বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

হুমকির মুখে মাছের ‘খনি’

প্রকাশিতঃ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০:৩২ অপরাহ্ন

জিন্নাত আয়ুব : বঙ্গোপসাগর মাছের ‘খনি’ হিসাবে খ্যাত। সেই খনি থেকে মাছ আহরণ কমে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরও বলছে, দেশে যে পরিমাণ মাছ উৎপাদন ও আহরণ হয় তাতে সামুদ্রিক মাছের অবদান কমে গেছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে সামুদ্রিক মাছের অবদান ছিল প্রায় ২২ ভাগ, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে এর অবদান কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ ভাগে। দুই দশকে সামুদ্রিক মাছের অবদান কমেছে সাত ভাগের বেশি।

মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক মৎস্য পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে ইন্ডিয়ান স্যামন মাছ বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত লাক্ষা ধরা পড়েছিল ৩ হাজার ৩০ মেট্রিক টন। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাছটির আহরণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬৩ মেট্রিক টনে। এক দশকের ব্যবধানে রুপচাঁদা আহরণ চার ভাগের তিন ভাগ কমেছে বলছে মৎস্য অধিদপ্তর। তারা বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে সাগরে রুপচাঁদা ধরা পড়েছিল প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০২০-২১ বছরে ধরা পড়েছে ৯ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি।

রিঠা মাছের আহরণও এক দশকের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে এই জাতীয় মাছের আহরণ ছিল প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই মাছের আহরণ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশিতে। সাগরে চিংড়ি আহরণও কমেছে। এক দশকে চিংড়ি আহরণ কমেছে ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে সাগরে চিংড়ি আহরণ হয় প্রায় ৫৮ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশী ট্রলারের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও নির্বিচারে মাছ শিকার, বোমা ও রাসায়নিক ব্যবহার করে মৎস্যক্ষেত্রের ক্ষতিসাধন, প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার, তেলসহ বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর বর্জ্যরে প্রতিক্রিয়া এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত প্রভাবই মাছ কমে যাওয়ার বা আহরণ কম হওয়ার কারণ।

সরেজমিন বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) থেকে রোববার (১৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত আনোয়ারা উপজেলায় উঠানমাঝির ঘাট, ছত্তার মাঝির ঘাট, গলাকাটার ঘাট এবং বাঁশখালীর শেখেরখীল ফাঁড়ির মুখ, চাম্বল বাংলা বাজার ঘাট, গন্ডামারা বড়ঘোনা খাটখালী, খানখানাবাদ প্রেমাশিয়া ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, সাগরে পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে জেলেরা হতাশ।

আনোয়ারা উপকূলের জেলেরা জানান, বঙ্গোপসাগরে এবার লঘু ও নিম্নচাপ বেশি হচ্ছে। গেল তিন সপ্তাহ গভীর সাগরে যেতে পারেননি তারা। বৈরি আবহাওয়ার কারণে সাগরে গেলেও আবার ফিরে আসতে হয় তাদের।

বাঁশখালী উপকূলের জেলেরা বলছেন, এখন আর আগের মতো সাগরে জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মেলে না। তার উপর প্রতিনিয়ত বৈরী আবহাওয়া তো আছেই। তাই কোনো জেলের মুখেই নেই হাসি।

আনোয়ারার ছাত্তারমাঝি ঘাট এলাকার আড়তদার আব্দুর রহিম বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে আবহাওয়া কিছুটা ভালো হলে জেলেরা সমুদ্রে মাছ শিকারে যায়। কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হলে তারা আবার তীরে ফিরতে শুরু করে। গত সোমবার একটি ট্রলার ডুবির ঘটনাও ঘটে। তবে জেলেদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

বাঁশখালীর মনকিচর এলাকার ফরিদ মাঝি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে খরচ বেড়ে গেছে। আর এর আগে যে পরিমাণ মাছ পেতাম এখন বৈরি আবহাওয়ার কারণে সেই পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি নিষেধাজ্ঞা পালনের সময়কার দেনা তো শোধ করতে পারি নাই। এখন আবার নতুন করে ধার-দেনা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।

উঠান মাঝি ঘাট এলাকার জেলে সমবায়ের সভাপতি মো. নাছির বলেন, গভীর সমুদ্রে মাছের সংখ্যা খুবই কম। তার উপর সাগরে লঘুচাপ লেগেই আছে। এতে সাগরে জাল ফেলতে পারি না। তার আগেই উপকূলে উঠে আসতে হয়। এই আসা-যাওয়ায় আমরা লসে আছি।

এদিকে সামুদ্রিক মাছ সংকটের প্রভাব পড়েছে হাট-বাজারগুলোতেও। আনোয়ারা চাতরী চৌমুহনী বাজারে গিয়ে দেখা গেছে সামুদ্রিক মাছ নেই। বাজারে বিক্রি হচ্ছে খামার ও পুকুরে উৎপাদিত তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, বাটা, ট্যাংরা, চিংড়ি প্রভৃতি মাছ। দামও আকাশছোঁয়া। সামুদ্রিক মাছ লইট্যা, রুপচান্দা, কোরাল, ইলিশ, পোপা মাছ নেই।

এ বাজারে মাছ কিনতে আসা ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দীন (৩৫) বলেন, সাগরে মাছ না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে হাটবাজারে। এখন ১২০ টাকার তেলাপিয়া কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায়, ৪০০ টাকার ছোট চিংড়ি ৫০০-৬০০ টাকা। এরকম হলে আগামী দিনে মাছের দাম আরও বাড়বে। তখন মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে।

বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. মাঈনুল বলেন, চলমান বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেদের জালে মাছ ধরা পড়ছে না। এ কারণে বাজারের মাছের সংকট চলছে। এখন বাজারে সামুদ্রিক মাছ নেই বললে চলে। তবে কিছু বাজারে আগের মজুত করা সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। কয়েক দিনের মধ্যে মজুত শেষ হলে সংকট আরও বাড়বে।

বাঁশখালী গুনাগরী বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানেও সামুদ্রিক মাছ নেই। লোকজন খামার ও পুকুরে উৎপাদিত তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই মাছ কিনছেন।

মাছ কিনতে আসা গুনাগরী এলাকার বাসিন্দা কবির আহমদ বলেন, আমার ৬০ বছর বয়সের মধ্যে বাজারে এই রকম সমুদ্রের মাছ সংকট আর দেখি নাই। এরকম হলে মানুষ খাদ্যের সংকটে ভোগতে সময়ের ব্যাপার মাত্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলার বটতলী বাজার, মালঘর বাজার, মহাঁল খান বাজার, জয়কালীর হাট এবং বাঁশখালী উপজেলার চাঁনপুর বাজার, গুনাগরি, রামদাশ মুন্সীরহাট, বৈলছড়ি কেবি বাজার, জলদী মিয়ার বাজার ও উপজেলা সদর থেকে শীলকূপ টাইমবাজার, চাম্বল বাজার, নাপোড়া বাজার, পুঁইছড়ি প্রেমবাজারসহ অন্তত ৩৫টি বাজারেও সামুদ্রিক মাছের তীব্র সংকট চলছে। চাহিদা বাড়ছে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, বেড়, গ্রাসকার্প মাছের। এসব মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ৪০০ টাকায়, যা আগে ছিল ১০০ থেকে ২৬০ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে দস্যুর হানা, মাছ ধরার পাশাপাশি মৎস্যক্ষেত্র ধ্বংস, অতিরিক্ত মাছ শিকার, তেলসহ বিভিন্ন বর্জ্যদূষণ, আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি মোটেই নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ওই উৎপাত-উপদ্রব চলছে। অথচ এসবের প্রতিকারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি সরকারের। এ প্রেক্ষিতে মাছ কমে যাওয়া, মাছের অবস্থান ও বিচরণ এলাকার পরিবর্তন অস্বাভাবিক ও অসম্ভব বলে মনে হয় না।
জানা গেছে, সমুদ্রে বাংলাদেশ সীমানার কাছাকাছি অক্সিজেনশূন্য এলাকার সৃষ্টি হয়েছে। পানির নীচে অক্সিজেন ছাড়া মাছ বা জলজ প্রাণীর টিকে থাকা সম্ভব নয়। হয় তারা মারা পড়বে, না হয় স্থান ছাড়তে বাধ্য হবে। বঙ্গোপসাগরে কম অক্সিজেন বা শূন্য-অক্সিজেন এলাকার বিষয়টি ধরা পড়ে ২০১৬ সালে। এলাকাটি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ৬শ থেকে ৭শ মাইল দূরে। এলাকা চিহ্নিত করা হলেও আসলে এর প্রকৃত অবস্থান কোথায়, পরিধিই বা কতটা তা এখনো নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এব্যাপারে যথাযথ অনুসন্ধান ও গবেষণার বিকল্প নেই। সব সাগর-মহাসাগরেই এ ধরনের অক্সিজেন-শূন্য এলাকা সৃষ্টি হতে পারে এবং হয়তো বা সব সাগর-মহাসাগরেই অক্সিজেনশূন্য এলাকা বিদ্যমান রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জ্বালানিতেল, পোড়াতেল, জ্বালানিবর্জ্য পরমাণুবর্জ্য এবং জমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক সারসহ কীটনাশকের ব্যবহারে সৃষ্ট নাইট্রাস অক্সসাইড সাগরতলকে অক্সিজেনশূন্য করে তুলছে। নাইট্রাস অক্সসাইড থেকে তৈরি হচ্ছে নাইট্রাইড যা সমুদ্রপরিবেশে এককোষি শৈবাল সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করছে এবং ওই শৈবাল ডি কম্পোড হওয়ার পর সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন খেয়ে শেষ করে ফেলছে। অক্সিজেনশূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা না গেলে সমুদ্রের পরিবেশ, মৎস্য, প্রাণী ও উদ্ভিদসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

আনোয়ারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রাশিদুল হক জানান, গভীর সমুদ্রে মাছ আছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদ-নদীতে মাছের সংখ্যা কমছে। সাগর একটু শান্ত হলে জালে মাছ পড়তে শুরু করবে।

এদিকে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে এবং ইলিশ রক্ষায় সফলতা থাকলেও বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমাণ কমছে এবং কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছের প্রজাতি অনেকটা নিঃশেষ হতে চলেছে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাসান আনোয়ারুল কবির বলেন, নির্বিচারে সামুদ্রিক মাছ শিকার এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর আরো মৎস্যশূন্য হয়ে যেতে পারে। তবে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে এবং ইলিশ রক্ষায় সফলতা থাকলেও বঙ্গোপসাগরে মাছের পরিমাণ কমছে এবং কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছের প্রজাতি অনেকটা নিঃশেষও হতে চলেছে। এসবের দিকে আমাদের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তাছাড়া এখন ভরা মৌসুমেও মাছ না পড়ার কারণ হচ্ছে সাগর যে দিকে উত্তাল থাকে সেদিক থেকে মাছ সরে শান্ত থাকা সাগরের অভিমুখে চলে যায়। যার কারণে এরকম প্রভাব পড়েছে। তবে সাগরে ইলিশ রয়েছে।