শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

উপায় নেই তাই মিনিমালিজম!

| প্রকাশিতঃ ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২২ | ৫:৩৯ অপরাহ্ন


শান্তনু চৌধুরী : বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী গেল সপ্তাহে বলেছেন, ভালো পোশাক পরা অনেককে এখন টিসিবির লাইনে দেখা যায়। কথাটা দ্বৈতঅর্থ বহন করে। এক. হতে পারে সার্মথ্য থাকার পরও কেউ লাইনে দাঁড়িয়েছেন, যেটি সম্ভবত মন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন। আরেকটি হচ্ছে মধ্যবিত্তের অবস্থাও এখন এতোটাই সঙ্গীন, তাদের একটু কম দামে পণ্য পাওয়ার আশায় টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। গেল দশ দিনে যদি আমরা গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে তাকায়, তবে বিষয়টি পরিস্কার হবে। মানুষের সত্যিকার অর্থে নাভিশ্বাস উঠছে নিত্যপণ্য কিনতে। স্বাভাবিকভাবে দুটো খেয়ে বেঁচে থাকার অধিকারও যে হারিয়ে বসেছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত। বাজারের কোথাও স্বস্তি নেই। কোথাও কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নাগালের মধ্যে নেই এবং সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথাও নেই বলে মনে হচ্ছে। বরং একেক সময় এমনসব বক্তব্য দিচ্ছেন তারা যা উল্টো হাস্যরসের সৃষ্টি করছে।

সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরছি এ প্রসঙ্গে-বাজারে এখন চালের দাম চড়া। ডাল, তেল ও চিনির দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বেড়েছে সাবান, টুথপেস্ট, প্রসাধন, টিস্যুসহ সংসারে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম। ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর পরিবহন ভাড়া এক লাফে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। করোনার কারণে গত বছর না বাড়ালেও এ বছর বাড়ির মালিকেরা বাসাভাড়া বাড়িয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের বেতন ও খাতা-কলমের দামও বাড়তি। আওয়ামী লীগ সরকার এই মেয়াদে দায়িত্ব নিয়েছিল ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ওই দিনের বাজারদরের তালিকা ও সাম্প্রতিক তালিকা ধরে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোটা চালের দাম ১৫, মোটা দানার মসুর ডাল ৭৭, খোলা সয়াবিন তেল ৫৪, চিনি ৪৯ ও আটার দাম ২১ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ভোজ্যতেলের কথা ধরা যাক। মধ্যম আয়ের পাঁচজনের একটি পরিবারে গড়পড়তা ৫ লিটার সয়াবিন তেল লাগে। টিসিবির হিসাবে, ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৪৬৫ থেকে ৫১০ টাকা, এখন তা ৭৪০ থেকে ৭৮০ টাকা। মানে হলো, শুধু সয়াবিন তেল কিনতে একটি পরিবারের ব্যয় বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। চার মাস আগেও একটি কাপড়কাচা সাবানের দাম ছিল ১৮ টাকা। এখন দাম ২২ টাকা। মাঝারি আকারের সুগন্ধি সাবানের দাম ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। ৪৫ টাকায় আধা কেজি গুঁড়া সাবান পাওয়া যেত। এখন তা ৫২ টাকা। দাঁত মাজার পেস্টের মাঝারি প্যাকের দাম ৩ টাকা বেড়ে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা হয়েছে। বেড়েছে টিস্যুর দামও। এমন হিসেব দিতে গেলে লিস্ট আরো লম্বা হবে।

মানুষ তাহলে কী করবে? টিকেতো থাকতে হবে, সে কারণে একটু লেখাপড়া জানা মানুষ ঝুঁকছে মিনিমালিজম এর দিকে। আমি নিজেও এ বিষয়ে একটু গুগল করলাম। নিজেও সেই পধে হাঁটছি। পাঠকদের সুবিধার্থে কিছু বিষয় তুলে ধরছি এখানে। মিনিমালিজম হলো জীবন থেকে অতিরিক্ত বা বাহুল্য সব কিছু কমিয়ে ফেলা। এবং ঠিক যেটা লাগবে, সেটা নিয়ে থাকা। খুব কম জিনিস নিয়ে জীবনযাপন করা। এটা শুধু কাপড় বা ঘরের আসবাবপত্রের জন্য প্রযোজ্য নয়। আমাদের জীবনে সময়টাকে যে সব ক্ষেত্রেই আমরা ব্যবহার করি সব কিছুর জন্যই প্রযোজ্য যেমন বন্ধু বান্ধব ,খাওয়া -দাওয়া, কাজ-কর্ম, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি।

মিনিমাল লিভিং এর প্রধান ধারণাই হলো আমার জীবনের ইচ্ছা গুলিকে বা শখ গুলিকে কমিয়ে এনে আমাদের মনকে নির্দিষ্ট এক দু’টা কাজে ফোকাস করতে সাহায্য করা। আর এই এক দু’টা কাজের ধরণ হলো জীবনের আত্মিক, মানুষিক বা শারীরিক উন্নয়নের প্রয়োজনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ‘মিনিমালিজম’ লিখে যদি আপনি গুগলে সার্চ করেন তাহলে দেখা যায় খুব সুন্দর গোছানো পরিপাটি ঘর এর ছবি। একটা খাট একটা টেবিল, পাশে একটা ফুলের টব। রান্না ঘরে মাত্র কয়েকটা ক্রোকারিজ। কাপড়ের আলমারিতে হাতে গোনা কয়েকটা কাপড়। সব কিছু ঝকঝকে পরিপাটি। আসলে এই মিনিমালিজম জীবন মানে আরো অনেক কিছু জীবন থেকে পরিপাটি করা। যেমন আমাদের ফেসবুকে বন্ধুদের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার এর মধ্যে সঠিক মানুষগুলোকে চিনে নেওয়া বাকিগুলো ডিলিট করে দেওয়া। ছেড়ে চলে যাওয়া খুব কাছের বন্ধুর প্রোফাইল লক করে রাখা। প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় দিয়ে এখানে সেখানে লাইক কমেন্ট করা বন্ধ করতে হবে। আমি যা পছন্দ করি বা আমার জীবন উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আছে এমন কিছু সাইট প্রতিদিন দেখা। এতে করে অস্তিরতা কমবে। হাতের এন্ড্রয়েড ফোন অপ্রয়োজনীয় সব এপস দিয়ে ভর্তি। নিজেকে প্রশ্ন করা, আসলেই এগুলো আমার কোন কাজে লাগে। না শুধুই ইন্সটল করেছি। যদি উপকারেই না আসে তাহলে আনস্টল করে দেওয়া।

এইভাবে আমাদের জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই এই মিনিমালিজম জীবন যাপন করাই মূল লক্ষ্য। এটা একটা চিন্তা পদ্ধতি, যেটা হতে অনেক কিছুই বাদ দিতে হবে, হয়ত অনেক কষ্ট হবে প্রথম কিন্তু হিসাবের খাতা যখন কমে আসবে জীবনে ততোই স্বাধীন অনুভব করা যাবে। জীবনের স্বাদ গ্রহণ কর, জীবনকে ইতিবাচক ভাবে উপভোগ করার মজা পাওয়া যাবে। এই দুনিয়ায় ভালো থাকা যাবে সাথে পরকালের হিসাবও কম থাকবে। বর্তমানের জন্য মিনিমালিজম জীবন বেঁচে নেওয়া উত্তম সময়। কারণ এই একটা গ্যাজেট ফোন আমাদের অনেকটা সময় কেড়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর-ওর জীবন দেখে নিজের সাথে তুলনা করে আমরা অস্থির হয়ে পড়ছি। শুধু তাই নয় হতাশার মত ভয়াবহ রোগ আমাদের ভিতরে দানা বাঁধছে। আমরা এখন এক্সেস বা অতিরিক্ত কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, কাউকে সাধারণভাবে চলতে দেখলে ব্যক্তিগত ভাবে এমন কী সামাজিক ভাবেও অপমান করি। এখন বিয়েতে অতিরিক্ত খরচ, অতিরিক্ত আড়ম্বর করা একদম গরীব থেকে বড়লোক পর্যন্ত কমন দৃশ্য। যখন একটা কাজ সংখ্যালঘু মানুষ করতে থাকে তখন বিষয়টা অনেক স্বাভাবিক হয়ে যায়।

একবার ভেবে দেখেন, যে টাকা এতে খরচ হয় তা যদি বিয়ের পরবর্তীতে খরচ করার জন্য নব দম্পত্তিকে দেওয়া যায়, সেটা কি ভালো নয়? লোকদেখানো কিছু কাজ যা অনেক সময় আমরা সামর্থ্য না থাকলেও করি, যোগ্যতা না থাকলেও আমরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগুতে চাই। এই বিষয়গুলা আমাদের এক সময় নিজের মনের ভেতর বিরক্তি, রাগ, ক্ষোভ, হতাশার সৃষ্টি করে। মিনিমালিস্টরা জীবনে বিনোদন থেকে পারপাস নিয়ে বেশি কাজ করে। তাই তো এক বাসায় একাধিক টিভি তাদের পছন্দ নয়। অহেতুক দামি ফোন পছন্দ নয়। যতোটুকু ভালো কোয়ালিটি হলে গাড়ি চলে ধারকর্জ ছাড়া সে রকম গাড়িই তাদের পছন্দ লেটেস্ট মডেল নয়। প্রয়োজন ছাড়া একটি সুতাও তারা রাখবে না।

শান্তনু চৌধুরী: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক