
শান্তনু চৌধুরী : কে না জানে ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস, ফেব্রুয়ারি লড়াই করে উদ্বিপ্ত হওয়ারও মাস। তবে এই মাসে যে বিষয়টি সবচেয়ে সুন্দর হয়ে উঠে সেটি হলো বই মেলা। চলতি বছর করোনার কারণে শঙ্কা জাগিয়ে মেলা শুরু হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ দিন পর। আমি ঢাকার অমর একুশে গ্রন্থমেলার কথা বলছি। এমনিতে জেলায় জেলায়ও চলছে মেলা। সবাই যতোই বলুক, ইন্টারনেট এর যুগে মানুষ বই পড়ে না। এটা কেন যেন মানতে মন চায় না। অন্তত বইমেলার ভিড় বা বিক্রির বহর দেখে সেটা মনে হয়।
এছাড়া দেশে বাতিঘর বা প্রথমা’র মতো প্রকাশনাগুলো বিক্রির জন্য জেলায় জেলায় তাদের দোকানের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে। বিক্রি না হলে নিশ্চয় বাড়াতো না। তার মানে মানুষ বই পড়ছে। এ প্রসঙ্গে লেখক বাদল সৈয়দ এর একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘বই পড়া ছেড়ে দেওয়া মানে মানসিকভাবে আত্মহত্যা করা’। তবে অনেকে পড়ার জন্য নয়, স্রেফ সাজিয়ে রাখার জন্যও বই কেনেন। কাজেই বাসায় বইয়ের স্তুপ থাকলেই যে পড়ুয়া এমনটি ভাবার কারণ নেই। এ প্রসঙ্গে একটা কৌতুক বলি।
শিক্ষক এক ছাত্রের কাছে মৌখিক পরীক্ষায় জানতে চান, ‘কপালকুণ্ডলার সাথে নবকুমারের বিয়ে হয়েছিল কিনা? জবাব এলো ‘হ্যাঁ’। দেনমোহর কতো ছিল? ‘এক লাখ টাকা।’ জবাব দিলেন ছাত্র।
এসব ঘটনা বলার কারণ হচ্ছে শিক্ষার খণ্ডিত চর্চা আমাদের যে অজানার গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে সেটা জানানো। এর মধ্যে এখন বেশিরভাগই পড়ছেন পরীক্ষা পাসের জন্য। জানার জন্য পড়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। জিপিএ ফাইভ পাওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে সবাই। ফলে মানবিক মানুষ গড়ে উঠছে না। সবাই শুধু ভুল-শুদ্ধ গাদা গাদা পড়ালেখা করে বই পড়ে ‘বই’ হচ্ছে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ভালো ছাত্র ছিলেন, অংকে ভালো নম্বর পেতেন আবার এমনো হয়েছে অনেক বিষয়ে তাঁর থার্ড ক্লাসও রয়েছে। অথচ তিনি রাজরীতির পাশাপাশি মেধার ক্ষেত্রে উদাহরণও হয়ে আছেন। আবার অনেক সময় দেখা যায়, শুধুমাত্র পরীক্ষা পাস করার জন্য যতোটুকু জানা দরকার সেটিই পড়ছে। শেক্সপিয়রের খণ্ডিত অংশ বা রবি ঠাকুর, বঙ্কিমের কোনো গল্প। কিন্তু কোনো সৃষ্টিশীল লেখকের পুরো সৃষ্টিকে সে জানছে না। শিক্ষকরা আগে যখন পড়াতে যেতেন বগলের নিচে বই দাবা করে যেতেন, এখন তেমন দেখা যায় না। এখন শিক্ষার্থীরাও প্রশ্ন খুঁজেন। সাজেশন চান।
একটি ভালো বই বদলে দিতে পারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। বইমেলায় গেলে দেখা হয়ে যায় কতো বড় বড় মানুষের সাথে। নিজেকে ধন্য মনে হয়। আবার অনেকে হয়তো স্বশরীরে সেখানে উপস্থিত নেই। কিন্তু তার সৃষ্টি দিয়ে তিনি স্পর্শ করে যান পাঠককে। তবে পঠনের দৈন্যও চোখে পড়ে। দেখা গেছে সেবা প্রকাশনী ছাড়া অন্য কোথাও অনুবাদ সাহিত্য ও সাহিত্যিকের সংখ্যা অনেক কম। অথচ এসব বিষয়ে পাঠকের আগ্রহ রয়েছে। অনেক বই হয়তো আছে কিন্তু প্রকাশকরা বিদেশি লেখকদের বই প্রকাশের অনুমতি পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনুবাদ সাহিত্য প্রকাশে আগ্রহী হননা। আবার অনুবাদ বিষয়টা এমন অনেকে।
পাঠকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষায় অনূদিত বইয়ে সাহিত্যরস পাওয়াই যায়না। তেমনি অনেকটাই উপেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই। তবে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে কোনো উপন্যাস বা সত্য ঘটনা নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো পাঠক টানছে। চাহিদা নেই জীবনী গ্রন্থের। একেবারে হাতেগোনা ভ্রমণ বিষয়ক সাহিত্যেও। তবে মানসম্পন্ন ভ্রমণ বিষয় লেখকের অভাব রয়েছে বলে জানালেন প্রকাশকরা। কবিতা, গল্প আর উপন্যাসের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বেশি থাকলেও প্রবন্ধ গ্রন্থের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই।
বই মেলাতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয় প্রতি বছর। অথচ প্রকাশকরা বলেন, বিক্রি নেই। তাহলে প্রতি বছর কেনো বাড়ছে প্রকাশকের সংখ্যা। দেশে আটশো প্রকাশক রয়েছেন। পৃথিবীর কোনো দেশে এতো প্রকাশক নেই। একটি বই প্রকাশের পেছনে লেখকের যে অক্লান্ত পরিশ্রম সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে কোনো সম্মানি না দিয়ে বই নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে সেটি পরিবর্তন জরুরি। আমাদের প্রকাশনার বাস্তবতা হচ্ছে তাই। বেশিরভাগ প্রকাশকই লেখকের সঙ্গে চুক্তি করেন না। ফলে দেখা যায়, মেলা শেষে বা পরে প্রতিষ্ঠিত লেখক না হলে বলে দেন ‘বই বিক্রি হয়নি।’
আবার অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকও চুক্তি করেন না সম্পর্ক নষ্ট হবে বলে। নির্বিচারে বই বের হচ্ছে, অথচ লেখকের সাথে চুক্তি নেই। বড়ই আশ্চর্যের কথা। এক্ষেত্রে প্রকাশকদের কাছে যেন জিম্মি লেখক। তাদের অজুহাতের শেষ নেই। অবশ্য প্রকাশকরা বলেন, বইতো বিভিন্ন জায়গায় নিতে পারছেন না আবার নিলেও টাকা পাচ্ছে না। প্রতিবছর বইমেলা আসলে মিডিয়াগুলো বইয়ের প্রচার করতে একটা নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ করে ফেলে। একটি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এটি বিশাল উদারতা বলা যেতে পারে, অন্যকোনো মেলা কিন্তু স্থায়ীভাবে এতোটা প্রচার পায় না এছাড়া আরেকটি বিষয় হলো একমাসব্যাপী বইমেলাও পৃথিবীর খুব বেশি দেশে হয় না।
এ প্রসঙ্গে লেখক স্বকৃত নোমানের একটি লেখা থেকে ধার নেয়া যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘একুশে বইমেলা যে এখন একটি জাতীয় উৎসবের রূপ নিয়েছে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে গণমাধ্যম। আমাদের টিভি, পত্রিকা আর অনলাইন পোর্টালগুলোর অব্যাহত প্রচারের ফলে বইমেলার খবর পৌঁছে যায় সর্বমহলে। প্রকাশকদের বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। অধিকাংশ প্রকাশকের দায়বোধ বলতে কিছু নেই। বইয়ের প্রতি তাদের কোনো যত্ন থাকে না। খুব কম প্রকাশক বইয়ের যত্ন নেন। অধিকাংশের মানসিকতা হচ্ছে―‘ধর মুরগি জবাই কর।’
এবং শুনতে একটু খারাপ লাগলেও একথা সত্য, অধিকাংশ প্রকাশক বই কী জিনিস সেটাই বোঝে না। কারো মুখে শুনেছে অমুক লেখক ভালো, ব্যস ভালো। সেই ভালো লেখকটির পাণ্ডুলিপিটি পড়ে দেখার প্রয়োজন মনে করে না। এডিটরকে দিয়েও পড়ায় না। এরা সংখ্যায় বেশি। এদের কাছে প্রকৃত প্রকাশকরা কখনো কখনো অসহায় হয়ে পড়ে।
এরপরও একদিন হয়তো নবজাগরণ ঘটবে। একসময় যেমন বিয়েতে বই উপহার দেয়া হতো তেমনি বইকে ‘ছোট জিনিস’ না ভেবে আবারো উপহারের তালিকায় উঠে আসবে বই। যেটি পাল্টে দিতে পারে একজন মানুষকে। কালজয়ী কথাসাহিত্যিক সমারসেট মমের ছোট গল্প ‘বুক ব্যাগ’ এর নায়কের মতো হয়ে উঠবো আমরা। যে নায়কের একটাই নেশা বই পড়া। সেটি ছাড়া সে থাকতে পারে না।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক