বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬

প্রশ্নবিদ্ধ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, হারাচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা

প্রকাশিতঃ রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০১৬, ১০:০৬ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : মৃত্যুর কারণ হিসেবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আসছে আত্মহত্যা। অথচ পুলিশের তদন্তে প্রমাণ মিলছে হত্যার। খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও ময়নাতদন্তে আসছে আত্মহত্যা। কয়েকটি ঘটনায় মৃতদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যেও দেখা গেছে বেশ কিছু অসংগতি। এতে মামলার বিচারকার্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিবেদনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে; হারাচ্ছে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ফরেনসিক বিভাগের অনিয়ম অনুসন্ধান শেষে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এতে সংস্থাটির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হুমায়ুন কবির সরকার লিখেন, ‘টাকা নিয়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন করার বিষয়টি দুই-একটি বিশেষ ক্ষেত্রে অনুমিত হলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগকারী ছাড়া বিষয়টা প্রমাণ করা কঠিন।’

এদিকে অভিযোগ আছে, চমেকের ফরেনসিক বিভাগ ঘিরে তৎপর রয়েছে একাধিক অপরাধী চক্র। এদের মাধ্যমে বা অন্য কোনো প্রভাবশালীর মাধ্যমে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা প্রভাবিত হচ্ছেন। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ময়নাতদন্তের সময় মর্গে থাকেন না। শিক্ষানবীশ চিকিৎসক ও ডোমদের দিয়ে ময়নাতদন্তের কাজ করানোর পর তিনি স্বাক্ষর করে দেন। ফলে যথাযথভাবে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় না। এতেই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার বঞ্চিত হওয়ার আশংকা করছেন।

কেস স্টাডি ১ : চলতি বছরের গত ২৬ আগস্ট দুপুরে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন মোজাফফর নগর এলাকায় নিজ ঘরে স্ত্রী খাদিজা আক্তারকে খুন করেন মোঃ আনারুল। পরদিন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মোহাম্মদ আবদুল কাদেরের কাছে এই আসামি খুনের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। কিন্তু এই ঘটনায় চমেক ফরেনসিক বিভাগের দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে খাদিজা ‘আত্মহত্যা’ করেছেন! তবে স্বীকারোক্তি ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলায় খুনি আনারুলের বিরুদ্ধে গত ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয় বলে জানান বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন।

কেস স্টাডি ২ : ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের মোল্লাপাড়ার একটি বাসায় বিচারক কাজী আবদুল হাসিব মোহাম্মদ সাঈদের মৃত্যু হয়। এরপর ময়নাতদন্তে উঠে আসে বিচারক হাসিব ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। এরপর দারোয়ান আবু সিদ্দিক ওরফে দিদারের জবানবন্দি ও রিমান্ডে নিয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে সিআইডি জানতে পারে বিচারক হাসিবকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঁচজনকে আসামি করে এই মামলায় অভিযোগপত্র দেন সিআইডির চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক কাজল কান্তি চৌধুরী।

কেস স্টাডি ৩ : ২০১৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে গৃহবধূ রীমার মৃত্যু হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর চমেক ফরেনসিক বিভাগের ডা. মোমিনুর রহমানের দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে, মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা। কিন্তু ২৬ সেপ্টেম্বর রীমাকে খুনের আদ্যোপান্ত স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় হত্যা মামলার প্রধান আসামি আবু বক্কর।

সর্বশেষ গত ৭ নভেম্বর দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার সিটি ভিউ আবাসিকের ‘ফরমান ভিলা’ ভবনের ৩য় তলার বাসিন্দা নুরুল হাসান মিল্টনের স্ত্রী জান্নাত আরা বিথীর (২০) মৃত্যু হয়। ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে হত্যার বিষয় নিশ্চিত হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রেকর্ড করেন পাঁচলাইশ থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ। পরে বিথীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেন চমেকের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। তবে এ রিপোর্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আসছেন বিথীর বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য জসিম উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিথীর বিয়ের সময় শ্বশুর বাড়ির দাবি অনুযায়ী সবকিছু পূরণ করি। তিন মাস আগে কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় বিথী। বিথীর স্বামী গত কোরবানী ঈদে চামড়ার ব্যবসার জন্য ১৫ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৭ লাখ টাকা চায়। মেয়ের সুখের দিকে চেয়ে আমি ৭ লাখ টাকা দিই। কিন্তু কোরবানী ঈদ চলে গেলেও আমাকে সে টাকা ফেরত দেয়নি। এই নিয়ে বিথীর সাথে প্রায়ই তার কথা কাটাকাটি হতো। বিথীকে নির্যাতন করতো শ্বশুর বাড়ির লোকেরা। এসব অত্যাচার মোবাইলে আমাকে জানাত বিথী। হঠাৎ ৭ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিথীর স্বামী ফোন করে জানায়, বিথী মারা গেছে। জিইসির মোড়ের মেট্রোপলিটন হাসপাতালে আসতে বলে ফোন কেটে দেয়।’

বিথীর বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি দীর্ঘসময় পুলিশে চাকরি করে অবসর নিয়েছি। আত্মহত্যাজনিত ও খুনের অসংখ্য লাশ দেখেছি। কিন্তু বিথীর লাশ দেখে বুঝেছি- এটা হত্যা। আমার কিছু প্রশ্ন আছে, ৪ মাস বয়সী শিশু সন্তান রেখে মা আত্মহত্যা করবে কেন? আত্মহত্যা করলে পুলিশকে খবর না দিয়ে, এলাকাবাসীর অনুপস্থিতিতে গোপনে লাশ নামাল কেন? বিথীর গলায় আঘাতের চিহ্ন ছিল না, জিহ্বাও বের হয়নি। মুখে ফেনা ছিল না, চোখ ছিল বন্ধ। এসব তো খুনের আলামত। হত্যা মামলা হলেও এখনো কেউ গ্রেফতার হয়নি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে সত্য বেরিয়ে আসবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই রাজু আহমেদ বলেন, ‘বিথী কেন আত্মহত্যা করবে- এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমরা অনুসন্ধান করছি। ঘটনার পর হাসপাতাল থেকে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা পালিয়ে গিয়েছিল বলে আমিও জেনেছি। কেন গিয়েছে সেটা তদন্তে পরিষ্কার হবে।’

এদিকে গত ২০ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় দুই নম্বর সড়কের বাজার এলাকার নিজ বাসায় রহস্যজনক মৃত্যু হয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক দিয়াজ ইরফানের। এরপর ২৩ নভেম্বর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে চমেকের ফরেনসিক বিভাগ জানায়, দিয়াজের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যাজনিত। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি চমেক অধ্যক্ষ সেলিম মো. জাহাঙ্গীর ‘প্রভাবিত’ করেছেন বলে অভিযোগ করে আসছে তার পরিবার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চমেক অধ্যক্ষ বলেন, ‘দিয়াজের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আমি পাল্টে দিয়েছি বলে যে অভিযোগটা এসেছে- সেটা একেবারে বানোয়াট।’

পুলিশি তদন্ত ও জবানবন্দিতে হত্যা, কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে আত্মহত্যা- এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে চমেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আবুল কাসেম এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা প্রভাবিত হয়েছেন, অতীতে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দায়ী চিকিৎসককে শাস্তিও পেতে হয়েছে। এক্ষেত্রে আদালত চাইলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আমলে না নিয়েও বিচারকার্য শুরু ও শেষ করতে পারেন। আদালত সব বিষয়ে অভিজ্ঞ।’