
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে শত শত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে চলে যাওয়ার সময় অন্তত ৩০৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে ট্রানজিট ক্যাম্পে প্রেরণ করেছে উখিয়া থানার পুলিশ। এসময় মানবপাচারের সাথে জড়িত ৬ জনকেও গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
তবে অনেক রোহিঙ্গা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে চলে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্প ছেড়ে পালানোর পর এসব রোহিঙ্গারা টেকনাফ-উখিয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় কম টাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। এতে স্থানীয়রা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) রাত থেকে বুধবার (৬ এপ্রিল) দুপুর পর্যন্ত উখিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে ১২৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে ৪ এপ্রিল থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত দুইদিনে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ১৮০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। এ নিয়ে গত তিনদিনে ৩০৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পের বাইরে আসা রোহিঙ্গারা সস্তায় শ্রম বিক্রি করে। তারা বিভিন্ন পরিবহনের চালক ও চালকের সহকারি বা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। কেউ কেউ বাসাবাড়িতে গিয়েও কাজ করার তথ্য আছে। এতে স্থানীয় শ্রমজীবীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি এসব রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে আসার প্রবণতা রোধে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আটকের পর তাদের ফের নিজ নিজ শিবিরে পাঠানো হচ্ছে।
ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের পালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) শিহাব কায়সার খান বলেন, ‘আশ্রয় শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের বসবাস। সে হিসেবে আমাদের সদস্য সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এপিবিএন ১৪, ১৬ এবং ৮ তিনটি ব্যাটেলিয়ন মিলে নিরাপত্তা কর্মীর সংখ্যা মাত্র ২ হাজারের মত। ক্যাম্পের বিশাল এরিয়ায় কাঁটাতারের ঘেরা দেয়া হয়েছে। কাঁটাতারের সব জায়গায় গাড়ি বা পায়ে যোগাযোগও দুরূহ। কিন্তু সেসব এলাকায় রোহিঙ্গারা সহজে কাঁটাতারের নিচে চলাচলের পথ করে বাইরে চলে যায়। খবর পেলে আমরা ক্যাম্প ইনচার্জকে (সিআইসি) জানিয়ে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবার বেশ কিছু এলাকায় রোহিঙ্গাদের খাবার সরবরাহ করা হয় ক্যাম্পের বাইরে। তখন তাদের সেখানে যেতে দেয়া লাগে। সেখান থেকেও অনেকে কাজের সন্ধানে চলে যায় বলে খবর পাই। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি, রোহিঙ্গারা যেন ক্যাম্পের বাইরে যেতে না পারে।’
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে ইচ্ছেমতো বের হয় আবার ঢুকে। তারা ইতোমধ্যে উখিয়ার শ্রম বাজার প্রায় দখল করে নিয়েছে। কিন্তু সব কিছু দেখার পরও প্রশাসন নিরব। এতে স্থানীয়রা অসহায় হয়ে পড়েছে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্যাম্প এলাকায় যাওয়া-আসায় প্রশাসন স্থানীয়দের বাধা দিলেও রোহিঙ্গাদের চলাফেরায় তেমন একটা বাধা দিতে দেখা যায় না। এ কারণে রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. সামছু-দৌজ্জা নয়ন বলেন, ‘ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তারপরও কেউ কেউ স্বচ্ছল জীবনের তাগিদে, আবার কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্পের বাইরে যাচ্ছে।’ ক্যাম্পের বাইরে অনুমতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের চলাচল বন্ধে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।