বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বিদ্যুৎ-সংযোগ পেতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ

প্রকাশিতঃ Thursday, May 12, 2022, 9:35 pm

একুশে প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে নতুন বিদ্যুৎ-সংযোগ পেতে গ্রাহকদের হয়রানির পাশাপাশি মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘুষ না দিলে মাসের পর মাস ঝুলে থাকে আবেদনপত্র। অন্যদিকে আবেদন না করেও কেউ কেউ দ্রুত বিদ্যুৎ-সংযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। পিডিবি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দেওয়ার নামে দালাল চক্র ঘুষ হিসেবে গ্রাহক থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন হাটহাজারী উপজেলা চারিয়া এলাকার একটি ইটভাটা মালিক মোহাম্মদ শফি। ইটভাটায় বিদ্যুৎ পেতে তিন বছর ধরে চেষ্টা করে আসছিলেন তিনি। তার ইটভাটাটি চারিয়া ছনখোলা এলাকায়। নাম ‘এসএস ব্রিকস’। মোহাম্মদ শফি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার ইটভাটায় বিদ্যুৎ পেতে গত ২৮ মার্চ ‘চট্টগ্রাম জোনে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প-২’ এর পরিচালকের কাছে আবেদন করি। গত দেড় মাসে আমার ইটভাটায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি সংশ্লিষ্টরা। অথচ আমার পাশের তিনটি ইটভাটায় এক কিলোমিটার দূর থেকে অন্তত ৮৪টি পিসি পিলার গেড়ে সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারণ করে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে পিডিবি।’

জানা গেছে, হাটহাজারীর পশ্চিম মির্জাপুর দক্ষিণখিল গ্রামে অবস্থিত গাউসিয়া ব্রিকস, ২০২ ব্রিকস এবং এমএফ ব্রিকস ইটভাটায় ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। তিনটি ইটভাটায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে দেড়মাস আগে কাজ শুরু করেছিল পিডিবি। অভিযোগ আছে, ইউছুপ নামে এক দালাল পিডিবি’র কর্মকর্তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে আদায় করেছে মোটা অংকের টাকা। বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়া পশ্চিম মির্জাপুর দক্ষিণখিল গ্রামের ছনখোলা এলাকার এমবিআই ব্রিকসের মালিক আকতার উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের পাশ্ববর্তী তিনটি ইটভাটা বিদ্যুৎ সংযোগ পেলে আমরা কেন পাব না?’

অভিযোগ, সম্প্রতি হাটহাজারীর উত্তর ফতেয়াবাদ এলাকার জমজম ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন আকতার হোসাইনের মালিকানাধীন জায়গায় কোনো প্রকার সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অতি দ্রুততার সাথে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলার শিকারপুর এলাকায়ও একটি প্রতিষ্ঠানে দ্রুততার সাথে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে ।

এই দুটি সংযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেয়ার নামে ইউছুপ নামের এক ব্যক্তি মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক প্রথমদিকে কোন আবেদন করেননি। গ্রাহকের মাধ্যমে আবেদন করিয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাজও শুরু করে দেওয়া হয়।

