শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

ডা. হাসানুজ্জামানের রাত জাগিয়ে রোগী দেখা, গুমড়ে কাঁদছে মুমূর্ষু রোগীরা

প্রকাশিতঃ ৫ অগাস্ট ২০২২ | ১০:০২ পূর্বাহ্ন

একুশে প্রতিবেদক : মঙ্গলবার, ২ জুলাই। রাত আড়াইটা। ওই সময়ে তোলা এ ছবিতে দেখা যাচ্ছে ১০ জন অপেক্ষমাণ রোগীকে। ছবির বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন আরও ২-৩ জন।রাত জেগে তারা অপেক্ষা করছেন নগরের সিএসসিআর হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ৩১৪ নম্বর কক্ষের সামনে।

এত রাতে ওই কক্ষে রোগী দেখছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান এফসিপিএস (মেডিসিন) ও এমডি (নিউরো মেডিসিন) ডা. মো. হাসানুজ্জামান। তীব্র অসুস্থ, মুমূর্ষু রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওইসব রোগীদের অপেক্ষা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসক হাসানুজ্জামানের ‘অমূল্য’ সাক্ষাতের জন্যে।

এদের কেউ নতুন রোগী, কেউবা ডায়াগনোসিস রিপোর্ট দেখাতে এসেছেন। রিপোর্ট যারা দেখাবেন তারা রাত ৯টা থেকে অপেক্ষা করছেন রাত সাড়ে ১১টায় ডাক্তার আসবেন জেনেও। কারণ আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে তারা রিপোর্ট দেখানোর সিরিয়াল পাবেন ডাক্তারের সহকারির কাছে।

জানা যায়, ১৫ মিনিট করে একজন রোগীর পেছনে ব্যয় করেন ডা. মো. হাসানুজ্জামান। সে হিসেবে রাত আড়াইটা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকা অবশিষ্ট ১২ জন রোগীকে ১০ মিনিট করে দেখলেও সময় ব্যয় হবে আরও অন্তত ১২০ মিনিট, ঘণ্টা হিসেবে দুই ঘণ্টা। অর্থাৎ সব রোগী দেখা শেষ করতে প্রতিদিনই ভোর ৪-৫ টা বেজে যায়।

এ অবস্থায় রাত ৯ টা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ১১টা থেকে রাত জেগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে অসুস্থ রোগী তো বটেই; সুস্থ রোগীও কখনো কখনো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন– এই অভিমত ভুক্তভোগীদের।

গ্রাম থেকে আসা ভুক্তভোগী মো. তারেক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ডা. হাসানুজ্জামানের সিরিয়াল পাওয়া যেন সোনার হরিণের দেখা পাওয়া। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত নির্ধারিত নাম্বারে ফোন করেও বেশিরভাগ সময় সংযোগ মিলে না। পুরো সপ্তাহজুড়ে চেষ্টা করতে গিয়ে হঠাৎ গুপ্তধন পাওয়ার মতো সংযোগ পাওয়া যায়। অতপর মিলে বহু কাঙ্ক্ষিত সিরিয়াল।’

তারেক জানান, ‘এভাবে লাগাতার এক সপ্তাহ চেষ্টা করার পর সম্প্রতি এক সোমবারের জন্য ১০ নম্বর সিরিয়াল পাই আমার স্ট্রোকের রোগী মুমূর্ষু মাকে দেখানোর। আমার মায়ের বাম অংশ কিছুটা অবশ। হাঁটেন খুড়িয়ে খুড়িয়ে। রাত জাগতে পারেন না। কথার স্বরও স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় সহকারির কথা মতো মুমূর্ষু মাকে নিয়ে রাত ১১টায় ডা. হাসানুজ্জামানের চেম্বারে যাই। সাড়ে ১১টায় ডাক্তার চেম্বারে প্রবেশ করেন। ততক্ষণে প্রায় ৪৫ জন রোগী ও তাদের এটেন্ডেন্স মিলিয়ে প্রায় শ’খানেক মানুষের জটলা। এর মধ্যে ১৫ জন নতুন রোগী, ৩০ জন রিপোর্ট দেখাবেন।’

তারেক বলেন, ‘রাত আড়াইটা পেরিয়ে গেলেও ১০ নম্বর সিরিয়ালের কোনো খবর নেই। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এর মধ্যে ৮ জন রোগী ও ১৬ জনের রিপোর্ট দেখেছেন ডাক্তার সাহেব। ততক্ষণে শুধু আমার মা নয়, অনেক মুমূর্ষু রোগীকে দেখেছি ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে। প্রায় সাড়ে ৩টা নাগাদ আমার মা’র যখন ডাক পড়লো ততক্ষণে তিনি নেতিয়ে পড়েছেন। স্ট্রোকের ধকলের সঙ্গে ঘুমোরে ঘোর, নির্ঘুম থাকা আর একটানা বসে থাকার ধকল – সবমিলিয়ে মা আমার ঠিকমতো ডাক্তারকে এটেন্ডও করতে পারেননি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেলো, ডা. হাসানুজ্জামানের স্ত্রী সোয়েলা শাহনাজও একজন চিকিৎসক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক গাইনি বিশেষজ্ঞ এ চিকিৎসক সিএসসিআর এ নিয়মিত রোগী দেখা শেষে রাত ১১টায় বাসায় ফিরেন। সন্তানদের বাইরের শিক্ষক দিয়ে পড়ান না হাসানুজ্জামান।তিনি নিজেই সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সন্তানদের পড়ান। রোগী দেখা শেষ করে স্ত্রী বাসায় ফেরার পর রাতের আহার সেরে ডা. হাসানুজ্জামানের চেম্বারে আসতে আসতে রাত সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত বেজে যায়। এভাবে পরিবার ও সন্তানমুখী হতে গিয়ে ডা. মো. হাসানুজ্জামান মুমূর্ষু রোগীদের রাত জাগাচ্ছেন, সুস্থতার বদলে উল্টো অসুস্থতা বাড়িয়ে তুলছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এত কষ্ট করে, বিনিদ্র রজনী থেকে কেনইবা ডা. হাসানুজ্জামানকে দেখাতে হবে? এর জবাবে অনেকে বলেছেন তিনি মেডিসিন ও নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। বহু আগেই একটা মিথ ছড়িয়ে পড়েছে যে, তার কাছে গেলেই বিশেষত স্ট্রোকের রোগী সুস্থ হয়ে যান। সে কারণে রাত-বিরাত একাকার করে তার পানে ছুটছেন একশ্রেণির রোগী। কিন্তু পরবর্তীতে আউটপুট কী, সুস্থতা কতটুকু এসব না ভেবে বিশ্বাসে মেলায় বস্তুর মতো তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে দেখা যায় গ্রামাঞ্চলের অনেক রোগীকে।

জানা যায়, যখনই বুঝতে পারলেন, শুধু রাত নয় দিনরাত ২৪ ঘণ্টা জেগেও একশ্রেণির মানুষ ডা. হাসানুজ্জামানের সাক্ষাৎ লাভে মরিয়া তখনই রোগী-সাক্ষাতের সময়টা তার সময় ও প্রয়োজন মতো করে নিয়েছেন ডা. হাসানুজ্জামান।

জানা গেছে, একশ্রেণির নাম সর্বস্ব ক্লিনিকসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ‘কলে’ রোগী দেখেন ডা. মো. হাসানুজ্জামান। বিষয়টি যারা জানেন বা ওই সব ক্লিনিকের খোঁজ যাদের কাছে আছে তাড়া হয়রানি ও ভোগান্তি এড়াতে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডে কেয়ারে ভর্তি হন।

ভর্তি হওয়ার পর ডা. হাসানুজ্জামানকে ‘কল’ দেওয়া হয় ওই ক্লিনিক থেকে। যত দ্রুত সম্ভব ডা. হাসানুজ্জামান ওই ক্লিনিকে গিয়ে ১৫-২০ মিনিটে রোগী দেখে ফিরে আসেন। বিনিময়ে হাসানুজ্জামান ৩ হাজার ফিস নেন। আর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ পাচ্ছেন ২ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিদিন ক্লিনিকের কলে প্রতিজন থেকে ৩ হাজার টাকা ফি গ্রহণে অন্তত ৮ থেকে ১০ জন রোগী দেখেন বলে জানা যায় । অবশ্য চেম্বারে তার ফিস ১ হাজার টাকা।

এ প্রসঙ্গে রাউজানের নোয়াপাড়া নিবাসী জসিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, কবুল আহমেদ নামে আমার এক আত্মীয়কে কম করে হলেও ক্লিনিকের ডে কেয়ারে ভর্তি করিয়ে ৮ বার ডা. হাসানুজ্জামানকে দেখিয়েছি প্রতিবারই ৫ হাজার টাকা খরচ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার আত্মীয়কে বাঁচাতে পারিনি। – বলেন জসিম উদ্দিন।

এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের অন্য কোনো ডাক্তার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১ টার বেশি রোগী দেখেন বলে আমার জানা নেই। ডা. মো. হাসানুজ্জামান সাহেবই ব্যতিক্রম। তিনি রাত জেগে রোগী দেখেন। এটা রোগী দেখার কোনো নিয়ম হতে পারে না।এক্ষেত্রে একটা নিয়ম ও শৃঙ্খলা থাকা জরুরি।’

আপনারা উদ্যোগী হয়ে উনাকে অনুরোধ করে একটা শৃঙ্খলায় ফেরাতে পারলে রোগীদের দুর্ভোগ ও কষ্ট অনেকাংশে দূর হতো– এমন প্রশ্নে ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘ভাই উনাকে রিচ করা মুশকিল। কখনোই ফোনে পাওয়া যায় না।’

এব্যাপারে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও ডা. মো. হাসানুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।