মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮

এমপি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে প্রতারণা!

প্রকাশিতঃ রবিবার, মে ২৮, ২০১৭, ২:৪২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম : ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ভুয়া উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের মামলায় শুক্রবার কারাগারে যাওয়ার পর সুচিন্তা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মো. আশরাফুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সুচিন্তা বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে নানা অপকর্মের তথ্য উঠে আসতে শুরু করেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের কনিষ্ঠ সন্তান আশরাফুল ইসলাম সজীব জীবন-জীবিকার জন্য বছর দশেক আগে লন্ডন যান। চাকরির পাশাপাশি লন্ডনের কলেজ থেকে একটি সান্ধ্যকালীন কোর্স সম্পন্ন করেন সেখানে। লন্ডনে অবস্থানের সময় তার পরিচয় হয় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সুশীল সমাজের কয়েকজনের প্রতিনিধির সঙ্গে।

কয়েকবছর আগে দেশে ফিরে সজীব বলতে থাকেন তিনি লন্ডন থেকে পিএইচি ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন এবং লন্ডনের সম্পর্কের সূত্র মিলিয়ে দেশে কিছু একটা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে চলে যান মালয়েশিয়া। সেখানে দুইবছর থাকার পর আবার দেশে ফিরে আসেন।

এবার পেয়ে যান অধ্যাপক এ আরাফাতের সংগঠন সুচিন্তা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ। প্রথমে একজন কর্মী হিসেবে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে সংগঠনটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পান তিনি।

তথ্য মতে, মূলত এরপর থেকে তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় যুক্ত আছেন সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে। কিন্তু আশরাফুল ইসলাম সজীব জাহির করতে থাকেন সজীব ওয়াজেদ জয় সুচিন্তা বাংলাদেশের সঙ্গেই যুক্ত আছেন। এমন তথ্য চাউর করার পাশাপাশি তিনি মোহাম্মদ এ আরাফাত ও সজিব ওয়াজেদ জয়ের স্নেহধন্য বলেও নিজেকে জাহির করতে থাকেন নানা জায়গায়।

বাজারে এমন কথা প্রচার করেই সুইজারল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ ক্যাম্পাস উল্লেখ করে চট্টগ্রামে শিক্ষার নামে রমরমা ব্যবসা শুরু করেন আশরাফুল ইসলাম সজীব।

ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় নাম কিংস্টোন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন কাগজপত্র ও বিজ্ঞাপনে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর সুগন্ধার একটি বাড়িতে একটি ক্যাম্পাস ও মিমি রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ার জাফর ভিলায় তিন রুমের একটি বাসাকে স্থায়ী ক্যাম্পাস উল্লেখ করে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে প্রতারণা করে আসছিলেন।

এক্ষেত্রে তার অন্যতম সহযোগী যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিশ্বস্ত সিপাহশালার হিসেবে পরিচিত তার বোন আপন-এর স্বামী শওকত আলী নূর; যিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও একাধিক মামলার আসামী।

দুলাভাইয়ের সহযোগিতায় গড়ে তুলেন ঢাকা ও কক্সবাজারে ভর্তি কার্যালয়। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন গত কয়েকবছরে। বিজ্ঞাপনে শুধু বিবিএ/এমবিএ নয়, দুই বছরের পিএইচডি ডিগ্রিরও অফার করেন সজীব। পিএইচডির জন্য খরচ পড়ে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ৩ বছরের বিবিএ প্রোগ্রামের জন্য ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা ছাড়াও ৩০ হাজার টাকা ভর্তি ফি। এছাড়া রয়েছে এক থেকে তিন বছর মেয়াদী বিভিন্ন কোর্স। সম্প্রতি ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করা এক ছাত্রের চ্যালেঞ্জের মুখে ধরা পড়ে প্রতারণার বিষয়টি।

নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকার ভুক্তভোগী মোসলেহ উদ্দিন ভুঁইয়া গত বছর ২১ এপ্রিল আশরাফুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে সিএমএম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি সুইজারল্যান্ডের ডিগ্রি পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিংস্টোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি বিবিএ সম্পন্ন করার পর তাকে একটি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। ওই সার্টিফিকেটে আশরাফুল ইসলাম সজীব বিশ্ববিদ্যালয়টির চেয়ারম্যান হিসেবে স্বাক্ষর করেন। ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কারো স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে সজীব এ ব্যাপারে কোনো উত্তর দেননি। বরং বাদিকে উল্টো ছাত্রত্ব বাতিল করার হুমকি দেন।

