শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

একবার ভালোবেসে দেখো…

| প্রকাশিতঃ ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২২ | ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন


শান্তনু চৌধুরী :

‘এত যে কাছে আসতে চাও
কতটুকু সংযম আছে তোমার?
এত যে ভালোবাসতে চাও
তার কতটুকু উত্তাপ সইতে পারবে তুমি?’- আবুল হাসান

প্রিয়ে,

জীবন আসলে বহতা নদীর মতো। কতোজন এলো গেলো, কতোজনই বা আসবে। কিন্তু যে যায় সে কি ফিরে আসে? মাঝে মাঝে মর্মন্তুদ দীর্ঘশ্বাস বলে দেয়, যারা গেছে তারা আর ফিরবে না। দীর্ঘ বিরতির পর তোমাকে লিখছি। কেমন আছ তুমি? একদম সাধারণ প্রশ্ন। যেটা দিয়ে অনেকদিন পর আমার মুছে যাওয়া দিনগুলোকে পিছু ফেরাতে চেয়েছ। শুনতে চেয়েছ কণ্ঠস্বর। একবার নাকি কবি শামসুর রাহমানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জীবন আপনাকে কি শিখিয়েছে? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবন শিখিয়েছে জীবনকে ছেড়ে যেতে নেই।’ এরপরও দেখো না জীবনের কতো কিছুই তো আমরা ছেড়ে গেছি। জীবনও ছেড়ে দিয়েছে অনেক কিছু। গায়ক অঞ্জন দত্তকে পুরনো গিটার দিয়েছে অনেক কিছু। হুট করে কাউকে ভালোলাগা, ভালোবাসা। ফেলে আসা কতো গান, নাম ঠিকানা।

তবে কবি শ্রীজাতের কথাগুলো একটু পরিবর্তন করে মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই কতোকাল আগে কেনা মুঠোফোনের নাম্বারটা এখনো আমার কাছে রয়ে গেছে। ভাবি, কত লোক ছেড়ে গেছে, সে তো যায়নি। অথচ সে আসলে পারমুটেশন আর কম্বিনেশনের একটা সম্ভাবনা মাত্র। হঠাৎ মনে হয়, এগারো সংখ্যার এই নম্বরের তৃতীয় সংখ্যাটি পাল্টে গেলে যার টেলিফোন নম্বর পাওয়া যাবে, সে হয়তো পুলিশের এক কনস্টেবল। আজ তার ঘুষ ঠিকমতো জুটেনি বলে খুব বিরক্ত। বাসায় ফিরতে হবে খালি হাতে। শিশু, বৃদ্ধা মায়ের জন্য কিছুই নিতে পারবে না। সপ্তম সংখ্যাটি বদলে দিলেই পাওয়া যাবে বৃদ্ধাশ্রমের এক বৃদ্ধাকে, যিনি আজও তাঁর মস্তবড় অফিসার ছেলের আশায় পথ চেয়ে আছেন। অনেক রাত জেগে থাকেন ছেলে-মেয়ের ছবি বুকে নিয়ে।

আবার দ্বিতীয় সংখ্যাটা বদলে ফেললেই মিলবে কলেজ পড়ুয়া এক টিনএজ তরুণী যে প্রেমিককে শরীর দেবার জন্যে একটা ঘর খুঁজছে অনেকদিন ধরে। এইভাবে আমি দেখতে পাই এক উচ্চপদস্থ আমলা, এক বেশ্যার দালাল, এক উঠতি নায়িকা, এক তরুণ লেখক, বিজ্ঞাপনের এজেন্ট, সার্কাসদলের মালিক, এক সিনেমার এক্সট্রা, প্রমোটার ও আরও আরও আরও অনেককে। তারপর ভাবি, এই ক’টা নম্বর পরপর বসে থেকেই তৈরি করেছে আমাকে। এর মধ্যে যে কোনও একটা বদলে গেলেই আমি ছিটকে যেতে পারতাম যেখানে খুশি।

প্রিয়তমা, তোমাকে এখনো খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে। তুমিতো বলেছিলে আমার আলিঙ্গনের উষ্ণতা এনে দিতে পারেনি কেউ। এখন তুমি কোন অবস্থায় আছো জানি না। বাচ্চার ন্যাপি পরিস্কার করছো নাকি রান্নঘরে বেসন দিয়ে বেগুন ভাজি করতে গিয়ে বগল ভিজিয়ে ফেলছো? তাহলে কিন্তু তোমার কাছে আসতে আমার একটু সমস্যা হবেই। বাৎসায়ন বলছে, রতি বিলাস ক্রীড়ার জন্য কোমল ও পরিস্কার শয্যা প্রয়োজন। চারপাশে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকবে, চাঁদনি রাতে শীতল সমীর প্রবাহিত হবে, পাখির কুজন সঙ্গীত শোনা যাবে। তাম্বুল, মদিরা, পুস্পমাল্য, সুগন্ধিত দ্রব্যাদি উত্তম বস্ত্র এবং নবযৌবনা কামিনীর উপস্থিতি এই সমস্তই কামোদ্দীপনা উৎপন্ন করে। তোমারও কি উদ্দীপনা আসছে? আচ্ছা বলতো, একদিকে আমার প্রতি তীব্র অনুরাগ, প্রেম, অন্যদিকে ঘর সংসার এরপরও কি তোমার যৌনজীবন সুখের। প্রথম প্রেমের স্মৃতি কি সহজে ভোলা যায়?

পূর্ণিমা রাতে যখন পূর্ণ চাঁদের হাট বসে, তরুবীথি ঘেরা সুবাসিত উদ্যানে একা একা ঘুরে বেড়ানোর সময় হঠাৎ অতর্কিতে যদি কোনো যুবক সদ্য কিশোরোত্তীর্ণ মেয়েকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে, কোনো কথা নেই বার্তা নেই তার মুখটা মেয়েটির মুখের ওপর নামিয়ে এনে তার তৃষিত ওষ্টদ্বয় মেয়েটির উষ্ণ ওষ্টদ্বয়ের ওপর চেপে ধরে চুমু খায়, স্ফুরিতক চুম্বনে বৃষ্টিপড়া কদমের মতো কন্টকিত হয়ে ওঠে তার ওষ্টদ্বয়, তখন মেয়েটি কি করে বুঝবে যে সেটা তার প্রথম যৌন অনুভূতি। আর সেই হবে তার চুম্বনের প্রথম স্মৃতি। (লাভ এন্ড সেক্স অফ এ গুড গার্ল, ন্যান্সি ফ্রাইডে)।

এক সময় কোচিং ক্লাসের পছন্দের মেয়ের কাছে চিরকূট যেতো রসায়ন বই, পৃষ্টা নম্বর, ৫০। মেয়ে বই খুলে দেখত,‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…’। জবাবি চিরকূটে লিখে পাঠাত পদার্থবিদ্যা, পৃষ্টা-৬১। ‘তুমি খুশি থাক আমার পানে চেয়ে চেয়ে…।’ আবার কখনো লেখা হতো, ‘তেঁতুল পাতা, তেঁতুল পাতা, তেঁতুল বড় টক-তোমার সাথে প্রেম করতে আমার বড় শখ।’ ‘বাড়ির সামনে নারিকেলের চিকন চিকন পাতা-তুমি ছাড়া কারে বোঝাই এই মনের ব্যথা।’ ১৯৩৮ সালের দিকে রাধানাথ বিদ্যাবিনোদ ‘দাম্পত্যসুখচন্দ্রোদয়’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। তাতে দাম্পত্যসুখের নানা উপায়ের কথা বলা ছিল। নিয়মিত চিঠি লেখার পরামর্শও ছিল। প্রবাসী স্বামীকে চিঠি লিখে বেঁধে রাখার পরামর্শ। সরাসরি বউকে চিঠি লিখতে লজ্জা করলে কী করবেন? রাধানাথের পরামর্শ ছিল, ‘পতি যদি প্রবাসে থাকিবে, স্ত্রীকে পত্র দিবে। স্ত্রীকে যদি লজ্জাবশত পৃথক পত্র দিতে সংকোচ বোধ হয়, তবে গৃহকর্তার পত্রাভ্যন্তরেই স্ত্রীকে পত্র দিবে।…স্বামী সেই পত্রে সাংকেতিক বার্তা প্রয়োগ করিতে পারেন যাহা কেবল ওই দম্পতিই বুঝিবে।’ এমনই এক চিঠির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বাবাকে লেখা চিঠিতে ছেলে লিখল, ‘তোমার বউমাকে বলিও আমি মাঝে মাঝেই আরতির স্বপ্ন দেখি। ওর জন্য চাদর নিয়ে যাব।’

