বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২ বৈশাখ ১৪৩১

যে কারণে প্রশান্তির ঘুম বিচারকের দুচোখে

প্রকাশিতঃ ৮ মার্চ ২০২২ | ৯:১৩ পূর্বাহ্ন


মুসাফির আব্দুল্লাহ : গতকাল রাতের ঘটনা। চিরিরবন্দর রেল স্টেশনে একতা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। পঞ্চগড়ে যাব। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় ঘন্টা পরে ট্রেন। স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে আছি। তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। হঠাৎ আলুথালু একজন বৃদ্ধা মহিলা ওয়েটিং রুমের ভিতরে প্রবেশ করে।

কি চাই মা- বলে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দেয় থাকার জায়গা চাই- থাকার জায়গা। রেল স্টেশনে ভিক্ষুকরা সাধারণত টাকা চায় পয়সা কিংবা খাবার চায় কিন্তু এই বৃদ্ধা চায় থাকার জায়গা!

তার ব্যতিক্রমী চাওয়া চিন্তায় ফেলে আমাকে। কাছে ডাকি। পাশে বসিয়ে ঘর-বাড়ি, ঠিকানা জানতে চাই। বৃদ্ধার নাম মালেকা বানু। স্টেশন হতে প্রায় দশ কিলোমিটার উত্তরে বাড়ি।

বৌমার সাথে পারিবারিক ঝগড়ার এক পর্যায়ে ছেলে ও বৌমা মিলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। উপায়ান্তর না দেখে ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছেন রেলস্টেশনে। তার কথা বিশ্বাস হয় আমার।

ট্রেন আসতে আর মাত্র পনের মিনিট দেরি আছে। পাশে বসা বৃদ্ধা মহিলার মুখ আর ট্রেনের সময় মনশ্চক্ষুর সামনে দিয়ে দ্রুত উল্টে যেতে থাকে। হতবিহ্বল হয়ে শেষে সিদ্ধান্ত নেই চিরিরবন্দর থানার ওসিকে ফোন করার। ফোন করতেই ওসি সাহেব বললেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমি আসছি স্যার।

রেলওয়ে স্টেশন হতে থানা বেশি দূরে নয়। ঠিক ঠিকই পাঁচ মিনিটের আগেই রেল স্টেশনে পৌঁছে যান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বজলুর রশিদ।

বৃদ্ধা মহিলার ঘটনার সংক্ষিপ্তসার তাকে খুলে বলি। সেইসাথে অনুরোধ করি মহিলাকে গাড়িতে করে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ছেলে ও বৌমার সাথে আপোষ করে দেয়ার।

বৃদ্ধা আমার হাত চেপে ধরে শক্ত করে। তার সোজাকথা আমাকে যেতে দিবেন না তিনি কোথাও। আমি যেন তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।
সেই সাথে আরেকটি কড়া শর্ত জুড়ে দেয় সে।

পুলিশ বাড়িতে গিয়ে যেন তার ছেলেকে মারধর না করে। পুলিশ তার ছেলেকে মারধর করবে না এই নিশ্চয়তা দেই আমি। ওসি সাহেব হাসেন।
বৃদ্ধা শেষে আমাকে যেতে দিতে রাজি হয়।

রাতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে হুস হুস করে হইসিল দিয়ে বীরবিক্রমে ট্রেন ছুটে আসে রেলস্টেশনে- একতা এক্সপ্রেস। রাত আটটায় ট্রেন ছাড়ে। আমাকে হাত নেড়ে বিদায় জানায় সেই বৃদ্ধা আর চিরিরবন্দর থানার ওসি।

একজন বৃদ্ধা মায়ের সাথে ছেলের এমন ব্যবহারে মনটা খারাপ হয়ে যায় ভীষণ।

রাত এগারোটার পঞ্চগড়ে নামি। বাসায় ফিরে রাত বারোটায় কথা বলি ওসির সাথে। তিনি গাড়িতে করে সসম্মানে বৃদ্ধাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন। গ্রামের গণ্যমান্য লোকদের ডেকে ছেলে আর বৌমার সাথে বৃদ্ধার আপোষ মিমাংসা করে দিয়েছেন।

মনটা খুশিতে ভরে যায় আমার।

সব দুঃখ বেদনা আর কষ্ট ভুলে রাতভর এক প্রশান্তির ঘুম নেমে আসে দুচোখে।

০৬ মার্চ ২০২২

লেখাটি পঞ্চগড়ের এডিশনাল চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুসাফির আব্দুল্লাহর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেয়া