এরপর ভুক্তভোগী সিএমএম আদালতে আশরাফের বিরুদ্ধে মামলা করলে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য পাঁচলাইশ থানাকে নির্দেশ দেন আদালত। তদন্তকারী কর্মকর্তা পাঁচলাইশ থানার এসআই মো. হাছান আলী চলতি বছরের ২ মার্চ আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে প্রতারণার বিষয়ে সত্যতা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামি আশরাফুল ইসলাম সজীব তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তিনি কিংস্টোন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান পরিচয়ে বহু শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট করেছেন।

আশরাফুল ইসলাম সজীবের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে একুশে পত্রিকাকে জানান, সুচিন্তা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েই তিনি রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। আগামীতে আওয়ামী লীগের টিকেটে কক্সবাজার থেকে এমপি নির্বাচন করারও স্বপ্ন দেখেন। জীবনে কোনোদিন রাজনীতি না করেও চলতি বছরের শুরুতে গঠিত কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত হন আশরাফুল ইসলাম সজীব।

এজন্য সুচিন্তার কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ এ আরাফাত, কেন্দ্রীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্রলীগের প্রাক্তন কয়েকজন নেতাকে দিয়ে তদবির করিয়েছেন বলেও সূত্রটি দাবি করছে। তবে এক্ষেত্রে সুচিন্তা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কের পদটিই অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে সূত্র জানায়। জানা যায়, তিনি তদবির চালিয়েছিলেন মূলত কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার জন্য।

সূত্র মতে, বন্ধু ও শুভার্থী মহলে তিনি বলতেন, আগামী নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন এবং এমপি নির্বাচন করবেন। এজন্য তার প্রচুর অর্থের দরকার। আর প্রচুর অর্থ রোজগারের জন্য বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষাকে পুঁজি করে প্রতারণা ব্যবসা।

তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, অর্থ রোজগারের জন্য শিক্ষাগ্রহণেচ্ছু কিছু মানুষকে এভাবে পথে বসানোর কোনো মানে হয় না। উচ্চাভিলাসী মনোবৃত্তি কিংবা অসম স্বপ্নপূরণ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সুচিন্তা বাংলাদেশের মতো সংগঠনের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাই এর দায় আওয়ামী লীগ কিংবা সুচিন্তা কেউ এড়াতে পারে না।

শনিবার সন্ধ্যায় এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য সুচিন্তা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ এ আরাফাতের মোবাইল ফোনে একুশে পত্রিকা থেকে একাধিকবার ফোন করা হয়। ফোনের রিং হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে শনিবার বিকেলে মোহাম্মদ এ আরাফাত নিজের ফেসবুকে এ প্রসঙ্গে একটি স্ট্যাটাস দেন। তাতে আশরাফুল ইসলাম সজীবকে অব্যাহতির ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন ও আইনের সঠিক প্রয়োগের স্বার্থে সুচিন্তা চট্টগ্রাম বিভাগীয় চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক আশরাফুল ইসলাম সজীবকে সাময়িকভাবে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রথম যুগ্ম সমন্বয়ক আবু হাসনাত চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানান তিনি।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল রহমান চেয়ারম্যান একুশে পত্রিকাকে বলেন, পিএইচডি করে এসেছে, শিক্ষিত, ভদ্র মনে করে সজীবকে দলে পদ দিয়েছিলাম। আজকে তার প্রতারণার ঘটনায় লজ্জিত ও বিব্রতবোধ করছি। পার্টির সভাপতির সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথা হয়েছে। তাকে দল থেকে বহিস্কার ছাড়া কোনো উপায় নেই। অচিরেই এ ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো। ব্যক্তির অপকর্মের দায় কোনোভাবেই দল বহন করবে না। যোগ করেন এ আওয়ামী লীগ নেতা।