বাবা-মা ভাবলেন, ছেলের ধর্মে মতি হয়েছে বুঝি। আর বউমা রতি-লজ্জায় রাঙা হয়ে গেলেন। কারণ, তিনিই তো জানেন সংকেত। আরতির ‘আ’-টুকু বাদ দিতে হবে যে। আর ‘চাদর’ মানে আদর। চিঠি লেখার বিয়োগান্তক গল্পও আছে। ‘দুষ্টু প্রজাপতি’ সম্বোধন করে প্রতিদিন স্ত্রীকে চিঠি লিখতেন প্রবাসী স্বামী। স্ত্রীও ‘প্রাণ ভোমরা’-কে জবাব পাঠাতেন প্রতিদিন। হঠাৎ স্ত্রীর জবাব বন্ধ দেখে বাড়ি ফিরে মাথায় হাত স্বামীর। তারই চিঠি দিতে আসা ডাক-পিওনের সঙ্গে উড়ে গিয়েছে তার ‘দুষ্টু প্রজাপতি’। ‘ভুলো না আমায়’ লেখা চিঠি ফুলের পাপড়িসহ ভুল বানানে প্রেমপত্র পাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অনেকের হয়তো আছে। একজন মানুষ চিঠিতে তার জীবনের সবচেয়ে গোপন অথচ বেদনার কথাগুলো অকপটে বলে দিতে পারে। তেমনি পারে অন্যের বেদনাকে জাগিয়ে দিতেও। তাই তোমাকে আজও লিখি।

তোমার চোখের ওপর থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে নেওয়া, ঘুম থেকে ওঠার ঠিক পরের দৃশ্য। সদ্য ফোঁটা ফুলের মতো চোখ দুটো যখন একটু একটু করে খুলতে, রেস্টুরেন্টে বসে প্রিয় খাবারটি খাওয়ার সময়ে আমার দিকে যখন তুমি তাকাতে, কোনও কিছু ভাবার সময়ে যখন ঠোঁট কামড়াতে, প্রাণ খুলে হাসতে, স্নান করার পরে যখন বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা কপাল থেকে গড়িয়ে পড়তো তখন কী যে ভালো লাগতো, অথচ কতোদিন হয় সে দৃশ্য দেখা হয় না। নদী আর চাঁদ পাশাপাশি দেখা মিললে দস্যুর মতো চাঁদ যেমন ঝাঁপিয়ে পড়তো নদীর বুকে তোমার মনে আছে, সারারাত জুড়ে নদীর পাশাপাশি চাঁদের মতো লীলায় মাততাম আমরা। যেমন তরঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলিঙ্গনে অস্থির করে তুলতে আমাকে। প্রবাহিনী নদী চাঁদের আকর্ষণ হতে ছুটে চলছে। কী অসাধারণ সে রতি-রঙ্গ। বাহুর আকর্ষণ। উচ্ছ্বাসে, নৃত্যে, কলগীতিতে, হাস্যে নদী যেন নটী বিনোদিনী। আর এখন লীলা শেষে তুমি চলে গেলে পাহাড়ের আড়ালে। আর আমি ফেলছি দীর্ঘশ্বাস। কতোদামে কিনেছিলে পাহাড়টাকে? তাই এখন শুধু আরণ্যক বসুর মতো দীর্ঘশ্বাস।

‘পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক
আমরা তখন প্রেমে পড়বো
মনে থাকবে?’

শান্তনু চৌধুরী : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক