শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

রেলওয়ের আইসিডি: কবরস্থান হারানোর শঙ্কায় ৩৫ হাজার মানুষ

| প্রকাশিতঃ ২৪ মার্চ ২০২২ | ৮:৪০ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন অনুযায়ী, কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত কোনাে ভূমি অধিগ্রহণ করা যায় না। এরপরও চট্টগ্রামের পাের্ট ইয়ার্ড এলাকায় কবরস্থানের উপর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপাে (আইসিডি) নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে কবরস্থান হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন ওই এলাকার ৩৫ হাজার মানুষ।

ওই এলাকায় রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি থাকলেও আইসিডি নির্মাণের প্রকল্পটি কবরস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত জমিতে বাস্তবায়নের অনুমতি দিয়েছে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ। অভিযোগ, নথিভুক্ত কবরস্থান জেনেও রেলওয়ের সেই জমিতে আইসিডি নির্মাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে রেলওয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল)।

কবরস্থানসহ সম্পূর্ণ এলাকায় আইসিডি নির্মাণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ লজিস্টিকস অ্যালায়েন্স লিমিটেডের সাথে ইজারা চুক্তিও করেছে সিসিবিএল। রেলওয়ের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ায় আইসিডি নির্মাণে আইনগত কোনো বাধা নেই সাইফ লজিস্টিকস-এর। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাটি পরীক্ষাসহ অন্যান্য কাজ শুরু করেছে তারা। কবরস্থানের পাশেই চলছে মাটি ভরাটের কাজ। তবে এক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নয়, স্থানীয়দের ক্ষোভ রেলওয়ে ও সিসিবিএল’র বিরুদ্ধে।

রেলওয়ের মত দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের এমন কাণ্ডে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী, যাদের বেশিরভাগই রেলওয়ের আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। তাদের দাবি, প্রায় ১০০ বছর ধরে প্রকল্প এলাকাটি কবরস্থান হিসেবে দেখে আসছেন তারা। বহু রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর কবর সেখানে রয়েছে। এমনকি কবরস্থানটি রেলওয়ের নথিভুক্ত ভূমি।

শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে স্থানীয়দের সাথে রেলওয়ে কোনো ধরনের আলােচনাও করেনি বলে জানা গেছে। এমনকি এলাকাবাসীর প্রতিবাদ সত্ত্বেও নেওয়া হয়নি কবরস্থানটি সংরক্ষণের কোনাে উদ্যোগ। উল্টো কবরস্থানের মাটি পরীক্ষা ও একটি কবরের উপর খুঁটি পোঁতা হয়েছে। এ ঘটনায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ওই এলাকায়। এর প্রতিবাদে আন্দোলন কর্মসূচির ঘােষণাও দিয়েছেন রেলওয়ের কর্মীরা।

কবরস্থানের জমিতে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন রেলওয়ে আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা। সকলের একটাই দাবি, কবরস্থানে কোনো ধরনের স্থাপনা করা যাবে না। আশপাশের এলাকায় রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি থাকা সত্ত্বেও টার্মিনালটি নির্মাণের জন্য কবরস্থানের জমি ব্যবহারের ব্যাপারে রেলমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তারা।

যদিও গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে কবরস্থান লাগোয়া লিজ দেওয়া সেই ভূমি ও আইসিডি নির্মাণ বিষয়ক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম। কবরস্থানের জমিতে এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জেরে এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়তে হয় তাকে। চাপের মুখে পড়ে মৌখিকভাবে কবরস্থান সংরক্ষিত রাখার নির্দেশ দেন তিনি। তবে মৌখিক আশ্বাস নয়, কাগজে-কলমে চুক্তির মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন চান ওই এলাকার বাসিন্দারা।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য রেলওয়ের নির্ধারিত জায়গার একেবারে মধ্যভাগে রয়েছে রেলওয়ের কবরস্থানটি। এর সাথে লাগোয়া রেলওয়ে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের নামাজের জন্য হযরত বিল্লাহ্ কুতুব শাহ জামে মসজিদ এবং পুকুর বিদ্যমান। এছাড়া রয়েছে শহীদ ছোবহান স্মৃতি মিলনায়তন।

এলাকাবাসী জানান, চার শতাধিক কবর রয়েছে ওই কবরস্থানটিতে। একসময় ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ওই এলাকায় বসবাস করলেও বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ বসবাস করছেন সেখানে। ব্রিটিশ আমল থেকেই কবরস্থানটি রেলওয়ের কর্মীদের আবাসিক এলাকার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। নিজেদের পূর্বপুরুষের সমাধির উপর এ ধরণের কর্মকাণ্ড ধর্মীয় অনুভূতির উপর আঘাত বলেও মনে করছেন তারা।

কবরস্থানের অস্তিত্ব সংকটের আশঙ্কা করে মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা ও রেলওয়ে শ্রমিকলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টা আমরা রেলওয়ে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সচিব, এমনকি রেলমন্ত্রীকেও জানিয়েছি। স্মারকলিপিও দিয়েছি। মৌখিকভাবে তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে কবর থাকবে। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগেই তারা কবরস্থানের সয়েল টেস্ট করেছে।’

‘আমরা তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা আমাদের জানায় সম্পূর্ণ এলাকার মাটি টেস্ট করা হচ্ছে। তাই কবরস্থানের মাটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে। সত্যি বলতে আমরা বুঝতে পারছি না কী করবো। যতক্ষণ পর্যন্ত লিখিত দেওয়া হচ্ছে না, আমরা এই মৌখিক আশ্বাসে ভরসা করতে পারছি না।’-যোগ করেন তিনি।

নথি অনুযায়ী, মধ্যম হালিশহর মৌজার ২১ দশমিক ২৯ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন কনটেইনার টার্মিনালের ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ জমি জুড়েই আছে এই কবরস্থানটি। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ভূমি অফিসের নথিতেও ওই জমিকে কবরস্থান শ্রেণীতে রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে রেলওয়ের ভূ সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহবুব আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ওই জায়গায় সিসিবিএল কর্মকর্তাসহ আমরা বেশ কয়েকবার গিয়েছি। মসজিদ ও কবরস্থানের অংশটি পরিমাপ করে আমরা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। কবরস্থানের উপরেই যে কাজ করবে এমনটা না, বিষয়টা সিসিবিএল দেখবে। কবরস্থানের সীমানা নির্ধারণ করে সেটা সম্ভবত বাদ দেওয়া হবে। তবে এখনও বিষয়টি আমরা নিশ্চিত নই।’

এ প্রসঙ্গে কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কবরস্থানে কোনো ধরনের মাটি ভরাট হচ্ছে না। কবরস্থানের জায়গাটা এমনিতেই উঁচু। কবরস্থানের পাশের একটি নিচু জলাশয়ে মাটি ভরাট হচ্ছে। তারপর সেখানে কমপ্লেকশন হবে। বিষয়টাকে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন কবরস্থান আমরা দখল করে ফেলেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন পর্যন্ত নকশাই দেওয়া হয়নি। নকশা দেওয়ার পর আমাদের এক্সপার্ট কমিটি সেটা দেখে অনুমোদন দেবে, তারপর কনস্ট্রাকশন শুরু হবে। এই প্রক্রিয়া হতেই কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে। আমরা কী এতোটাই কাণ্ডজ্ঞানহীন যে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসে এমন কাজ করবো?’

এ বিষয়ে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জাহাঙ্গীর হােসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সয়েল টেস্ট করুক বা যাই করুক মন্ত্রী মহোদয় বলে দিয়েছেন ওখানে কবর থাকবে। রেলওয়ের সচিবও একই কথা বলেছেন, তাই আমিও মনে করি কবর ওখানে থাকবে।’