শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ম্যাক্স হাসপাতালে ‘ভুল চিকিৎসায়’ রাইফার মৃত্যু, ৪ বছরেও শেষ হয়নি পুলিশি তদন্ত

| প্রকাশিতঃ ২৮ জুন ২০২২ | ১০:৩৩ অপরাহ্ন


এম কে মনির : মাত্র দুই বছর চার মাস বয়সেই অকালে না ফেরার দেশে চলে গেছে সাংবাদিককন্যা রাফিদা খান রাইফা। পরিবারের অভিযোগ, চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে রাইফার মৃত্যু হয়েছে।

২০১৮ সালের ২৯ জুন মধ্যরাতে এই হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটলেও এখনও শেষ হয়নি পুলিশি তদন্ত। বর্তমানে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির তদন্ত করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের পরিদর্শক (প্রশাসন) আবু জাফর মো. ওমর ফারুক।

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে আবু জাফর মো. ওমর ফারুক আজ মঙ্গলবার দুপুরে তার দপ্তরে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে পুরো দেশ স্থবির হয়ে পড়ে। আমি নিজেও দুইবার করোনায় আক্রান্ত হই। ফলে মামলার তদন্ত পিছিয়ে পড়ে। আমরা আর কাজ আগাতে পারিনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দ্রুত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হবে। বিএমডিসি’র রিপোর্ট আমলে না নিয়ে উপায় নেই। এটি সরকারি সংস্থা। তাদের রিপোর্ট আমাদের লাগবেই। আশা করি, ১ সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারব।’

অন্যদিকে রাইফার বাবা, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য রুবেল খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে আমার একমাত্র শিশুকন্যা রাফিদা খান রাইফার অকাল মৃত্যু হয়। এটি মেডিকেল মার্ডার ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই এই নির্মম ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমার মেয়ের মৃত্যুর পর এমন কোন দিন নেই যেদিন আমার স্ত্রী চোখের জল ফেলেননি। প্রতিদিনই তাকে কাঁদতে দেখতে হয়েছে আমাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দোষীদের শাস্তি হলে আমার স্ত্রী ও মৃত কন্যার আত্মা শান্তি পাবে। সেই সাথে এদেশে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর হার হ্রাস পাবে এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটা আমূল পরিবর্তন আসবে। এ জন্যই আমি আইনের আশ্রয় নিয়েছি। তবে বিচার দূরে থাক, গত চার বছরেও পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়াটা খুবই দুঃখজনক ও হতাশাজনক।’

রুবেল খান অভিযোগ করেন, চট্টগ্রামের বিএমএ নেতারা ও ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত চিকিৎসকদেরকে বাঁচানোর জন্য এখনও নানামুখী অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা ক্ষমতা ও টাকার জোরে সবকিছুই নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করছেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

রাইফার মা রুমানা খান বলেন, ‘রাইফার বড় কোনো অসুখ ছিল না। প্রাণঘাতি অসুখ না হওয়ার পরও চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন সে। যাদের কারণে আমার কোল খালি হয়েছে, আমার সন্তান পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এর আগে ২০১৮ সালের ২৮ জুন রাইফার গলা ব্যাথা হলে তাকে চট্টগ্রাম নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন ২৯ জুন মধ্যরাতে ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফার মৃত্যু হলে চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে রাইফার পরিবার।

রাইফার পরিবার ওইসময় অভিযোগ করে, হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই রাইফাকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে চিকিৎসায় সীমাহীন অবহেলা করেছেন চিকিৎসকরা। পরবর্তীতে ওই বছরের ১৮ জুলাই ম্যাক্স হাসপাতালের ৪ চিকিৎসককে আসামি করে চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন রাইফার বাবা সাংবাদিক রুবেল খান।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, শিশু কন্যা রাইফা ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় রফিসিন নামের একটি অ্যান্টিবায়োটিক পুশ করা হয়। মূলত ওই আ্যান্টিবায়োটিক ভুলবশত পুশ করেন চিকিৎসকরা। পুশ করার পর থেকে রাইফার শরীরের অবস্থা দ্রুত অবনতি হয়। রাইফার শরীরে বিপরীত প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এতে শিশু রাইফার শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি হয়। পরবর্তীতে রাইফার মুমূর্ষু অবস্থায় দ্বিতীয়বার ভুল চিকিৎসার দেয়া হয়। তাকে এনআইসিইউতে রাখার প্রয়োজন হলেও কেবিনের ভেতর রেখে ওভারডোজ সেডিল পুশ করা হয়। ফলে তার মৃত্যু হয়।

অভিযোগের বিষয়ে ম্যাক্স হাসাপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী খানের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে রাইফার মৃত্যুর বিষয়ে ডা. লিয়াকত আলী খান সেসময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা যায়, সেদিন শিশুটির খিঁচুনি শুরু হওয়ার পর যখন দাঁত ভেঙে যায় তখন তার বাবা তাকে নিয়ে ছোটাছুটি করছিল। এ সময় তাকে আইসিইউতে নেওয়া উচিত ছিল। তা না করে ডা. দেবাশীষ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সেদিনই আমরা ডা. শুভ্র দেবের কাছে জানতে চাই, ওই রকম পরিস্থিতিতে সিনিয়র প্রফেসরের সাথে আলোচনা করা উচিত ছিল। দুজনকেই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. বিধান রায়ের বিষয়ে লিয়াকত আলী বলেন, ‘তিনি আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক নন। রোগীর স্বজনরা না ডাকলে আমরা উনাকে কল দিব না।’

এদিকে চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ তুলে ম্যাক্স হাসপাতালের ৪ চিকিৎসক ডা. বিধান রায় চৌধুরী, ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত, ডা. শুভ্র দেব ও ম্যাক্স হাসাপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকতকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন রাইফার বাবা সাংবাদিক রুবেল খান। পরে ২০১৯ সালের শুরুতে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু মামলা দায়েরের ৪ বছর পার হলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি সংস্থাটি।

চার বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করছেন রাইফার পরিবার। তার পরিবারের দাবি, দীর্ঘ ৪ বছর হলেও মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়নি। এতে বিচারকাজ দীর্ঘ হচ্ছে। ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চিয়তা ক্ষীণ হচ্ছে। আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিম্ন আদালত থেকেও জামিনে আছেন। আদালত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পর্যন্ত তাদের জামিন দিয়েছেন।

রাইফার বাবা রুবেল খান অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন আসামিরাই প্রভাবিত করে বিলম্ব করাচ্ছেন। ৪ বছর হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি পিবিআই। তারা বর্তমানে বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) এর রিপোর্টের উপর নির্ভর করছেন। এটি মূলত চিকিৎসকদের সংগঠন হওয়ায় অভিযুক্ত চিকিৎসকদের নিয়ে স্বজনপ্রীতি করার সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসকদের সংগঠন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোন রিপোর্ট দিবে বলে মনে হয় না।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৯ জুন ম্যাক্স হাসপাতালে রাইফার মৃত্যুর পর ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সেসময় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে রাইফার চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদন্ত কমিটি ম্যাক্স হাসপাতালের ১১টি ত্রুটি চিহ্নিত করে এবং ওইসময় ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম-ব্যবস্থাপনার দায়ে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করে।