মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯

আমিরাত গিয়ে প্রতারিতদের দুঃখগাথা

প্রকাশিতঃ ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ | ১:৩১ অপরাহ্ন


শরীফুল রুকন : বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে গিয়েছেন চট্টগ্রামের চন্দনাইশের মোস্তাফিজুর রহমান। ট্যুরিস্ট ভিসা থেকে নির্মাণ শ্রমিকের কাজের ভিসা, বিমানের টিকিট করা-সবমিলে তার খরচ হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। স্বপ্ন ছিল আরব আমিরাত তার জীবনকে পাল্টে দেবে। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সুখের জীবন হবে তার। গত অক্টোবর মাসে আজমানে যান তিনি। বলা হয়েছিল, মাসে তাকে ১২০০ দিরহাম দেওয়া হবে। বাংলাদেশি টাকায় ৩৩ হাজার টাকা।

অথচ আজমানে কাজের ভিসা পাওয়ার পর দেখলেন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাকে কোন কাজই দিতে পারছে না। তাদের কাজই হচ্ছে, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে ভিসা-বাণিজ্য করা। সংঘবদ্ধ প্রতারকদের এই অপকৌশলের বিষয়টি ‘আমিরাতে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে যেভাবে বাংলাদেশিদের বিপদে ফেলছেন স্বদেশিরাই’ শিরোনামে প্রথম পর্বে তুলে ধরা হয়েছিল।

প্রতারিত মোস্তাফিজ মুঠোফোনে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বোনের গরু, স্ত্রীর স্বর্ণ বিক্রি ও ধারদেনা করে আজমানে এসেছি। কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমার ভিসার মেয়াদও শেষের দিকে। নতুন করে ভিসা করতে গেলে আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হবে। ধারদেনা করে বিদেশে এসেছি। দেশে ফিরতে চাইলেও বিমানভাড়া নেই।’

ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আরব আমিরাতে যাওয়া ইমরান হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অনেকে বলেন আমিরাতে শিক্ষিত এবং দক্ষ লোকের জন্য নাকি চাকরির অভাব হয় না। অনার্স করে এসেও ক্লিনারের চাকরি পর্যন্ত পাচ্ছি না। দেশ থেকে এসেছি আড়াই মাস হয়ে গেছে। কত জায়গায় যে প্রতারণার শিকার হলাম। হাউজ কিপিং, হোটেল বয়, রেস্টুরেন্ট, অফিস বয়, ক্লিনার, কনস্ট্রাকশন- সব জায়গায়ই চেষ্টা করে দেখা শেষ। প্রতারণা ছাড়া কিছুই পাইনি। আসলে এই মুহূর্তে কোম্পানিতে কোনো লোকই লাগবে না। কোনো পদ খালি নাই। বাস্তবতা কী জিনিস আমিরাতে না আসলে বুঝতাম না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ট্যুরিস্ট ভিসায় যারা আরব আমিরাতে আসতে চান, তাদেরকে বলবো- দালাল যত কিছুই বলুক, এখন আসার দরকার নাই। এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। নতুন চাকরি তো নেই-ই, উল্টো অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। ট্যুরিস্ট ভিসায় যারা না বুঝে এসে পড়েছেন, তাদের দেশে ফেরার বিমান টিকিট জোগাড় করতেও কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

ট্যুরিস্ট ভিসায় দুবাই যাওয়া রিফাত আলম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘গত দুই মাসে আমি ইতিমধ্যে ১৫টি ইন্টারভিউ দিয়েছি। পাঁচ শতাধিক কোম্পানিতে আবেদন করেছি। ১৫টি জায়গায় অনলাইন সিলেকশনে আসলেও মেইন ইন্টারভিউতে রিজেক্ট হয়েছি। এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ লোকজন নেয়। বাংলাদেশিদের কম নেয়। এখানে মানবেতর জীবনযাপন করলেও আমি এখনই হার মানছি না। চাকরি জোগাড় করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

১৫ বছর ধরে আবুধাবি প্রবাসী মোহাম্মদ শাহজাহান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এমনকি ফেসবুকেও চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে, মানবিকতা দেখিয়ে অনেকে প্রতারণা করছেন। প্রতারকরা অনেক সময় সহজ সরল মানুষের এমিরেটস আইডি কার্ড একদিনের চাকরি ও খাবার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে নেয়। এরপর আইডি কার্ড ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় বা বিভিন্ন সরকারি সেবা নেয়। এমিরেটস আইডি কার্ডধারী ব্যক্তি পরবর্তীতে ভিসা রিনিউ করতে গেলে বা দেশে ফিরতে গেলে এয়ারপোর্টে বিষয়টি জানতে পারেন। আইনত বকেয়া টাকাগুলো উক্ত এমিরেটস আইডি কার্ডধারীকেই পরিশোধ করতে হয়। অনেকেই এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে-বিদেশে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুবাইতে কত রকমের প্রতারণা চলছে তা বলে শেষ হবে না। অনেকে বলবে ৪-৫ ঘন্টার কাজ। আপনার আইডি লাগবে। ৮০ দিরহাম বা ১০০ দিরহাম দেবে। অনেক সময় দেখা যায়, ওই আইডি দিয়ে তারা বাংলাদেশে বড় অংকের টাকা পাঠিয়ে দেয়। আমিরাতের পুলিশ তখন তদন্তে নামে। এত টাকা কীভাবে আয় করেছে, জবাব দিতে না পারলে মানি লন্ডারিং মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয়।’

