বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

চট্টগ্রাম কারাগারে জমজমাট ‘কথাবাণিজ্য!’

প্রকাশিতঃ Sunday, April 10, 2022, 10:25 pm


মোহাম্মদ রফিক : ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে স্বজনদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের (২৫ টাকায় ৫ মিনিট) বিনিময়ে সপ্তাহে একবার কথা বলার সুযোগ পান চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের ৬৮ কারাগারের প্রায় ৮৪ হাজার বন্দি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের চিত্র ভিন্ন।

অনুসন্ধান করে ও মুক্তি পাওয়া বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো বন্দী ইচ্ছে করলে স্বজনদের সঙ্গে দিনে যতবার ইচ্ছে কথা বলতে পারেন কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায়। আর এ ক্ষেত্রে ৫ মিনিট কথা বলার বিনিময়ে ৫০০ টাকা প্রদান করতে হচ্ছে বন্দিকে। কারাগারের ছোট থেকে পদস্থ কর্মকর্তারা মিলে যেন গড়ে তুলেছেন জমজমাট ‘কথাবাণিজ্য’।

নিয়মানুযায়ী, একজন বন্দি সপ্তাহে একদিন স্বজনদের সাথে দশ টাকায় ১০ মিনিট কথা বলার সুযোগ পান। কিন্তু এর বাইরে প্রতিদিন কোনো না কোনো বন্দি ৫০০ টাকায় পিসি (প্রিজনার ক্যাশ) কার্ড কিনলে ৫ মিনিট কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে অসাধু কারারক্ষীরা। কেউ ইচ্ছে করলে একাধিকবারও কথা বলতে পারেন এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে।

সম্প্রতি জামিনে মুক্ত সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ সাজ্জাত হোসেনও এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রতিদিন ৫০০ টাকার পিসি কার্ড কিনে স্বজনদের সাথে অন্তত ৬০-৬৫ জন কথা বলছেন। আমিও বন্দি থাকা অবস্থায় ৫০০ টাকার পিসি কার্ড কিনে স্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। এভাবে প্রতিদিন মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে লাখ টাকার বাণিজ্য করছে কারা কর্তৃপক্ষ। এ টাকার ভাগবাটোয়ারা হয় কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঝে।’

নগরের চকবাজার থানায় দায়ের হওয়া একটি মাদকের মামলায় গত বছর ১৮ ডিসেম্বর কারাবন্দি হন আজিজুল। সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পান। তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কারারক্ষীদের যত টাকা দেন তত টাকার হিসেবে মোবাইল ফোনে স্বজনদের সাথে কথা বলা যায়। তিন মাস বন্দি ছিলাম। আমি নিজে প্রায় প্রতিদিন ৫০০ টাকায় পিসি কার্ড কিনে মোবাইলে পরিবারের সাথে কথা বলতাম।’

জানা গেছে, প্রতি সপ্তাহে একবার করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বন্দিরা। এজন্য তাদের প্রতি মিনিটে ৫ টাকা করে দিতে হয়। একেকজন বন্দি সর্বোচ্চ ৫ মিনিট করে কথা বলার সুযোগ পান। তবে ফোনে কথা বলার সুযোগ পান না কারাবন্দি জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

জানা গেছে, কারাবন্দি থাকায় কয়েদি এবং বিচারাধীন বন্দিদের মাঝে সৃষ্ট হতাশা ও বিষাদগ্রস্ততা দূর, বন্দির দর্শনার্থী সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি কারাগারকে শুধু শাস্তির স্থান নয়, সংশোধনাগার ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতেই কারা কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে বিশেষ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে কারা কর্তৃপক্ষ ‘কারাগারে মোবাইল ফোন বুথ নির্মাণ ও পরিচালনায়’ একটি নীতিমালাও তৈরি করেছে।

কিন্তু এ নীতিমালা ভঙ্গ করে অসাধু কিছু কারারক্ষীর সহায়তায় হাজতি ও কয়েদিরা কারাগারে গোপনে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ আছে। যদিও কোনও আসামি বা ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি কোন কথা বললে উভয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার কথা রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষের।

সরকার গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ায় কারাবন্দি বিচারাধীন ও কয়েদিরা তাদের স্বজনদের সঙ্গে নির্দিষ্ট দিন পরপর মোবাইল ফোনে নির্দিষ্ট সময় কথা বলতে পারছেন। কারাবন্দিরা সন্তান, মা-বাবা কিংবা স্ত্রী ও স্বজনদের সঙ্গে তাদের সুখ-দুঃখের নানা কথা বলতে পারছেন। কিন্তু এ সুযোগকে ‘বাণিজ্যিকভাবে’ কাজে লাগাচ্ছেন কারাগারের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী।

কারা সূত্র জানায়, কারাবন্দিদের মানবিক দিক বিবেচনায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশে কারা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।

কারাগারে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দিকে এ সুবিধা গ্রহণের জন্য তার আত্মীয় বা অভিভাবক হিসেবে ২ জনের মোবাইল নম্বর প্রদান করতে হয়। আটককালীন ওই ২ নম্বরেই কেবল মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারেন বন্দিরা। তবে কারা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনও কথা বলা বা যে কোনও ধরনের ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করলে তা উক্ত বন্দির জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, অনেক বন্দি আত্মহত্যা করতে চায় বা পলায়ন প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই বিষাদগ্রস্ততা দূর করে বন্দিদের মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে স্বজনের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় অন্তর কথা বলতে পারলে বিষাদগ্রস্ততা দূর হতে পারে চিন্তা করে কারাগার থেকে মোবাইল ফোনে বন্দিদের কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।”

জেলা প্রশাসক জানান, এ সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, আদালত কর্তৃক বা সরকার ঘোষিত কোন শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং অপহরণ ও চাঁদাবাজি মামলায় অভিযুক্ত কোনও ব্যক্তি মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাবেন না। একজন বন্দি সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট কথা বলতে পারবেন। মোবাইল ফোনে বলা সকল কথা রেকর্ড করা হয়। সকল ভয়েস কলের মূল্য স্বাভাবিক কলের ন্যায় হবে। কথা বলার সময় কোনও বন্দি অবোধগম্য বা সাংকেতিক ভাষায় কথা বলবে না, সকল কলের রেজিস্টার সংগ্রহ করবে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে কোনও অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১০০ ও ৫০০ টাকায় পিসি কার্ড কিনে বন্দিরা মোবাইল ফোনে কথা বলার অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সিনিয়র জেল সুপার গিয়াস উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিক বার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ মহাপরিদর্শক ফজলুল হক অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান।