
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় এবং তোতার দ্বীয়া দ্বীপে জঙ্গি ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযানের মুখে পাহাড় ছেড়ে জঙ্গিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় ও ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছেন। সাধারণ রোহিঙ্গাদেরও তারা উদ্বুদ্ধ করছেন জঙ্গি দলে যোগ দিতে। এ সুযোগে নিজেদের শক্তি বাড়াতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র দুটি গ্রুপ জঙ্গিদের ভাড়ায় দলে টানছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা হাসানের নেতৃত্বে অন্তত ১৭ জন জঙ্গি গত ১৫ দিন ধরে তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় একটি বাঙ্করে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান করছেন। জঙ্গিদের মধ্যে অন্তত ৪ জন লস্কর-ই-তৈয়বার সক্রিয় সদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের ভাড়ায় এনেছেন মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) আমির দাবি করা আতা উল্লাহ জুনুনি। আতা উল্লাহর ভাই শাহ আলীও পাকিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এসব জঙ্গিরা টেকনাফ সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ ক্যাবলের ভেতরে ব্যবহার করা তার সংগ্রহ করছেন।
অন্যদিকে আলোচিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সীমান্তের তোতার দ্বীয়া দ্বীপে আফগান ফেরত তালেবান যোদ্ধা ও রোহিঙ্গা মৌলানা আবু জ্বরের নেতৃত্বে আরেকটি জঙ্গি গ্রুপ অবস্থান করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা কাজ করছেন নবী হোসেনের পক্ষে। তোতার দ্বীয়ায় নবী গ্রুপের ইয়াবা প্যাকেটিংয়ের কাজ করে কয়েকশ’ রোহিঙ্গা। সম্প্রতি বিজিবিকে লক্ষ্য করে অন্তত ৩০০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে নবী বাহিনী।
মূলত আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নবী বাহিনী ও আরসার মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে গোলাগুলি ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। দুটি গ্রুপের কাছে গ্রেনেডসহ ভারি অস্ত্র রয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় গুলি বিনিময়ের পর জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার’ সামরিক শাখার প্রধান রণবীরসহ দুইজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এরপর থেকে ক্যাম্প ঘিরে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন সরকার।
রোহিঙ্গাদের ওপর নজর রাখা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য আছে, লস্কর-ই-তৈয়বা থেকে রোহিঙ্গা জঙ্গিদের ভাড়ায় এনে তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে আরসা। মূলত প্রতিপক্ষ নবী হোসেন বাহিনীকে ঘায়েল করা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে জঙ্গিদের ব্যবহার করা হতে পারে বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।
ঠিক একই কারণে নবী হোসেনও আফগান ফেরত রোহিঙ্গা তালেবান যোদ্ধাদের ভাড়ায় দলে টানছেন। দুই গ্রুপকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সরাসরি মদদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জঙ্গিরা যেকোনো সময় ক্যাম্প বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, দুইটি গ্রুপের সাথে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা রয়েছেন কিনা, থাকলেও তারা কারা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব তথ্য জানার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এ ছাড়াও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে একাধিকবার কারাভোগ করা রোহিঙ্গা মৌলানা সালাহুলও ফের তৎপর হয়ে উঠেছেন বলে তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজারের লিংক রোড এলাকায় তার মাদ্রাসায় বিদেশি কিছু লোকজন আনাগোনা করছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
শূন্য রেখায় জঙ্গি ঘাঁটির বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, আরসা ও আরএসও’র মধ্যে সংঘাতের বিষয়টি আমরা জানি। জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হচ্ছে। যদিও সীমান্তের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব বিজিবির।
এ বিষয়ে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দুই দেশের অংশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের কারণে শূন্যরেখা ও তোতার দ্বীপে বিজিবি চাইলেও অভিযান করতে পারে না। তবে, দেশের অভ্যন্তরে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, অভিযানের মুখে পাহাড় ছেড়ে জঙ্গিরা এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে ছুটছে। সাধারণ রোহিঙ্গাদেরকে উদ্বুদ্ধ করছে জঙ্গিদের সাথে যোগ দিতে। তেমনি দুইজন জঙ্গিকে আমরা সম্প্রতি ক্যাম্প এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছি।
লস্কর-ই-তৈয়বা ও আফগানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে শূন্যরেখায় জঙ্গি ঘাঁটির বিষয়ে তিনি বলেন, সঠিক তথ্য পেলে জঙ্গিরা যত শক্তিশালী হোক না কেন র্যাব জীবন দিয়ে হলেও জঙ্গি দমনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাংলাদেশের মাটিতে কোনো ধরনের জঙ্গি কার্যক্রম মেনে নেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন র্যাবের এ কর্মকর্তা।
ক্যাম্প ঘুরে যাওয়া আফগানরা কারা?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরে ১৩ মে এবং ৮ জুন কক্সবাজারে বেস্ট ওয়েস্টার্ন নামে একটি হোটেলে এমডি তারিক এবং নাবিল নামে রুম বুকিং করে সন্দেহভাজন কয়েকজন হোটেলে উঠেছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন আফগানি। সূত্র বলছে, ওই আফগানরা উখিয়ার জামতলি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছুদিন অবস্থান করেছেন। তারা তাবলীগ জামায়াত হিসেবে নিজদের পরিচয় দিতেন। দলটিতে অন্তত দুইজন আফগান যোদ্ধা ছিলেন। যারা বিভিন্ন সময় কয়েকটি দেশে যুদ্ধ করেছেন। তাদের সাথে ছিলেন আফগান ফেরত তালেবান যোদ্ধা ও রোহিঙ্গা মৌলানা আবু জ্বর।এখন এ আবু জ্বরের নেতৃত্বে তোতার দ্বীপে জঙ্গি ঘাঁটি গড়ে তোলার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেস্ট ওয়েস্টার্ন এর ম্যানেজার জাহিদ বলেন, তারা এনআইডি ও পাসপোর্ট দেখিয়ে হোটেলে উঠেছিলেন। কক্সবাজারে প্রতিদিন দেশি বিদেশি পর্যটকরা আসেন। এখানে কে আসছে, তার পরিচয় কি, এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়।’ যদিও পরবর্তীতে প্রতিবেদকের সাথে কথা বলে ‘বিপদে পড়েছেন’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যার নামে হোটেল বুকিং হয় সেই এমডি তারিক বলেন, দেখতে জঙ্গির মত মনে হলে তারা জঙ্গি ছিলেন না। দাঁড়ি টুপি রাখলে কি সবাই জঙ্গি হয়। পরবর্তীতে তারিক দাবি করেন, তার নামে রুম বুকিং দেখালেও সেখানে গিয়েছিলেন তার বন্ধুর ছোট ভাই নামিল। নাবিল তাকে জানিয়েছে সেখানে কোনো আফগানি ছিলেন না। পাঁচজন বন্ধু মিলে তারা কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়েছিলেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছেন গোয়েন্দারা।
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়া পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি মহাসচিব এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এমনিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন স্থানীয়রা। তারমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তে জঙ্গি আস্তানার বিষয়টি জেনে খুব আতংকে আছেন স্থানীয়রা। তিনি নিয়মিত সেনা অভিযান, রোহিঙ্গাদের দিনে একবার গণনা করা ও তাদের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
একাধিক রোহিঙ্গা নেতা জানান, একদিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পকে অশান্ত করে রাখছে। বিশেষ করে আরসা ও নবী হোসেন বাহিনীকে সরাসরি অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুই গ্রুপের মাধ্যমে ক্যাম্পকে অশান্ত করে রাখা এবং রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরা মিয়ানমার সরকারের প্রধান টার্গেট। এসব রোহিঙ্গাকে গুপ্তচর হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এ কারণে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা কোনো বাধা ছাড়াই মিয়ানমারে আসা-যাওয়া করতে পারে। একই তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, চার মাসে উখিয়ার একাধিক আশ্রয়শিবিরে আরসার সঙ্গে নবী হোসেন বাহিনীর একাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২৩ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ রোহিঙ্গা মাঝি এবং পাঁচজন আরসার সদস্য। বাকিরা সাধারণ রোহিঙ্গা। নিহত মাঝিরা নবী হোসেন গ্রুপের সমর্থক। এছাড়াও গেল চার মাসে শুধু উখিয়া থেকে ৩৭ জনকে অপহরণ করা হয়। এর মধ্যে ১১ জনকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকিরা মুক্তিপণ দিয়ে ফেরত আসেন। অপহরণের শিকার হওয়া ১৭ জন রোহিঙ্গা এবং ২০ জন স্থানীয়।
কক্সবাজার পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান বলেন, শূন্যরেখায় বা জেলার ভেতরে জঙ্গি তৎপরতার কোনো তথ্য জেলা পুলিশের কাছে নেই। এমন কোনো তথ্য পেলে সরকারের চলমান জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করবে পুলিশ।
ক্যাম্পে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে জানতে চাইলে ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারি খুনের ঘটনা থাকলেও জঙ্গি তৎপরতা বা তাদের কোনো ঘাঁটি নেই। ক্যাম্পের বাইরের যে জঙ্গি তৎপরতা, সে বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই।
বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গারা শুধু জঙ্গি তৎপরতা নয়, দেশের ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই দ্রুত সমাধান না হলে চরম মূল্য দিতে হবে জাতিকে।
ক্যাম্পে জঙ্গি তৎপর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। ক্যাম্প এলাকায় সাম্প্রতিক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান সেটিরই ইঙ্গিত বহন করে।