
শান্তনু চৌধুরী : একটি বিষয় নিয়ে লিখতে না লিখতেই আরেকটি বিষয় এসে হাজির হয় আমাদের দেশে। ইস্যুর যেন অভাব নেই। তবে এই কলাম যেহেতু হালকা বিষয় নিয়ে লিখি তাই এবার হালকা বাতাসে দোল খাওয়া লুঙ্গি নিয়ে লিখছি। যে লুঙ্গিতে কিছুদিন আগে টান দিয়েছিলেন নির্বাসিত ও বিতর্কিত লেখক তসলিমা নাসরিন। আর এতেই আমরা সবাই কাছা বেঁধে নেমে পড়লাম পক্ষে বিপক্ষে। নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পোস্টে তসলিমা লেখেন, ‘পুরুষের লুঙ্গিটাকে আমার খুব অশ্লীল পোশাক বলে মনে হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে যে পুরুষেরা লুঙ্গি পরে, তাদের বেশির ভাগই কোনো আন্ডারওয়্যার পরে না, লুঙ্গিটাকে অহেতুক খোলে আবার গিঁট দিয়ে বাঁধে। কখনো আবার গিঁট ছুটে গিয়ে হাঁটুর কাছে বা গোড়ালির কাছে চলে যায় লুঙ্গি।’ লুঙ্গিতে অভ্যস্ত পুরুষদের নিয়ে পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ‘তা ছাড়া লুঙ্গি পরার পরই শুরু হয় তাদের অঙ্গ চুলকানো। ডানে বামে পেছনে সামনে এত কেন চুলকায় কে জানে। সামনে মানুষ থাকলেও তারা অঙ্গ অণ্ড কিছুই চুলকানো বন্ধ করে না, না চুলকালেও ওগুলো ধরে রাখার, বা ক্ষণে ক্ষণে ওগুলো আছে কি না পরখ করে দেখার অভ্যাস কিছুতেই ত্যাগ করতে পারে না। পরখ করার ফ্রিকোয়েন্সি অবশ্য মেয়েদের দেখলে বেশ বেড়ে যায়।’
হঠাৎ এই লেখিকা কেন লুঙ্গি নিয়ে এতো খ্যাপলেন তা অবশ্য জানা গেলো না। দীর্ঘদিনের পোশাক, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, দেশের বিখ্যাত লোকজন পরেছেন এমনকি পৃথিবীর নানা দেশেও এটি জনপ্রিয় এমনটি একটি পোশাক কেন তসলিমার লক্ষ্যবস্তু হলো তা বোধগম্য নয়। সেই ছোটবেলায় প্রথম হাতে আসা ব্যাকরণ বইতেও আমরা বারবার পড়েছি, খোদ লুঙ্গি শব্দটিই হলো বর্মি ভাষার বার্মা বা মিয়ানমার ‘হইতে আগত’। বার্মা মুলুকের প্রচলিত প্রাচীন প্রবাদ আছে, ‘যে পুরুষ পরতে জানে না সে আদতে অন্ধ, আর যে নারী লুঙ্গি বুনতে জানে না সে আদতে খোঁড়া’। কথাটি যে অতি বাজে নোংরা একপেশে পুরুষতান্ত্রিক বচন তাতে সন্দেহ নেই। তবে এ থেকে বার্মাবাসীর লুঙ্গিপ্রীতির একটা দিকও বেশ বোঝা যায়। সেখানে আজো নারীপুরুষ উভয়েরই প্রিয় স্বাচ্ছন্দ্যময় পোশাক লুঙ্গি। তবে আজব ব্যাপার কী, লুঙ্গিকে বার্মায় আগে লুঙ্গি বলে ডাকা হতো না।
লুঙ্গির সঙ্গে সাগর নদী বা জলাভূমির একটা প্রাথমিক যোগ আছে বলেই মনে হয়। দক্ষিণ ভারত, বাংলা মুলুক কি বার্মালুঙ্গিপ্রিয় সব জায়গাই তো জলে ঘেরা। শ্যামদেশ বা থাইল্যান্ডের কথা দিয়ে শুরু করা যাক। শ্যামদেশে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রিয় পোশাক লুঙ্গি।মালয়েশিয়ায় ইন্দোনেশিয়ায়ও লুঙ্গি অনেকেই পরে। ইন্দোনেশিয়া জাভা অঞ্চলে ‘সারং’ নামে লুঙ্গির চল আছে।ফিলিপাইনেও লুঙ্গির নানা নাম। কোনো এলাকায় তার নাম ‘টাপি’, কোথাও ‘পাতাডাইয়ং’ বা ‘মালং’। সেসবের মাপও বহু রকমের। কোনোটি হাঁটু অবধি, কোনোটি পা পর্যন্ত। শ্রীলংকা ও মালদ্বীপেও লুঙ্গির চল নেহাত অন্যূন নয়। মালদ্বীপে লুঙ্গিকে ডাকা হয় ‘মুন্ডু’ নামে। সেই সুদূর আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায়ও লুঙ্গি পরা হয়। শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বহুকাল আগে থেকেই সোমালিয়ায় তো বটেই, আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মাওয়াই নৃগোষ্ঠীর মানুষ রঙিন লুঙ্গি পরতে ভালোবাসে। এক প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক রাতে সুতির লুঙ্গি না পরে ঘুমোতে পারেন না। তো মার্কিন মুলুকের এক শহরে সাহিত্যানুষ্ঠানের দাওয়াতে গিয়ে হলো বিপদ। সঙ্গে তার লুঙ্গি নেই! খোঁজটোজ করে দেখা গেল ওই শহরে বার্মিজ লুঙ্গি প্রচুর মেলে, কারণ শহরভর্তি বর্মি ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অভিবাসী। পরে দূরের এক বাঙালি অধ্যুষিত শহরে বহু মাইল গাড়ি চালিয়ে গিয়ে সুতির ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লুঙ্গি কথাসাহিত্যিককে এনে দিলেন এক আয়োজক। অতঃপর তিনি আরামসে ঘুমোতে যেতে পারলেন।
৮০০ বছর আগে লুঙ্গির সূচনা হয়েছিল ভারতের তামিলনাড়ুতে। ‘ভেশতি’ নামক এক ধরনের পোশাককে লুঙ্গির পূর্বসূরি বলে মনে করা হয়। অবশ্য এই উৎসকথা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। সময়ের বদলের সঙ্গে সাদা কাপড়ে ফুল এবং অন্যান্য নকশা চিত্রিত হয়ে ভেশতি থেকে একসময় লুঙ্গির সৃষ্টি হয়েছে। এই ভেশতি বা লুঙ্গি তামিলভূমিতে এসেছিল মালয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে লুঙ্গি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় গমন করে। তারপর ১৬১২ সালে ডাচরা ভারতবর্ষে আগমন করার সময় থেকে বহির্বিশ্বে লুঙ্গি রফতানি করা শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে ব্রিটিশরা। অঞ্চল বিশেষে লুঙ্গির অনেক নাম আছে, যেমন ‘সারং, মুন্ডু, হামেইন, সারাম পিনন, মাওয়ালি, কিটেং, কঙ্গা, কাইকি।’তবে এ কথা সত্যি যে বর্তমানে বাংলাদেশের (হয়তো অন্য দেশেও) শহরকেন্দ্রিক তরুণ প্রজন্মের কাছে লুঙ্গির ব্যবহার কিংবা সমাদর নেই বললেই চলে। তারা লুঙ্গির ঐতিহ্য ও গৌরব ভুলতে বসেছে। কেননা তাদের কাছে লুঙ্গি হলো ‘খ্যাত’ এবং রাতে শোয়ার বস্ত্র হিসেবে লুঙ্গির স্থান দখল করেছে আভিজাত্যের প্রতীক পায়জামা।
পরিতাপের বিষয় যে কয়েক বছর আগে ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায় রিকশাওয়ালাদের জন্য লুঙ্গির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় যুবসমাজ প্রতিবাদ করে ‘লুঙ্গি পদযাত্রা’, যা ‘লুঙ্গি মার্চ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, বের করেছিল। পরে অবশ্য হাইকোর্টের নির্দেশে লুঙ্গির ওপর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে লুঙ্গি পরার অপরাধে ক্লাস থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রদি মুক্তি পাওয়া দক্ষিণ ভারতীয় ছবি ‘পুস্পা’তে আল্লু অর্জুনকে অসাধারণ কায়দায় লুঙ্গি পরতে দেখা গেছে। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পায় মনিরত্নমের নায়াকান। এক গুণ্ডার গডফাদার হয়ে ওঠার মেলোড্রামাটিক গল্প। গুণ্ডার চরিত্রে ছিলেন কমল হাসান।
লুঙ্গি পরে কমল তথা ভেলুর দারুণ সব দৃশ্য দর্শক ভুলবে না। এরপর ২০১৩ সালে লুঙ্গি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পপুলার কালচারে সবচেয়ে বড় উপস্থাপনাটি দেখা যায়। শাহরুখ খান ও দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত চেন্নাই এক্সপ্রেসের সুপারহিট গান ‘লুঙ্গি ড্যান্স’। লুঙ্গিকে এমন ট্রিবিউট মনে হয় না আর দেয়া হয়েছে। ব্রাত্য লুঙ্গি হয়ে উঠল অভিজাত মহলেরও বোল।‘পুরোনো লখনউ’ বইয়ে হালিমশরর জানাচ্ছেন, গোড়ার দিকে হিন্দুদের ধুতির মতো লুঙ্গিও সেলাইছাড়া ছিল। ইরাকের বাগদাদে আব্বাসীয় বংশ ক্ষমতায় আসার পর ভারতে ইসলামী প্রভাব বাড়ে। তার প্রভাবেই লুঙ্গিতে সেলাইয়ের ফোঁড় পড়ে।
‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির আউটডোর শুটিংয়ের স্মৃতিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন, ‘বৌদি (বিজয়া রায়) তাড়াহুড়োয় মানিকদার (সত্যজিৎ রায়) ব্যাগে পাজামা দিতে ভুলে গেছেন।…আমার একটা বিশাল বড় বার্মিজ লুঙ্গি ছিল।…বললাম…আপনি পরবেন? মানিক দা সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাব খারিজ করে দিলেন।…মধ্যরাতে দেখি ছোটরা যেমন বড়দের ডাকে সেই রকম প্রায় ভয়ে ভয়ে ডাকছেন,সৌমিত্র, তোমার সেই লুঙ্গিটা আছে?’ বাংলাদেশের আলোচিত নায়িকা পরীমণিতো লুঙ্গি পরে জন্মদিনের উৎসব পালন করে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল। তবে লুঙ্গি পরলে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। গিঁটটা বাঁধতে হবে শক্ত করে। নইলে যে হাওয়া পাওয়ার জন্য লুঙ্গি পরা হলো সেই হাওয়াই সর্বনাশে কারণ হতে পারে সবার সামনে!