শারজায় একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করা জসিম উদ্দিন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আপনি যদি যেকোনো কাজে পারদর্শী হোন, তাহলে আপনার জন্য এই দেশে প্রচুর চাকরির সম্ভাবনা আছে। অথবা আপনি যদি ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী হোন তাহলেও এখানে অনেক চাকরির সুযোগ আছে। এসব ভাষা না জানলে কেউ এক গ্লাস পানি চাইলেও তো আপনি দিতে পারবেন না। বিদেশি ভাষা ও কোনো কাজ জানা না থাকলে এখানে এসে অসুবিধায় পড়তে হয়।’

১০ বছর ধরে দুবাই প্রবাসী খালেদ রুবেল একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আরব আমিরাতে বাংলাদেশের অনার্স-মাস্টার্স সনদের মূল্য নেই। ইংরেজি, উর্দু এবং হিন্দি ভাষা জানতে হবে। যারা কাজ জানেন এবং অভিজ্ঞতা আছে তারা চাকরি পাচ্ছেন। দালাল থেকে দূরে থাকতে হবে। চাকরির পোর্টাল অনুসন্ধান করে সেখানে সিভি ড্রপ করতে হবে। শিল্প এলাকায় গিয়ে সেখানের লোকদের সাথে কথা বলতে হবে। এটা করলেও চাকরি পাওয়া যেতে পারে। স্মার্ট এবং উদ্যমী হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষায় সাবলিল হতে হবে। তাহলে চাকরি হবে। অন্যথায় না।’

২০১০ সাল থেকে আরব আমিরাতের শারজায় আছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারার বাসিন্দা সিরাজ উদ্দিন। সেখানে গাড়ি মেরামত করার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। সিরাজ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘বিদেশে আসার জন্য অনেকে পাগল হয়ে যান। কিন্তু আসার আগে ভাবেন না যে, আমার কী যোগ্যতা আছে, আমি কী কাজে পারদর্শী। আবার কাউকে না আনলে আত্মীয়-স্বজনের মুখ ভার হয়ে থাকে। বলে অমুকের ছেলে বিদেশে গিয়ে সব করে ফেলছে আর আমার ছেলেকে নিতে কিছুই করে না। আসার পর যখন দেখে অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি নাই। তখন আবার বদনামি করে, অমুকের ছেলে দালালি করে আমার ছেলেকে বিদেশে নিয়েছে, সব টাকা মেরে দিয়েছে। বাড়িতে হামলা করে, যে আনে তার নামে মামলা করে। এমন ঘটনাও আছে, সবাই যে প্রতারণা করে তা নয়।’

শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণা বলছে, বিভিন্ন দেশে অভিবাসন-প্রত্যাশী বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশই বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রতারণার শিকার শতকরা ৫১ ভাগের মধ্যে শতকরা ১৯ ভাগ মানুষ টাকা দেওয়ার পরও বিদেশে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। বাকি শতকরা ৩২ ভাগ বিদেশে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতারণার শিকার বাংলাদেশিরা গড়ে ২ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৭ টাকা করে হারিয়েছেন।

রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অধিকাংশ অভিবাসী শ্রমিক তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। এ জন্য তারা বিদেশে গিয়ে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হন। আবার আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দূতাবাসের কর্মকর্তারাও সবসময় যে নিজ দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেন, তাও নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নির্লিপ্ততার কারণে প্রবাসীরা আরও ভোগান্তিতে পড়েন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতারকদের আইনের আওতায় আনতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একযোগে কাজ করতে হবে। কোথায়, কীভাবে অভিবাসীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তা খুঁজে সমাধান করতে হবে। দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে প্রতারকদের দৌরাত্ম্য কমবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘অভিবাসী আইনে অবৈধভাবে বিদেশে কর্মী প্রেরণ, অর্থ গ্রহণ, প্রতারণার ক্ষেত্রে অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ডের কথা বলা আছে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত একটা অবস্থান নিয়ে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। সেক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যারা আমিরাতে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই অদক্ষ। যার কারণে তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষতা বাড়লেই বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বাড়বে, প্রতারণাও কমে যাবে।’ বিদেশে প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্টদের ওই দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন মন্ত্রী।