শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

শরীর বন্দনা!

| প্রকাশিতঃ ৩১ জানুয়ারী ২০২২ | ৬:২২ অপরাহ্ন


শান্তনু চৌধুরী : এদেশের বেশীরভাগ পুরুষের চোখে অশ্লীল, গোপনীয়, লজ্জার বিষয়টি হচ্ছে নারীর যৌনাঙ্গ। যারা নারীর যৌনাঙ্গ বলতে শুধু ভ্যাজাইনা বা যোনীকে বোঝেন তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি- নারীর যৌনাঙ্গের ওপর একটি ক্ষুদ্র ত্রিকোণাকার অঙ্গ থাকে যেটির নাম ভগাঙ্কুর। নারীর স্বমেহন বা মাস্টারবেশান মূলত ভগাঙ্কুরকে ঘিরেই। এটির ওপর আঙুলের স্পর্শেই জেগে উঠতে পারে নারী শরীর, ঘটতে পারে অর্গাজম। অর্গাজমের বাংলা নাম হচ্ছে রেতঃপাত। মানুষ মঙ্গলে বসতি স্থাপনের চিন্তা করছে, তারায় তারায় রটিয়ে দিচ্ছে তার জয়ধ্বনি অথচ নিজের শরীরের রহস্য কতোটা আবিষ্কার করতে পেরেছে?

হতভম্ব হবার মতন বিষয় হচ্ছে নারী শরীরের ভগাঙ্কুর আবিষ্কার হয়েছে বলতে গেলে অনেক সম্প্রতি। রিয়াল্ডো কলাম্ব নামের ইতালীয় একজন ডাক্তার ১৫৫৯ সালে একটি ডাক্তারি বই লেখেন। বইতে তিনি ভগাঙ্কুরের কথা উল্লেখ করেন, আরও বলেন- এটি একটি সুন্দর এবং দরকারি জিনিস। এরও দুইবছর পর ১৫৬১ সালে গ্যাব্রিয়েলো ফেলোপিন্ড নামের আরেক ইতালীয় ডাক্তার দাবি করেন তিনিই প্রথম ভগাঙ্কুর আবিষ্কার করেছেন!

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় খোদ উপমহাদেশের নারীদের এই অঙ্গটি কেটে নেওয়ার প্রচলন ছিল দুইশ বছর আগেও। আফ্রিকান উপজাতিদের মধ্যে ব্যাপারটি আরও প্রচলিত ছিল। তারা নারীকে যৌন আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে এটি করতো। তবে অবাক হতে হয় যখন দেখি ইউরোপের মতন জায়গায় উনিশ শতকেও চলেছে ভগাঙ্কুর ছেদন! আরও অবাক করা হচ্ছে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতন লোক বলেছেন- নারী শরীরের যোনি থেকে ভগাঙ্কুর ছেদন করা উচিত! এক্ষেত্রে তার যুক্তি হচ্ছে- নারী যদি নিজেই নিজের শরীর থেকে যৌন আনন্দ পেতে পারে তাহলে তার কাছে পুরুষ সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা কমবে। পুরুষ সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা কমে গেলে সমকাম মাত্রাতিরিক্ত হয়ে উঠতে পারে! জীনানুক্রমে বয়ে আনা পুরুষতন্ত্র যে সিগমুন্ড ফ্রয়েডকেও ছাড়েনি তার যথার্থ প্রমাণ এটি।

এ বিষয়ে জানতে জানতে ফেসবুকে একজনের স্ট্যাটাস দেখছিলাম। নামটি মনে নেই। তবে চিঠি দিও পাঠকদের জন্য সেটি কপি করে রেখেছিলাম। এখানে তা তুলে দিচ্ছি। ‘একবার কোচিং ক্লাসে কারেন্ট ছিলও না, আইপিএস নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচণ্ড গরমে ক্লাস করছি। ছেলেরা শার্টের বোতাম খুলে বসেছে। অন্যদিকে মেয়েরা সেলোয়ার কামিজ, ওড়না, হিজাব আরও ভালোভাবে পেঁচিয়ে বসেছে। কারণ ঘামে ভিজে যদি ভিতরের কিছু দেখা যায়! আমি শার্টের একটা বোতাম খুলে বসলাম দেখে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কী ইতু? খুব গরম লাগছে নাকি? আমি আরও দুটো বোতাম খুলতে খুলতে উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ স্যার’। হয়তো ভেবেছিলেন, আমি স্যারের প্রশ্নে বিব্রত হয়ে বোতামটা লাগিয়ে নেবো। কিন্তু উল্টো আমাকে আরও দুটো বোতাম খুলতে দেখে স্যার-ই মনে হয় খানিকটা বিব্রত হয়েছিলেন।

আমি আমার শরীর নিয়ে একটুও লজ্জিত নই। ছেলে ও মেয়ে বেড়ে উঠতে থাকলে ছেলেটির স্বাধীনতা বাড়তে থাকে, আর মেয়েটির কমতে থাকে। মেয়েটির স্বাধীনতা কমে মেয়েটির শরীরের কারণে। শরীর নিয়ে ভয়। এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল, বাজে ইঙ্গিত করল, ধর্ষণ করতে এলো। আমি ভেবে পাই না সারাক্ষণ এসব চিন্তা মাথায় নিয়ে মেয়েরা বাঁচে কীভাবে? অনেকের কাছে শুনি, নারী স্বাধীনতা মানেই কি শরীরের স্বাধীনতা? অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চাও, শিক্ষার অধিকার চাও ঠিক আছে। কিন্তু শরীরের স্বাধীনতা চেও না। শরীরটা পুরুষের কাছে বন্ধক রেখে বাকি স্বাধীনতা চাও। কিন্তু আমার মতে নারী যতদিন নিজের শরীরকে পুরুষতান্ত্রিক শেকল থেকে মুক্ত করতে না পারছে, ততদিন নারীর কোনও স্বাধীনতাই আসবে না।

ধরুন, একজন শিক্ষিত মেয়ে। অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন। সেও কিন্তু রাতের অন্ধকারে, ভিড়ের মাঝে পুরুষের নষ্ট মানসিকতা থেকে রক্ষা পায় না। ওই সচ্ছল মেয়েটিও ধর্ষণের শিকার হলে তার অন্যসব পরিচয় মুছে গিয়ে তার পরিচয় হবে ‘একজন ধর্ষিতা’। আর যতদিন পুরুষ নারীর শরীরকে নিজেদের সম্পত্তি বলে মনে করছে ততদিন এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। আমি বাসায় গরমকালে সেন্ডোগেঞ্জি পরি। ছোটবেলায় এটা নিয়ে কারও আপত্তি না থাকলেও ধীরে ধীরে পরিবারের সবার আপত্তি শুরু হল। এই পোশাক পরে দরজা খুলতে যাবে না।

একদিন বাসায় এক আত্মীয় এলে আমাকে বলা হল, ‘যাও গিয়ে নমস্কার করে এসো’। আমি তো আমার পোশাকেই রওনা হলাম। মা থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উপরে কিছু একটা পরে নাও’। আমি রেগে গিয়ে বললাম, ‘যেই লোকের আমাকে সেন্ডোগেঞ্জি পরা অবস্থায় দেখলে মাথায় বদ মতলব আসতে পারে বলে তোমার মনে হয় তাকে আমি নমস্কার করতে যাবো? অসম্ভব’। লেখাটি পড়তে পড়তে ভাবছিলাম পুরুষরা এমন কেন? তাদের সবকিছুতে বদ মতলব।

সবকিছুতে তাড়াহুড়ো। এই যেমন, কৃত্তিবাসী রামায়ণ মতে, দশরথ নাকি তার দুই স্ত্রী কৈশল্যা আর কেকৈয়ীকে না জানিয়ে মগধের মেয়ে সুমিত্রাকে বিয়ে করার জন্য গিয়েছিলেন সিংহলে। সেখানে গিয়ে তিনি বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ, শুভ দৃষ্টি, বাসি বিয়ে সবকিছুই শাস্ত্র মতে করেছিলেন। কিন্তু সুমিত্রাকে নিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসার সময় দশরথ আর স্থির থাকতে পারলেন না। ‘বৃলম্ব না সহে রাজা করেন ইচ্ছাচার-রথের ওপর রাজা করেন শৃঙ্গার’। সেদিন ছিল বিয়ের কালরাত্রি। এই ধৈর্যচ্যুতির ফল কিন্তু পেতে হয়েছে সুমিত্রাকাকে, দশরথের কিছুই হয়নি।

আমাদের দেশে যৌনশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বেশ সচেতনতার আওয়াজ তুলছেন বোদ্ধামহল। এটা সত্যি প্রয়োজন। শুধু এই দেশে কেন, সবদেশের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। পড়ুয়াদের যৌনশিক্ষায় পর্নোগ্রাফিকে বিষয় হিসেবে ঢোকানোর পক্ষে সওয়াল করেছেন আমেরিকার পর্ন-তারকা অ্যালিক্স লিংক্স। তার মতে, পর্ন নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে সমাজে ভ্রান্ত ধারণাও কম নয়। অনেকে আবার এই ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে সরব। তবে এ নিয়ে লুকোছাপা করাটা মোটেও কাজের কথা নয়। তা বাস্তবের থেকে মুখ ফেরানোর সমতুল্য হবে।

পর্নোগ্রাফিক বিষয়বস্তুকে যৌনশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলা অ্যালিক্সের মতে, ‘পর্নোগ্রাফিক বিষয় নিয়ে যৌনশিক্ষায় খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত। আর পাঁচটা সিনেমা বা ভিডিয়ো গেমসের মতো এটিও যে একটি কাল্পনিক বিনোদনের জগৎ, বাস্তবে তা আলোচিত হয় না। সে কথা সকলের বোঝা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যৌন সম্পর্কের আগে সঙ্গীর সম্মতিও যে জরুরি, তা বোঝাতেও পর্নোগ্রাফিক বিষয়বস্তুর উপর এই ‘নিষিদ্ধ’ তকমা হঠানো প্রয়োজন’।

শান্তনু চৌধুরী: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক