
জিন্নাত আয়ুব, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামে কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় (কেইপিজেড) পাহাড় কাটা থামছেই না। ইপিজেডের ভেতর পাহাড়ের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলুপ্ত করে গড়ে তোলা হচ্ছে শিল্পপ্লট, কারখানা, ভবন। তবে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই পাহাড় কাটছেন তারা।
৯০-এর দশকের শেষ সময়ে অনুমোদন পাওয়া কোরিয়ান ইপিজেড নামের প্রকল্পটির আয়তন প্রায় আড়াই হাজার একর। বিশাল এই এলাকার ৭০ শতাংশ ভূমি পাহাড়ি। বিশাল বিশাল এই পাহাড়গুলো কেটেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে ২৭টি শিল্প কারখানা। পরিকল্পনাধীন আছে আরও ৪৫টি কারখানা। কোরিয়ান ইপিজেড পাহাড় কাটার অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু পাহাড়কাটা থামেনি।
শনিবার (২৯ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, কেইপিজেড এলাকায় এস্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি অপসারণ করে সমতল করা হচ্ছে। যদিও এসব কাজ করা হচ্ছে দিনের পর দিন। কর্ণফুলীর বড়উঠান এলাকা থেকে আনোয়ারা বৈরাগ পর্যন্ত উঁচু পাহাড়গুলোর সেই রূপ এখন বিলুপ্ত। বাকি যে টিলা পাহাড়গুলো রয়েছে এসব কেটে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে ভরাট করছে গড়ে তোলা হচ্ছে কারখানা, ভবন ও রাস্তা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, আনোয়ারা-কর্ণফুলীর দেয়াং পাহাড়ে গড়ে উঠেছে কেইপিজেড। এখানে একসময় ৪০ হতে ৬০ ফুটেরও অধিক উঁচু পাহাড় ছিল। সমানে পাহাড় কেটে সমতল করে কারখানা গড়ে তুলেছে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ইপিজেডে চারটি টেক্সটাইল জোন, একটি আইটি জোন ও মহিলা শ্রমিকদের জন্য ডরমিটরিসহ ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ পাহাড়ের পাদদেশে টার্ফিং, স্ট্যাবিলাইজিং, সিল্ট ট্র্যাপ ইত্যাদি ব্যবস্থা না নিয়েই ভূমি উন্নয়নের নামে এসব পাহাড় কেটে যাচ্ছে সমানে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে যখন দেয়াং পাহাড় অক্ষত ছিল তখন আমাদের বসতবাড়িতে কখনো হাতি আসতো না। কেইপিজেড হওয়ার পর একের পর এক পাহাড়গুলো কেটে শেষ করছে তারা। এখন বন্য প্রাণীগুলো তাদের বাসস্থান হারিয়ে প্রতিদিন চলে আসে লোকালয়ে। মিল কারখানা দিয়ে কী করবো, শান্তিতে থাকতে না পারলে। কেইপিজেড দেয়াং পাহাড়গুলো কেটে মাঠ বানিয়ে ফেলছে।’
বৈরাগ এলাকার বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘দেয়াং পাহাড় এখন নামে আছে, উঁচু পাহাড়গুলো তো কেটে সমতল করে দিচ্ছে কেইপিজেড। তারা যেভাবে পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে আগামী কয়েক বছর পর পাহাড়ের নিশানাও থাকবে না।’
কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘কেইপিজেড দেয়াং পাহাড়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তাদের বেপরোয়া পাহাড় কর্তনের মাশুল দিতে হচ্ছে স্থানীয়দের। বর্ষার সময় এখন পানি সরাসরি চলে আসে মানুষের ঘরবাড়িতে। এসব নিয়ে গত বর্ষায়ও আমার সঙ্গে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের বেশ বাকবিতণ্ডা হয়েছে। পরে তারা বলেছে, সামনে থেকে পানি লোকালয়ে না নামার ব্যবস্থা করবে।’

এদিকে ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কেইপিজেডকে দেওয়া ছাড়পত্রে উল্লেখ আছে, প্রয়োজনে শুধু পাহাড় মোচনের অনুমতি আছে, কিন্তু কাটার অনুমতি নেই। এরপরও দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে দেয়াং পাহাড়কে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ ধ্বংস করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ ধারা ৬ এর (খ) স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতৃর্ক সরকারী বা আধা-সরকারী বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না। তবে কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ দাবি করে আসছে, তারা যে পাহাড় কেটেছে, তার অনুমতি আগে থেকে নেওয়া আছে।
কেইপিজেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. মুশফিকুর রহমান শনিবার বিকেলে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা যে পাহাড়গুলো কাটছি। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়েই কাটছি।’ এর বেশি কিছু বলেননি তিনি। রোববার সকালে মুশফিকুর রহমানের মুঠোফোনে কল করা হলে পরিচয় পেয়ে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ড. এ.টি.এম. মাহবুবুল করিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কেইপিজেডকে পাহাড় কাটার অনুমতি কখনো দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনে উঁচু পাহাড়কে মোচন করতে পারবে। পাহাড় কেটে অন্য জায়গা ভরাট করার অনুমতি কখনো দেওয়া হয়নি, এতে পরিবেশের বিপর্যয় হবে।’ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুফিদুল আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কেইপিজেডে পাহাড় কাটার বিষয়ে সদর দপ্তর থেকেও আমাকে অবগত করা হয়েছে। বিষয়টি অনুসন্ধান করে দ্রুত কেইপিজেড কর্তৃপক্ষকে আমরা তলব করব।’