ্তরে বলেন, ‘টায়ার পুড়িয়ে সড়ক নিম্নমানের আলকাতরা তৈরি করা হয়- সীতাকুণ্ডে এমনটা হচ্ছে এ বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। এটি পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক যেই-ই হোক পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি করে ব্যবসা করা যাবে না। আমি কারখানাটি পরিদর্শন করব এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মফিদুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি এইমাত্র জানতে পারলাম৷ আমরা এটি আমলে নিয়েছি এবং তদন্তপূর্বক দ্রুত ব্যবস্থা নেব। পরিবেশ দূষণকারীদের কোন ছাড় নয়।’