শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

পদ্মা সেতু বাঙালির অহঙ্কারের ধন

প্রকাশিতঃ ২৫ জুন ২০২২ | ৯:৪১ পূর্বাহ্ন


ড. আতিউর রহমান : পদ্মা সেতু আমাদের সাহসী ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের পরম্পরার এক অসামান্য উপাখ্যানের নাম। প্রতিকূলতাকে জয় করে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়ার এক সংগ্রামী ঐতিহ্যের প্রতিফলন। বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির এক অবিচ্ছন্ন সংগ্রামের আরেক নাম। মুক্তিযুদ্ধের পর শূন্য হাতে সোনার বাংলার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন বলেই বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার ভিত্তিটি এমন মজবুত হয়েছিল। ঠিক তেমনি যখন আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি মাত্র ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে তখনই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আত্মমর্যাদাশীল উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অভিপ্রায়ে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অঙ্কের বিদেশি মুদ্রার বিনিয়োগসহ মেগা প্রকল্প নিজেদের অর্থে গড়ার এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এক সাগর রক্ত পেরিয়ে বাঙালি বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় উদযাপন করেছিল। তখনো আমাদের বিজয় অসমাপ্ত। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই তা পূর্ণতা পায় বন্দিদশা থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে পা ফেলার পর। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে’ পা রেখেছিলেন। প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছিলেন। ধ্বংসস্তুপ থেকে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সংগ্রামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলায় আগামী দিনের মায়েরা হাসবে, শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবো। ক্ষেত-খামার, কলকারখানায় দেশ গড়ার আন্দোলন গড়ে তুলুন। কাজের মাধ্যমে দেশকে নতুন করে গড়া যায়। আসুন সকলে মিলে সমবেতভাবে আমরা চেষ্টা করি যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে, সোনার বাংলাকে আমরা নতুন করে গড়ে তুলতে চাই।’

তখন রিজার্ভে এক ডলারও নেই। কোটি শরণার্থী পুনর্বাসনের অপেক্ষায়। সড়ক, রেল, সেতু, বন্দর, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত। কোথাও ফেরি নেই। আশি শতাংশ মানুষ গরিব। খাদ্যাভাব তীব্র। এমনি বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতেও বঙ্গবন্ধু মানুষের অফুরান প্রাণশক্তির ওপর ভরসা করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলার ডাক দিয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিবেশে বড় আশা করার এই যে শিক্ষা তিনি জাতিকে দিয়ে গেছেন- সেটিই সবচেয়ে বড় পুঁজি হিসেবে আজো আমাদের চলার পথে সবচেয়ে বড় পাথেয় হিসেবে কাজ করছে। তাঁর দেয়া লড়াই করে বেঁচে থাকার এই সামাজিক পুঁজিই সব সংকটকালে বাঙালির বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচ্য।

রবীন্দ্রনাথ যেমন আশা করার অধিকারের কথা বলতেন বঙ্গবন্ধুও তেমনি ‘বিপদে যেন না করি ভয়ের’ সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করতেন। ‘লক্ষ্য ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আশা করিবার অধিকারই মানুষের শক্তিকে প্রবল করিয়া তোলে। … আশা করিবার ক্ষেত্র বড়ো হলেই মানুষের শক্তিও বড়ো হইয়া বাড়িয়া ওঠে। … কোনো সমাজ সকলের চেয়ে বড়ো জিনিস যাহা মানুষকে দিতে পারে তাহা সকলের চেয়ে বড়ো আশা।’ সেই আশার ভিত্তি ও ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়ে গেছেন। তাঁর সেই আশাবাদী নেতৃত্বের পরম্পরা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মাঝেও সম্প্রসারিত হতে পেরেছে বলেই আজকের বাংলাদেশ এতটা সাহসী এবং সফল হতে পেরেছে। শুধু পদ্মা সেতু নয় আরো অনেক মেগা প্রকল্প এখন দৃশ্যমান। বিশেষ করে মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, বঙ্গবন্ধু শিল্প পার্কের মতো প্রকল্পগুলোও এখন চারদিকে আলো ছড়াচ্ছে। এসব চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুরো চেহারাটাই বদলে যাবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিস্ফোরণ ঘটবে। আমরা তখন ‘ডাবল ডিজিট’ (দশ শতাংশের বেশি) প্রবৃদ্ধির মহাসড়কে উঠে যাব।

বড় আশা নিয়ে বড় প্রকল্প হাতে নেয়ার প্রথম পরীক্ষা বঙ্গবন্ধুকন্যা পদ্মা সেতুর মতো চ্যালেঞ্জিং মেগা প্রকল্পটি স্বদেশী অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই শুরু করেছিলেন। চারদিকে তখন নাগিনরা ফেলছিল বিষাক্ত নিশ্বাস। বাংলাদেশ ও তার নেতৃত্বকে অপবাদ দেয়ায় তখন ‘আলোকিত মানুষেরা’ অসাধারণ তৎপর। তখনো পদ্মা সেতুর নির্মাণের ঠিকাদার ঠিক করা হয়নি। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞ প্রস্তাবিত এই সেতুর কারিগরি কমিটি যাচাই-বাছাইয়ে ব্যস্ত। অথচ বিশ্বব্যাংকের ‘ইন্টিগ্রিটি ডিপার্টমেন্ট’ মনগড়া সব অভিযোগ করে যাচ্ছে তথাকথিত দুর্নীতির কথা বলে। জামিল স্যার পরে আমাকে বলেছেন এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তিই ছিল না। আর সে কারণেই কানাডার আদালতও রায় দিয়েছে যে এসব অভিযোগ ছিল বানোয়াট। নিরোদ চৌধুরীর ভাষায় আত্মঘাতী বাঙালিদের লম্পঝম্প আমি বিদেশে বসেও দেখেছি। আর স্বদেশের মুখে কালি লাগানোর এই প্রতিযোগিতা দেখে হতাশ হয়েছি। ভাবুন, সেই সময় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মনের অবস্থা কী হতে পারে। সে দিনের অর্থ বিভাগের আপসকামিতা তাকে অবাকই শুধু করেনি দুঃখও দিয়েছে। আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি এমন হতাশাজনক পরিস্থিতিতেও বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গবন্ধুর দেয়া লড়াকু মনের জোরে সব ষড়যন্ত্র কীভাবে ভণ্ডুল করে দিয়েছিলেন। আর দেশের সম্মান বাঁচাতে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের নিজস্ব অর্থায়নেই আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করব।’

আমার সৌভাগ্য- এই সংকটকালে তার পাশে থাকতে পেরেছিলাম। তাই তো তিনি তার দলের এক সভায় পদ্মা সেতুর অর্থায়ন কৌশল নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত তার সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে। তার ঘোষণার পরপরই আমরা গভর্নরের অফিসে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা করেছিলাম। ওই সভাতেই আমরা ঠিক করেছিলাম সরকার এডিপিতে পদ্মা সেতু বাবদ যে অর্থ বরাদ্দ করবে তা থেকে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ডলার কেনা হবে। অগ্রণী ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত ডলার না থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে তা দেয়া হবে। এই ব্যবস্থা আজো সচল আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলেটরি সমর্থন নিয়ে অগ্রণী ব্যাংক এরই মধ্যে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পদ্মা সেতুর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রদান করেছে। আমার বিশ্বাস বাদবাকি ডলার চাহিদাও এই ব্যবস্থায় খরচ করা সম্ভব হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বক্ষণ সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকবে। শুধু ব্যাংকিং খাত কেন, সরকারি ও বেসরকারি অনেক অংশীজন পদ্মা সেতু নির্মাণে কাজ করেছেন। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ শুরু থেকেই এই প্রকল্পে কারিগরি সমন্বয়কের কাজ করেছে। বেসরকারি উদ্যোক্তা আব্দুল মোনেম গ্রুপ সহনির্মাতা হিসেবে দারুণ কাজ করেছে। স্থানীয় প্রশাসনও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

প্যানডেমিক, প্রলম্বিত বর্ষা এবং সময়মতো বিদেশ থেকে বিরাট সব যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মতো বড় বড় ঝক্কি সামাল দিয়ে এই অংশীজনরা দিন-রাত কাজ করেছেন। আমাজনের পর সবচেয়ে খরস্রোতা পদ্মা সেতুর বুক চিরে ১২৮ মিটারের বিশ্বের গভীরতম পিলার গড়া খুব সহজ কাজ ছিল না। এর জন্য বিশেষ হ্যামার জার্মানি থেকে ‘কাস্টমাইজ’ করে সংগ্রহ করতে হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে সেতু নির্মাণের সময় খানিকটা বেশি লাগতেই পারে। আশপাশের জনগণ সর্বদাই দেখেছেন বাস্তবায়নকারী অংশীজনরা কী নিষ্ঠার সঙ্গে দিন-রাত কাজ করেছেন। বছর তিনেক আগে সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমাকে এই সেতু নির্মাণের কর্মযজ্ঞ কাছে থেকে দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সারাদিন ধরে সব অংশীজনের কাজের ধরন আমি দেখেছি। নদী শাসন, ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের পুনর্বাসন, সেতুর দুই পারের মহাসড়ক নির্মাণ, টেলিকেন্দ্র স্থাপন এবং দেশি ও বিদেশি ঠিকাদারদের কাজকর্ম আমি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। তখন ছিল বর্ষাকাল। কী স্রোত! তার মধ্যেও প্রকৌশলী ও কর্মীদের কী যে প্রাণান্ত কর্মচাঞ্চল্য দেখেছি তা লিখে বোঝাতে পারব না। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই স্বপ্নের সেতু এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। আমি স্বদেশ থেকে অনেক দূর। দেশে থাকলে নিশ্চয় আমি এই উদ্বোধনের আনন্দ যাত্রায় যুক্ত হতাম।

পদ্মা সেতু নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নোংরা বিতর্কের সবচেয়ে বড় পাওনা হলো স্বদেশী অর্থায়নে এমন একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেতৃত্বের সৎসাহস প্রদর্শনের সুযোগটি। এই সেতু শুধু দক্ষিণ বাংলার একুশটি জেলাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করবে তাই নয়, ট্রান্স-এশীয় হাইওয়ে ও রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনকেও সমৃদ্ধ করবে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য সংযোগ বাড়বে। আর দক্ষিণ বাংলার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও ডিজিটাল সেবায় বিপ্লব ঘটাবে। আগে পণ্যবাহী যে ট্রাকগুলো দিনের পর দিন মাওয়া-জাজিয়া ঘাটে অপেক্ষা করত তা নিমিষেই পারি দেবে। পচনশীল কৃষি পণ্যের দ্রুত পরিবহনের সুফল দক্ষিণ বাংলার কৃষক ও ঢাকার ভোক্তারা পাবেন। দক্ষিণ বাংলায় এসএমই ও বড় শিল্প গড়ে উঠবে। বিসিক জানিয়েছে এরই মধ্যে বরিশালে প্রায় হাজার খানেক ছোট ও মাঝারি শিল্প ইউনিট স্থাপনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। সেখানে জমির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। হাইওয়ের দুপাশে জমির দাম তিনগুণের বেশি হয়ে গেছে। সেতুর ওপারে চরে রিসোর্ট হতে যাচ্ছে। সরকারের উদ্যোগে বিরাট কনভেনশন সেন্টার, বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থাপনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জামিল স্যার আমাকে বলেছিলেন যে সেতুর দুই পারে সাংহাইয়ের মতো বড় আধুনিক নগর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণের যে অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের সঙ্গে থেকে আমাদের প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা অর্জন করেছেন তা দিয়ে ভবিষ্যতে আরো বড় সেতু আমরা নিজেরাই তৈরি করতে পারব। সেই অর্থে পদ্মা সেতুটি আসলে আমাদের সামর্থ্য বৃদ্ধির এক সফল প্রশিক্ষাণাগার হিসেবেও বিবেচ্য হতে পারে।

খুলনা ও বরিশালে জাহাজ শিল্প ছাড়াও পর্যটন শিল্প প্রসারের বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। কুয়াকাটা এরই মধ্যে নতুন রূপে সাজতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু সমাধিস্থল, ষাট গম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন, নড়াইলের সুলতান আর্ট কেন্দ্র ঢাকার ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য দিন গুনছে। দক্ষিণ বাংলায় আরো বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপিত হবে। সেতুর ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইন্টারনেটে পাইপলাইন যাবে। ফলে অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি সুলভে ডিজিটাল সেবাভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রসার এবং হাইটেক পার্কের প্রসার ঘটবে। এরই মধ্যে যশোরে হাইটেক পার্ক চালু হয়ে গেছে। মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে রেলে বা গাড়িতে কলকাতা পৌঁছে যাওয়া যাবে। নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে পায়রা ও মোংলা বন্দরের সেবা এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুযোগে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। সব মিলে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ বাংলার জিডিপি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়বে। আর জাতীয় জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ হারে। রেল চালু হলে আরো এক শতাংশ। বছরে দুই লাখের মতো তরুণের কর্মসংস্থান হবে। এই এলাকার দারিদ্র্য কমবে ১ দশমিক ০১ শতাংশ হারে। দেশের দারিদ্র্য কমবে বাড়তি ০ দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে। সব মিলে এক বিশাল অর্থনৈতিক উলম্ফনের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা দক্ষিণ বাংলার মানুষ। তিনি বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের কষ্ট বোঝেন বলেই এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। ‘আমরাও পারি’ এই দেশপ্রেমিক সংস্কৃতির প্রসারে তার অবদানের কথা বাঙালি চিরদিন মনে রাখবে। প্রবাসীরা পদ্মা সেতুর জন্য ডলার পাঠাতে ছিলেন উদগ্রীব। আমাকে প্রায়ই বার্তা পাঠাতেন কী করে ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ তারা পাঠাবেন। শেষ পর্যন্ত সরাসরি না হলেও তাদের পাঠানো প্রবাসী আয় দিয়েই তো গড়ে উঠেছে এই স্বপ্নের মিনার। তাই তো অবাক হই না যখন জসিম উদ্দিন ষোল হাজার টাকায় আইসিউ সুবিধা সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তার মুমূর্ষু সন্তানকে পদ্মা সেতু দেখাতে নিয়ে যান। আরো অবাক হই না যখন জানতে পারি যে গুগল সার্চে পদ্মা সেতু বা ব্রিজ লিখলে আড়াই কোটি লিংকের সন্ধান মেলে।

তাই আসুন ২৫ জুন দল-মত নির্বিশেষ পুরো বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পদ্মা সেতু উদ্বোধনের উৎসবে অংশগ্রহণ করি। যারা বুঝে বা না বুঝে এর বিরোধিতা করেছেন তাদেরকেও আমন্ত্রণ জানাই আমাদের অর্থনৈতিক মুুক্তির এই উজ্জ্বল মাইলফলকটি দর্শনের। স্বশরীরে কিংবা ভার্চুয়ালি। আসুন আমরা জয়ধ্বনি করি স্বদেশী উন্নয়নের এই সাফল্যে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক।