মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯

ছাত্র সংসদ: নেতাদের পছন্দের কমিটি দিতে বাধ্য হলেন সিটি কলেজ অধ্যক্ষ!

প্রকাশিতঃ ২৩ জুন ২০২২ | ৯:১৬ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : দীর্ঘ ১৭ বছর পর গঠিত হয়েছে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক কমিটি। এই কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি, সাবেক ছাত্রনেতাদের চাপে পড়ে তাদেরই পছন্দের কমিটি গঠন করেছেন কলেজ অধ্যক্ষ। যার কারণে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসেনি। কমিটিতে স্থান পেয়েছেন নবাগত, তুলনামূলক অজনপ্রিয়, নেতৃত্বের গুণাবলী নেই এমন শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে ছাত্র সংসদের কমিটি করা হয়েছে। গত ২১ জুন কলেজ কর্তৃপক্ষ দিবা ও বৈকালিক শাখা মিলিয়ে ২৯ জনের কমিটি ঘোষণা করে। দিবা শাখায় ১৮ জন শিক্ষার্থী এবং নৈশ শাখায় ১১ জন শিক্ষার্থীকে রাখা হয়েছে।

নিজস্ব বলয় সৃষ্টির জন্য নিজেদের লোক দিয়ে সাবেক ছাত্রনেতারা ‘মাই ম্যান’ কমিটি গঠন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সদ্য বিদায়ী ছাত্র সংসদের ভিপি আবু তাহের। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘সদ্য ঘোষিত ছাত্র সংসদের কমিটি নিয়ম মেনে হয়নি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছাত্র সংসদের কমিটি গঠন হওয়ার কথা ভোটাভুটির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এজন্য তফসিল ঘোষণার করা, নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। এসবের কিছুই না করে রাতারাতি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে তা ঘোষণা করলেই তো তা বৈধতা পেতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আর কলেজ অধ্যক্ষ বলছেন উদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হলে কলেজ প্রধানের ক্ষমতাবলে তিনি আহ্বায়ক কমিটি দিতে পারেন। কিন্তু এমন কি উদ্ভুত পরিস্থিতি হলো তা আমাদের জানা নেই। আর সাবেক ছাত্রনেতার নাম দিয়ে কয়েকজন স্থানীয় কাউন্সিলরের তালিকা অনুযায়ী কমিটি করা হয়েছে। সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে আমি বৈধভাবে নতুন কমিটি গঠন করার জন্য দাবি জানাচ্ছি।’

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে জানান, ছাত্র সংসদের দুটি আহ্বায়ক কমিটি (দিবা ও বৈকালিক শাখা) গঠনের আগে কলেজ অধ্যক্ষের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস ও ২৯ নং পশ্চিম মাদারবাড়ি ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম মো. জোবায়ের, কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ৩০নং পূর্ব মাদারবাড়ি ওয়ার্ড কাউন্সিলর আতাউল্লা চৌধুরী, সাবেক জিএস ও ৩১নং আলকরণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুস সালাম মাসুম, ৩৪ নং পাথরঘাটা ওয়ার্ড কাউন্সিলর পুলক খাস্তগীর, সাবেক ভিপি সাদেক হোসেন পাপ্পু, সাবেক জিএস দেবাশীষ পাল দেবু, সাবেক এজিএস শওকত হোসেন ও সাবেক এজিএস ফারহান আহমেদ।

বৈঠকে বসা এসব সাবেক ছাত্রনেতারা নিজেদের অনুসারী ও পছন্দের ছাত্রদের নিয়ে তালিকা তৈরি করেন। এরপর তালিকাভুক্তদের নিয়েই ছাত্র সংসদের কমিটি করার জন্য অধ্যক্ষকে বাধ্য করেছেন। চাপ সৃষ্টি করতে একজন উপমন্ত্রীকে দিয়েও ফোন করিয়েছেন তারা। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই এই আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেন কলেজ অধ্যক্ষ।

এদিকে এক বছরের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত এই আহ্বায়ক কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতাদের অনুসারী ও পছন্দের লোকজন। যেমন, কাউন্সিলর আবদুস সালাম মাসুম ও সাবেক এজিএস শওকত হোসেন দিয়েছিলেন ভিপি তন্ময় দাশ গুপ্তের নাম, দেবাশীষ পাল দেবু দিয়েছিলেন মাকসুদুর রহমানের নাম, কাউন্সিলর আতাউল্লা চৌধুরীর দেওয়া নামের মধ্যে দিবা শাখায় সাহেদ আহমদ ইমন ও বৈকালিক শাখায় বেলাল হোসেন রয়েছেন। শুধু তাই নয়, বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্যদের দেওয়া নামের মধ্যে থেকেই বাকিদের সংযুক্ত করা হয়েছে।

যদিও এক্ষেত্রে শীর্ষ পদ নিয়ে কাউন্সিলর গোলাম মো. জোবায়েরের সাথে মতানৈক্য হয় কলেজ কর্তৃপক্ষ ও বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্যদের। কাউন্সিলর জোবায়ের জিএস পদে ইফতেখার উদ্দিন ইফতি নামের এক শিক্ষার্থীর নাম দিলেও তাকে ওই পদে রাখা হয়নি। এতে বেজায় চটেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে কাউন্সিলর জোবায়ের অধ্যক্ষের সাথে সরাসরি দেখা করে তাকে জানান, ওই তালিকা অনুযায়ী কমিটি হলে তা মানা হবে না। কমিটি করতে হবে সকলকে নিয়ে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাউন্সিলর আবদুস সালাম মাসুম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ছাত্র সংসদের কমিটি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই। আমরা শুধুমাত্র ছাত্রত্ব থাকা শিক্ষার্থীদের সিলেক্ট করে দিয়েছি। কলেজের পরিবেশ ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে অধ্যক্ষ আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। যেহেতু দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ছাত্র সংসদের কমিটি হয়নি, তাই আমরা সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে দায়িত্বের জায়গা থেকেই এই কমিটি গঠনে কলেজ কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু সব দল আসার মত পরিবেশ নেই, তাই নির্বাচনের প্রক্রিয়া করা যায়নি। সকল পক্ষ যদি আসতো তাহলে নির্বাচন হতো। আপাতত আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে হয়েছে। আর এই যুগে কেউ কাউকে চাপ প্রয়োগ করে কিছু করতে পারে, বলুন? খুঁটিনাটি সব বিষয় দেখে, গঠনতন্ত্র মেনেই অধ্যক্ষ ওই কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। নিজেদের স্বার্থ হাসিল হয়নি বলে একটি পক্ষ এসব অবাঞ্চিত কথা বলছে৷’

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর আতাউল্লা চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাবেক ছাত্রনেতাদের (উপরে উল্লেখিত) উপস্থিতিতে সমন্বয় করেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিছু বিষয়ে মতানৈক্য ছিল। সবাই যদি বলে তার লোককে শীর্ষ পদে আনতে হবে তা তো সম্ভব না। আমাদের তো ব্যালেন্স করতে হবে।’

কাউন্সিলর আতাউল্লা আরও বলেন, ‘ছাত্র সংসদের কমিটি দেওয়ার জন্য শিক্ষা উপমন্ত্রী একবছর ধরে লেফট-রাইট করছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন যেভাবেই হোক কমিটি যাতে হয়। আমাদের দেওয়া তালিকা নিয়েও তিনি কলেজ অধ্যক্ষের সাথে কথা বলেছিলেন।’

সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস দেবাশীষ পাল দেবু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের সিনিয়রদের সাথে বসে যোগ্যতার ভিত্তিতে ছাত্রদের একটি তালিকা করে সেটি অধ্যক্ষকে দিয়েছিলাম। তিনি সেখানে কারা নিয়মিত এবং অনিয়মিত সেটা যাচাই-বাছাই করেছেন। নিয়মিতদের রেখে কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে কমিটি হয়নি তাই পদ-প্রত্যাশির সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু সবাইকেই তো আর একই পদে রাখা যায় না। আমরা চেষ্টা করেছি তুলনামূলক যোগ্য ও নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে এই কমিটি করতে। যাতে থমকে থাকা এই প্রক্রিয়া পুনরায় সচল হয়। যারা এবার পদ পায়নি ভবিষ্যতে তাদের সুযোগ আছে। এছাড়া কলেজ ছাত্রলীগের কমিটিতেও তাদের জায়গা হতে পারে।’

সাবেক ছাত্রনেতাদের পছন্দে কমিটি করা কতটা যৌক্তিক? জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ড. সুদীপা দত্ত একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি, জিএস ও অন্যান্য নেতারা সমন্বয় করে আমাকে একটা কমিটি দিয়েছেন। সেখানে কাদের ছাত্রত্ব আছে, কারা নিয়মিত আমি শুধু সেটা দেখেছি।’

তন্ময় দাশ গুপ্ত নামের একজন নবাগত ছাত্রও ছাত্র সংসদের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, অথচ কলেজে ছাত্র রাজনীতি করা অনেক ছাত্রলীগ নেতা কমিটিতে ঠাঁই পাননি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ড. সুদীপা দত্ত বলেন, ‘তন্ময় দাশ গুপ্ত কিংবা বর্মনের ক্ষেত্রে আমার কোন মতামত ছিল না। আমি শুধু চেয়েছি কোনো অনিয়মিত ছাত্র যাতে এই কমিটিতে না আসে।’

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ ড. সুদীপা দত্ত বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যারা কলেজে আছে, কাজ করছে তারা অনিয়মিত। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমি অনিয়মিত ছাত্রকে সংসদে আনতে পারি না। আর ২০ হাজার শিক্ষার্থীর সকলকে চেনা আমার পক্ষে তো সম্ভব না। তাই দীর্ঘদিন ধরে যারা ভিপি, জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে তাদের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। তারা যে সকল শিক্ষার্থীদের চিনে তাদের সংসদে আনতে হয়েছে।’