বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

মানুষ বন্ধক রেখে ইয়াবার কারবার—নেপথ্যে সেই নবী হোসেন

প্রকাশিতঃ ১ জুন ২০২২ | ৯:৫৬ অপরাহ্ন

জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : করোনাকালীন সময়ে ইয়াবার কারবার চাঙা রাখতে সস্তা ও সহজ কিস্তিতে ইয়াবার লেনদেন চালু করে কারবারিরা। এ সুযোগে মিয়ানমারের কারবারিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা এনে মজুদ করে রোহিঙ্গা ও দেশের ইয়াবা কারবারিরা।

তবে এবার পাল্টে গেছে ইয়াবা লেনদেনের ধরন। মাদক বিকিকিনির জন্য নগদ অর্থ না থাকলে মানুষ ‘বন্ধক’ রেখে ইয়াবা নিয়ে আসছে মাদক কারবারিরা। বন্ধক রাখা ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় সীমান্তের নির্ধারিত আস্তানায় বা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে। এরপর ইয়াবা বিক্রি শেষে টাকা পরিশোধ করে দিলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বন্ধক রাখা ব্যক্তিকে।

জানা যায়, ২০২০ সালের শেষের দিকে মানুষ বন্ধক রেখে ইয়াবা লেনদেনের সিস্টেমটা চালু করেন দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করার দুঃস্বপ্ন দেখা সেই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেন। তার ডেরায় এভাবে মানুষ বন্ধক রেখেই মাদক কারবারিদের বড় একটি অংশ মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে নবী হোসেনের কাছে শতাধিক মানুষ বন্ধক রাখার তথ্য পাওয়া গেছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে। উক্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও।

গত ২৫ মে উখিয়া পালংখালী ইউনিয়নের দিল মোহাম্মদ নামে সপ্তম শ্রেণীর এক মাদ্রাসা ছাত্রকে নবী হোসেনের কাছে বন্ধক রেখে ৫০ লক্ষ টাকার ইয়াবা নিয়ে আসে কারবারিরা। ইয়াবার চালানটি বিজিবির হাতে ধরা পড়ার কারণে তাকে আর ছাড়িয়ে আনতে যাননি কারবারিরা।

এদিকে জিম্মিদশায় থাকা দিল মোহাম্মদের পরিবারকে ফোন করেন নবী হোসেনের লোকজন। ইয়াবার ৫০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করে তাকে ছাড়িয়ে নিতে বলা বলা হয় দিল মোহাম্মদের পরিবারকে। এক পর্যায়ে জিম্মিদশায় থাকা দিল মোহাম্মদের সাথে ফোনে কথা বলতে দেওয়া হয় তার বড় ভাই ছৈয়দ আকবরের সাথে।

ছৈয়দ আকবর জানায়, জিম্মিদশা থেকে দিল মোহাম্মদ তাকে ফোন করে জানায় যে, দামি মোবাইল ফোন ও ১০ হাজার টাকার লোভ দেখিয়ে কৌশলে তার ভাইকে অপহরণ করা হয়। পরে পালংখালী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাফরুল ইসলাম বাবুলসহ এ চক্রের আরও কয়েকজন মিলে ইয়াবা কারবারিদের কাছে তাকে বন্ধক রেখে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিয়ে যায়।

ছৈয়দ আকবর একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘২৫ মে দুপুরে ফারির বিল আলীম মাদ্রাসার সামনের রাস্তা থেকে তাকে কৌশলে অপহরণ করে নিয়ে স্থানীয় ইয়াবা কারবারিরা। পরে তাকে মিয়ানমারে ইয়াবা কারবারিদের হাতে বন্ধক রাখা হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ফোনে দেওয়া তথ্যমতে বটতলী এলাকার গফুর আলমের ছেলে সোহেলকে আটক করে এলাকাবাসী। সোহেল আমার ভাইকে মিয়ানমারের ইয়াবা কারবারিদের কাছে বন্ধক রাখার বিষয়টি স্বীকার করে। একই সাথে ঘটনায় জড়িতদের নামও প্রকাশ করে। যা ভিডিও ধারণ করে রাখা হয়। পরে স্থানীয় চেযারম্যান আবদুল গফুর চৌধুরীর মাধ্যমে বিজিবির কাছে সোহেলকে সোর্পদ করা হয়।’

ছৈয়দ আকবর আরও বলেন, ‘আমি আমার ভাইকে বন্ধক রাখার বিষয়ে জড়িতদের নাম উল্লেখ করে উখিয়া থানায় একটা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এর একটা কপি র‍্যাবকেও দিয়েছি। কিন্তু কেউ আমার ভাইকে উদ্ধারের জন্য সেভাবে সহযোগিতা করেনি এখনো। লিখিত অভিযোগে ইউপি সদস্য ইসলাম বাবুল (৪০) এবং সোহেলসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি একইভাবে নবী হোসেনের ডেরায় বন্দি হয়ে পড়েছিলেন উখিয়ার আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তারা হলেন- পালংখালী ইউনিয়নের মৃত আব্বাস উদ্দিন ছেলে মোক্তার আহাম্মদ, শামসুল আলমের ছেলে বাপ্পি, মৃত হামিদুল হকের ছেলে হামিদুর রহমান, নাজুর ছেলে জহুর আলম প্রমুখ। তাদেরকে বন্ধক রেখে ইয়াবা এনেছিল কারবারিরা।

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন একুশে পত্রিকা বলেন, ‘শুধু দিল মোহাম্মদ নয়, আমার এলাকার শতাধিক ব্যক্তিকে নবী হোসেনের কাছে বন্ধক রেখে ইয়াবা লেনদেনের ঘটনা ফাঁস হয়েছে। ফাঁস হয়নি এমন ঘটনা অহরহ। শুধুমাত্র কোন ধরনের ঝামেলা হলেই এসব তথ্য প্রকাশ হয়ে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের বিষয়ে কথা বলাও অনিরাপদ। কারণ আমার পালংখালী ইউনিয়নে নবী হোসেন যদি চেয়ারম্যান ইলেকশন করে তবে তিনি অনেক ভোটের ব্যবধানে পাশ করবেন। কারণ ইয়াবা কারবারিরা সংখ্যায় এত বেশি হয়ে গেছে। তারা সবাই নবী হোসেনের দলের সদস্য। তারা সবাই কোটিপতি।’

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন আরও বলেন, ‘কাউকে বন্ধক রেখে যদি ইয়াবার চালান আনা হয়, তখন বন্দি ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে আনতে টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর না হয় ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ার বিষয়টি ফেসবুকে বা গণমাধ্যম প্রকাশিত হলে তারা বন্দি ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়।’

পালংখালীর স্থানীয়দের দাবি, স্থানীয় বাবুল মেম্বার ও তার ভাই একরাম, বটতলী এলাকার রুবেলসহ নবী হোসেনের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন এ ধরনের অন্তত শতাধিক চিহিৃত স্থানীয় ব্যক্তি রয়েছেন। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা গেলে মানুষ বন্ধক রেখে ইয়াবার কারবার কমে আসবে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত বাবুল মেম্বার বলেন, ‘একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে সব জায়গায় আমার নাম জড়াচ্ছে। দিল মোহাম্মদকে বন্ধক রাখার বিষয়ে আমার নাম আসাটাও এ ধরনের একটি ঘটনা। আমি এবং আমার ভাই একরাম কোনভাবে নবী হোসেনের সহযোগী নই এবং ইয়াবার কারবারের সাথে জড়িত নই।’

জানতে চাইলে ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী হোসাইন কবির বলেন, ‘মানুষ বন্ধক রেখে ইয়াবা লেনদেনের বিষয়টি আমি শুনেছি। কিন্তু এ জন্য যাদেরকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, তাদের বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। ভিকটিমকে উদ্ধার করা গেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সীমান্তে বিজিবির টহল থাকার পরও ইয়াবা বহন করে কারবারিদের মিয়ানমারে আসা-যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১৭২ কিলোমিটারের সীমান্তের জন্য বিজিবি সদস্য খুবই অপ্রতুল। তাই মাদক কারবারিদের প্রতিরোধ করতে স্থানীয়দেরও সহযোগিতা করা উচিত।’

কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মানুষ বন্ধক রেখে ইয়াবা কারবারের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। এর সাথে যারা জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

তিনি বলেন, ‘এমনও হতে পারে যে বা যারা মিয়ানমারের জিম্মি হয়ে (বন্ধক থাকছে) আছে, তারাও ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত। তবে বিপদে পড়লে অপহরণের অভিযোগ করে তারা বাঁচতে চেষ্টা করে।’