হাটহাজারীর পশ্চিম মির্জাপুর দক্ষিণখিল গ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, চারিয়া এলাকা থেকে ‘ব্যারিস্টার আনিস খাল’ পাড়ের রাস্তা দিয়ে উত্তরে দক্ষিণখিল গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বের এই সঞ্চালন লাইনে স্থাপন করা হয়েছে ১২ মিটার উচ্চতার ৩০টি বিদ্যুৎ খুঁটি (পিসি পিলার)। উক্ত খাল পাড়ের রাস্তা ধরে ৯ মিটার উচ্চতার ২০টি পিসি পিলার গেড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন (এলটি) নিয়ে যাওয়া হয়েছে পশ্চিম মির্জাপুর দক্ষিণখিল জামে মসজিদ পর্যন্ত। ব্যারিস্টার আনিস খাল পাড়ের পূর্ব পাশে আছে তিনটি এবং পশ্চিম পাশে চারটি ইটভাটা আছে। পূর্ব পাশের ইটভাটাগুলো হলো ২০২ ব্রিকস লিমিটেড, এমএফ ব্রিকস এবং গাউসিয়া ব্রিকস ইন্ডান্ট্রিজ লিমিটেড। পশ্চিম পাশের চারটি ইটভাটার মধ্যে দুটির নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো-এসএস ব্রিকস ও এমবিআই ব্রিকস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, পশ্চিম মির্জাপুর দক্ষিণখিল গ্রামে ঘরে ঘরে পল্লী বিদ্যুতের সরবরাহ আছে। তবে প্রতিদিন লোডশেডিং, ভোল্টেজ উঠানামাসহ বিদ্যুতের নানা সমস্যায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন দক্ষিণখিল গ্রামের বিপুল সংখ্যক গ্রাহক। রুবেল নামে স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘মাস দেড়েক আগে আমাদের দক্ষিণখিল গ্রামে পিডিবি কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করেছে। তবে জানতে পেরেছি লাইনটি আমাদের জন্য স্থাপন করা হয়নি। ব্যারিস্টার আনিস খালের পূর্বপাশে গড়ে উঠা তিনটি ইটভাটায় সংযোগ দিতেই লাইনটি স্থাপন করা হয়েছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণখিল জামে মসজিদ থেকে আধা কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ‘এমএফ ব্রিকস’ নামের একটি ইটভাটায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ৯ মিটার উচ্চতার ২০টি পিসি পিলার স্থাপন করা হয়েছে। ব্যারিস্টার আনিস খাল পাড়ের মূল সঞ্চালন লাইন থেকে পূর্ব দিকে ৬টি পিসি পিলার বসিয়ে জনৈক মো. ইদ্রিসের মালিকানাধীন ‘২০২ ব্রিকস লিমিটেডে’ এবং ৮টি পিসি পিলার বসিয়ে গাউসিয়া ব্রিকস ইন্ডাস্ট্রিজে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন (এলটি) স্থাপন করা হয়েছে। আলোচ্য তিনটি ইটভাটায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনে সব মিলিয়ে ১২ মিটার এবং ৯ মিটার উচ্চতার প্রায় ১০০টি পিসি পিলার স্থাপন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই পশ্চিম মির্জাপুর দক্ষিণখিল গ্রামের (ব্যারিস্টার আনিস খাল পাড়ের পূর্বে পাশে) তিনটি ইটভাটায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। গ্রাহক প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হচ্ছে।’

জানতে চাইলে পিডিবি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া কোন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে পিডিবির কোন কর্মকর্তা বিপদে পড়তে চাইবেন না। হাটহাজারীর চারিয়ায় এক কিলোমিটরের ব্যবধানে তিনটি ইটভাটা বিদ্যুৎ সংযোগ পেলে পাশের ইটভাটাগুলো কেন, কী কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি বা দেওয়া হয়নি সে বিষয়ে খোঁজ নেব। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবো৷ আর কোন কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে থাকলে সেটির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দালালের কাছে না গিয়ে গ্রাহকদেরকে সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে পিডিবি চট্টগ্রামের এ শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘দালালের সাথে পিডিবির কোন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ভুক্তভোগী গ্রাহকদের হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নেওয়াজ আহমেদ খানের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

ঘুষ দিলে দ্রুত মিলে বিদ্যুৎ সংযোগ, আর না দিলেই গ্রাহকদের আবেদন পড়ে থাকে মাসের পর মাস- এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে পিডিবি’র উন্নয়ন প্রকল্প (ফেইস-২) এর উপপ্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর মোরশেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গ্রাহক সরাসরি আমাদের কাছে আবেদন করলে হবে না। সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিভাগে আবেদন করতে হবে। সেখানকার বিদ্যুৎ বিভাগ চাহিদাপত্র দিলে আমরা যাচাই করে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করব। আর আমাদের নাম ভাঙ্গিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে কোন দালাল টাকা নিয়ে থাকলে তাকে চিহ্নিত করে দিন।’

যদিও ভুক্তভোগী ইটভাটা মালিক মোহাম্মদ শফি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মাস দুয়েক আগে আমাদের ইটভাটায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিভাগে আবেদন করতে গিয়েছিলাম। তখন সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পিডিবি চট্টগ্রাম জোনের উন্নয়ন প্রকল্প কর্মকর্তার কাছে আবেদনের পরামর্শ দেন। এ কারণে প্রকল্প কর্মকর্তা বরাবর আবেদনটি গত ২৮ মার্চ দেওয়া হয়।’

একই প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নেওয়াজ আহমেদকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।