রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

অপরাধীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর

| প্রকাশিতঃ ২২ জুলাই ২০১৭ | ২:১৮ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম: পাহাড়ের বিভিন্ন খাঁজে কেটে কেটে গড়ে উঠেছে বসতি। কেউ পাহাড়ের পাদদেশে, কেউবা পাহাড়ের পেটে কেউবা পাহাড়ের চূড়ায় কেটে কেটে গড়েছে বসতি। এই চিত্র চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুরের। ছিন্নমূলের নামে সেখানে দখল করা হয়েছে সরকারি খাসজমি।

পাহাড়ে এই অবৈধ বসতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০০৪ সালে একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ২০১০ সালে স্থানীয় লাল বাদশা ও আলী আক্কাসের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ওই এলাকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সংবাদকর্মীরা। ২০১০ সালের ২৩ মে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস নিহত হন।

জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দাদের বেশির ভাগই চট্টগ্রামের বাইরের। ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, বরগুনা, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব লোক ছিন্নমূলের নামে সরকারি এই খাসজমি দখল করেছেন। এখানকার পাহাড়গুলো অপরাধীদের অভয়ারন্য বলেও অভিযোগ আছে। অপরাধ জগতের সাথে যুক্ত অনেকেই জঙ্গল সলিমপুরে আসা-যাওয়া করেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। বিভিন্ন সময় সেখান থেকে গ্রেফতার হয়েছে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, উদ্ধার হয়েছে অস্ত্রশস্ত্র।

এর আগে গত এক দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলাকালে এবং ছিন্নমূলের আমন্ত্রণ ছাড়া সংবাদকর্মীরা ওই এলাকায় ঢুকতে পারেননি। শুক্রবার ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের ১ নম্বর সলিমপুর ওয়ার্ডের বিবিরহাট এলাকায় পাহাড় ধসে তিন শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হলে বহুদিন পর ওই এলাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের পা পড়ে।

জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ে আড়াই বছর আগে আসেন নোয়াখালীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। পাহাড় কেটে তিন কক্ষের ঘর নির্মাণ করে বসত গড়ে তোলেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ধসের সময় সেই পাহাড়ের একটি অংশ রফিকুলের ঘরে পড়ে। এতে তার স্ত্রী-ছেলে, বোন ও বোনের দুই মেয়ে নিহত হন। তবে রফিকুল ইসলাম, ভাই গিয়াস উদ্দিন ও দুই মেয়ে জান্নাত ও সালমা পাহাড়ধসের পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বের হয়ে যেতে সক্ষম হন। বেঁচে যাওয়া চারজনই সুস্থ রয়েছেন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, লটকন শাহ মাজার এলাকার তিন নম্বর সমাজের একটি পাহাড়ের মাঝামাঝিতে পেটের অংশে টিনের ঘর করে থাকতেন রফিকুল ইসলাম। পাহাড়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে খাড়া ঢালে টিনের ঘর বানানো হয়েছিল। পাহাড় ধসে ঢাল দিয়ে নামা মাটি সরাসরি ঘরের ওপর পড়েছে। ওই ঘরে উঠতে আরেক পাহাড় থেকে অন্তত ৪০ ফুট উঁচুতে উঠতে হয়। বালুর বস্তা দিয়ে ঘরে ওঠার জন্য প্রায় ৪০ ফুট সিঁড়ি করেছিলেন। ওই ঘরে বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকলেও আশপাশের বিভিন্ন ঘরে বিদ্যুৎ-সংযোগ রয়েছে।

ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, আমরা ছিন্নমূল মানুষ। সরকারি এসব পাহাড়ে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার আছে। এখানে রাস্তাঘাট-স্কুল সব আমরা করেছি। এখানে ১২০টি পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আছে। রফিকের ঘরটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই তাকে সরে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু সে যায়নি।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো একসময় ছিল জীববৈচিত্র্যের বিপুল আধার। কিন্তু গত কয়েক দশকে পাহাড়ের পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। তাতে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে পাহাড়। যদিওবা পাহাড় ধস একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তার ওপর এ দেশের পাহাড়গুলো পাললিক শিলা দিয়ে গঠিত। তবে মানুষের অপরিণামদর্শী ও অজ্ঞতাপ্রসূত কর্মকান্ড এখানে পাহাড় ধস ত্বরান্বিত করেছে। একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয়কর দুর্যোগে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে কীভাবে বসতি গড়ে উঠেছে, তা সবই আপনারা জানেন। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসও বন্ধ করা সম্ভব হবে না। পাহাড়ে উচ্ছেদ করতে বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।

অবৈধ বসতি স্থাপনে পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, আক্কাসের (আলী আক্কাস) ইতিহাস আপনারা জানেন। আক্কাসের পর্ব শেষ হয়েছে, এখন আরেক পর্ব এসেছে- ইয়াসিন। লোকে বলে- সে কোথায় থাকে, তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে একেক সময় একেক জন হাজির হবে। নেপথ্যে থেকে এগুলো করাবে। আমাদের উচিৎ তা করতে না দেওয়া।