রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

চাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভীতি!

| প্রকাশিতঃ ১৯ মে ২০১৭ | ১:৫৬ পূর্বাহ্ন

সাজ্জাদ হোসাইন : দীর্ঘ ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের খবর নেই। এখন শ্রেফ ৩ তলার একটি ভবন হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে চাকসু ভবন।

চা-নাস্তা, ক্লাসফাঁকে খেলাধুলা আর আড্ডার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ হাজার শিক্ষার্থীর অধিকার আদায়ের এই সূতিকাগারটি।

১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নাগরিক জীবনে সত্যিকারের নেতৃত্ব প্রদান ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল এই চাকসু।

শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের মানসিক সংস্কৃতির বিকাশ, সর্বোপরি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্যই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ছাত্রসংগঠনগুলোর বারবার সংঘর্ষ, একে অপরের প্রতি বিভেদ, অনাস্থা এবং পারস্পরিক অসহিষ্ণু অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র ‘চাকসু’ দীর্ঘ ২৭ বছর যাবত বন্ধ।

নানা অজুহাত আর আশ্বাস যেন চাকসু নির্বাচনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে লেগেই আছে। তাই দীর্ঘ ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও চাকসু নির্বাচনের কোনো নামগন্ধ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়। একই বছর ২২ ডিসেম্বর স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামের মদদপুষ্ট ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ক্যাডারদের হাতে নিহত হন ছাত্রঐক্য নেতা ফারুকুজ্জামান। এরপর চাকসু কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এভাবে দেড় যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্লাটফর্ম ‘চাকসু’ আর নির্বাচনের মুখ দেখেনি।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী সমিতি এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের নির্বাচন প্রতিবছর বেশ জাঁকজমকভাবে যথাসময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। শুধু হয় না শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের ছাত্র সংসদ চাকসুর নির্বাচন। একের পর এক উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণ করলেও শুধু তাঁদের আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকে চাকসু নির্বাচনের গতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বলে আসছেন পরিবেশ, পরিস্থিতি তথা ছাত্রসংগঠনগুলো সহাবস্থানে থাকার নিশ্চয়তা দিলে কেবল চাকসু নির্বাচন সম্ভব।

চাকসু নির্বাচন কেন হচ্ছে না জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. কামরুল হুদা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চাকসু নির্বাচন বিষয়ে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। তাই ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশের নিশ্চিয়তা দিলে তখন প্রশাসন অবশ্যই নির্বাচন দিবে।’

এর আগে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় চাকসুর ১৯৭০ সালে। এ নির্বাচনে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন শহীদ আবদুর রব ও জিএস হন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। পরের বছর ১৯৭২ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে ভিপি হন শমসুজ্জামান হীরা ও জিএস হন মাহমুদুল রহমান মান্না, ১৯৭৪ সালের তৃতীয় নির্বাচনে ভিপি হন এস এম ফজলুল হক ও জিএস হন গোলাম জিলানী চৌধুরী, ১৯৭৯ সালের চতুর্থ নির্বাচনে ভিপি হন মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী ও জিএস হন জমির চৌধুরী, ১৯৮১ সালের পঞ্চম নির্বাচনে ভিপি হন জসিম উদ্দিন সরকার ও জিএস হন আবদুল গাফফার এবং সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিপি নির্বাচিত হন নাজিম উদ্দিন ও জিএস হন আজিম উদ্দিন। এ হিসেবে সর্বমোট ৬ বার চাকসু নির্বাচন হয়। মাঝে দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আর চাকসু নির্বাচন হয়নি।

এদিকে রাষ্ট্র শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে যাদের জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে সেই ছাত্রছাত্রীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কেন্দ্রন্থল চাকসু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন এক ধরনের অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে। একদিকে পদাধিকার বলে চাকসুর পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি সিনেট মেম্বার হয়ে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে দেয়াসহ নানা অন্যায়ের কথা যেমন বলতে পারছে না তেমনি অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের প্রাণ চাকসু চালু না থাকায় বিতর্ক, খেলাধুলাসহ শিক্ষার্থীদের শিল্প সাহিত্যের বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চাকসু নির্বাচন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মুহিবুল্লাহ বলেন, ‘চাকসু আমাদের ২২ হাজার শিক্ষার্থীদের কথা বলার জায়গা। অথচ ভর্তি হওয়ার পর কোনোদিন চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখিনি। তাই আমরা চাই দ্রুত এ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের অধিকার ফিরে পাক।’

তবে ছাত্রসংগঠনগুলো বারবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট চাকসু নির্বাচনের তাগাদা দিলেও তারা নির্বাচন না হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফেলতিকে দায়ী করে আসছেন। আর ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষই নির্বাচনের পরিবেশ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বলে দায়ী করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

চাকসু নির্বাচন নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদ্য স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সবসময় চাকসু নির্বাচনের পক্ষে। তাই বারবার ছাত্রদের অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম এই চাকসু নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু প্রশাসন শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, অফিসার্স, কর্মচারী সমিতি এসবের নির্বাচন হতে পারলে চাকসু নির্বাচনও অবশ্যই হওয়া দরকার।’

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদি হাসান নোবেল বলেন, ‘চাকসু নির্বাচন না হওয়ার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে দায়ী। আমরা প্রশাসনের কাছে এ নির্বাচন নিয়ে বারবার তাগাদা দিলেও তারা ছাত্রদের অধিকারের প্রতি কর্ণপাত করছে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্বাচনের পরিবেশ নেই এমন অভিমত প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজ। মূলত ছাত্র প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছাত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করার সুযোগ পাবে ভেবেই প্রশাসন ইচ্ছে করে চাকসু নির্বাচন স্থগিত রেখেছে।

বর্তমান চাকসু ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, চাকসুর নিচতলার এক পাশে শুধু চা, নাস্তা ও দুপুরের খিচুড়ি খাওয়া-দাওয়া হয়; অন্য পাশ ফাঁকা পড়ে আছে। দ্বিতীয়তলার এক পাশে পত্রিকা-ম্যাগাজিন পড়ার ব্যবস্থা আছে, অন্য পাশ ছাত্রীদের কমন রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তৃতীয় তলায় বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি, বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে।

কিন্তু চাকসু কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও প্রতিবছর প্রথম বর্ষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত ইউনিয়ন ফি বাবদ ৫৫ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এ হিসেবে প্রতি বছর দেড় লাখ টাকারও অধিক ফি নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

চাকসু নির্বাচন না হওয়ার বিষয়ে চাকসু কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. তৌহিদ ওসমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এখতিয়ার। তবে আমরাও চাই শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার বড় প্লাটফরম চাকসুর নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন হোক।’

প্রসঙ্গত, চাকসুতে বর্তমানে কর্মরত আছেন পরিচালক, সহকারী পরিচালকসহ ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।