বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

জায়গা দখলের ‘কাগতিয়া-কৌশল’; অন্যের বাড়ির দেয়াল ঘেঁষেই ‘পুকুর খনন’

প্রকাশিতঃ Friday, May 13, 2022, 10:37 am


রানা আবির : নাছির উদ্দিন (৫২)। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন শেরশাহ নছু মিয়া কলোনির মালিক হিসেবে পরিচিত তিনি। সম্প্রতি তার কলোনির বাড়ির দেয়াল ঘেঁষেই মাটি খুঁড়ে একেবারে ‘পুকুর’ বানিয়ে ফেলেছে কাগতিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। ফলে যেকোনো সময় দেয়াল ধসে ঘটতে পারে প্রাণহানির মতো মারাত্মক দুর্ঘটনা।

অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছরে ওই এলাকার বেশ কিছু মানুষকে এভাবে জিম্মি করে নামমাত্র মূল্যে জায়গা হাতিয়ে নিয়েছে কাগতিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ; মাদ্রাসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কায়েস চৌধুরী (৫৪), মিটু (৫০) ও আলমগীর (৪০) নামের তিন ব্যক্তি এ ধরনের অনৈতিক কাণ্ডে নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ আছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (১০ মে) বায়েজিদ বোস্তামী থানায় কায়েস ও মিটুর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভুক্তভোগী নাছির উদ্দিন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, “আমার মালিকানাধীন নজু মিয়া কলোনিতে গত ৭ মে আমার বাসার পাশে বাউন্ডারি দেওয়াল ঘেঁষে পূর্বপরিকল্পিতভাবে জায়গা দখলের পাঁয়তারা করে মাটি খনন শুরু করেন বিবাদীরা। এই মাটি খননের ফলে যে কোন সময় দেয়াল ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই বিষয়ে ৭ মে তাদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন।”

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে শেরশাহ এলাকার একজন স্থানীয় বাসিন্দা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কাগতিয়া মাদ্রাসায় তেমন কোন শিক্ষার্থী নেই, ২০ জনের মতো হতে পারে। অথিচ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী আছে দেখিয়ে তারা বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা দানবাক্স রেখেছে, তাদের বক্তরা সেখানে প্রতিদিনই টাকা দেয়। এছাড়া বিদেশ থেকেও তারা টাকা পায়। সেই টাকা দিয়ে জিম্মি করে জায়গা কেনা ও সাধারণ মানুষের জায়গা-জমি দখল করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে এমন কাজ খুবই বেমানান।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মো. কামরুজ্জমান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী নাছির উদ্দিন থানায় এসে সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। তারপরই পুলিশ পাঠিয়ে সরেজমিনে বিষয়টি তদন্ত করেছি এবং বিবাদীদের সাবধান করেছি এই ধরনের কাজ না করার জন্য। যদিও জায়গা জমি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান থানা পুলিশের কাজ না। তারপরও শান্তি বজায় রাখতে প্রাথমিকভাবে আমরা আমাদের কাজ করেছি। এরপরও যদি এই ধরনের কাজ আবার করে, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেব।’

ভুক্তভোগী নাছির উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিবাদীরা মূলত ভূমিদস্যু। ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের জায়গা দখলই তাদের কাজ। আমার বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে বিশাল গর্ত করা হয়েছে, এটাকে পুকুর বলা চলে। এতে করে যেকোন সময় দেয়াল ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমি বাধা দিতে গেলেই বিবাদীরা গালিগালাজ শুরু করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেও আশানুরূপ সুফল পাইনি। আমি বর্তমানে প্রাণহানির শঙ্কায় আছি।’

জানতে চাইলে জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই কলিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুই পক্ষই থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। দুইজনই দাবি করছেন খনন করা জায়গা তাদের। কাগতিয়া মাদ্রাসার সদস্যদের আর গর্ত না খুঁড়তে বলে দিয়েছি।’

অভিযোগের বিষয়ে কাগতিয়া মাদ্রাসার সদস্য মো. কায়েস চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যেই জায়গায় গর্ত করেছি সেই জায়গাটি মাদ্রাসার। মাদ্রাসার নিরাপত্তার স্বার্থে গর্ত করে দেয়াল দেব। তার যদি কোন জায়গা থাকে তাহলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে প্রমাণ করুক যে এটা তার জায়গা।’

এদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ৬ (খ) ধারার বিধান লঙ্ঘন করে পাহাড় কেটে পরিকল্পিতভাবে ভূমিধসের পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ এনে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের পরিচালক বরাবর একটি অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী নাছির উদ্দিন।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পাহাড়ের মাটি কেটে বসতি ঝুঁকিপূর্ণ করার বিষয়টি অভিযোগের মাধ্যমে জেনেছি। আমি অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’