রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

টেকনাফ স্থলবন্দর : ডলার বিক্রি ‘ইচ্ছেমতো’, বিপাকে ব্যবসায়ীরা

| প্রকাশিতঃ ২৯ মার্চ ২০২৩ | ১:০১ অপরাহ্ন


জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার : ডলার সংকটের কথা বলে সরকারি ব্যাংকগুলো লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) দেয়া বন্ধ করেছে অনেক আগেই। কিন্তু ব্যবসা বন্ধ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীরা। মিয়ানমার থেকে আমদানি পণ্য খালাস করতে বেসরকারি ব্যাংকের দারস্থ হতে হচ্ছে তাদের।

বেসরকারি ব্যাংক হতে ফ্র্যাঞ্চাইজ ডিসক্লোজার ডকুমেন্টের (এফডিডি) মাধ্যমে পণ্যের দাম পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারের বিপরীতে সরকারি ঘোষণার দামের অতিরিক্ত টাকা গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে পণ্যের দামের কাটতি বাড়ায় দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে আমদানি পণ্য। ফলে মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত আদা, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, শুঁটকি, আচারসহ সব কিছুরই দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মতে, বেসরকারি ব্যাংকে এফডিডি খুলতে গেলে ডলারের দাম ইচ্ছে মত নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া দামের অতিরিক্ত ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি না পেলে এফডিডি দেয়া হয় না। অর্ডারে আসা মালামাল ছাড়াতে গেলে বাড়তি দামই পরিশোধ করতে হচ্ছে ডলারের।

সোমবার ডলারের দাম ১০৬ টাকা ৯০ পয়সা থাকলেও টেকনাফে চলতি সময়ে এফডিডি দেয়া একমাত্র ব্যাংক এবি ব্যাংক সোমবার ডলার প্রতি দাম রেখেছে ১১৫ টাকা ২৩ পয়সা। তবে, ১০৬ টাকা ৯০ পয়সার বাড়তি আদায় করা টাকার কোনো রশিদও দেয়া হয় না। আবার এসব এফডিডি পেতেও আওয়ামী লীগের জেলার শীর্ষ নেতাসহ বিভিন্ন দফতরের কর্তা ব্যক্তি, শীর্ষ জনপ্রতিনিধির তদবির লাগে।

ডলারের দাম অতিরিক্ত বেশি হওয়ায় নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পবিত্র রমজানে মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত সব ধরনের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারাও।

টেকনাফ বন্দরের শীর্ষ ব্যবসায়ী মেসার্স ফারুক টেডার্সের মালিক ওমর ফারুক বলেন, সোমবার একটি এলসিতে ২৯ হাজার ৯৪০ ডলারের বিপরীতে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এতে ডলারের দাম পড়েছে ১১৫ টাকা ২৩ পয়সা। কিন্তু আমাকে ১০৬ টাকা ৯০ পয়সার রশিদ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কাঁচামাল নষ্ট হওয়ার ভয়ে যা চেয়েছে সেই দরেই এফডিডি নিতে বাধ্য হয়েছি।

তিনি আরও বলেন, ডলার সংকট দেখিয়ে অনেক আগেই সোনালী ব্যাংক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর হতেই মূলত এ জটিলতা সূষ্টি হয়েছে।

টেকনাফের আরেক ব্যবসায়ী আবু আহমদসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা বলেন, এখন একমাত্র এবি ব্যাংকই এফডিডি দিচ্ছে। চাহিদার পরিবর্তে যোগান কম হওয়ায় সরকার নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত মূল্যে ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

টেকনাফ বন্দরের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিদিন কম করে হলেও ১৭টি এফডিডি দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া দর থেকে ৭ থেকে ৯ টাকা বেশি নিয়ে প্রতিদিন ৩৫-৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এবি ব্যাংক। এতে করে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।

শুধু তাই নয়, নিয়মিত এফডিডি নেতাদের তদবির ছাড়াও হয় না। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি দলের বড় নেতা বা এমপিদের তদবিরে এফডিডির সিরিয়াল আগে-পরে মিলে। এতে এসব তদবিরকারকদেরও ‘নজরানা’ দিতে হয়। সবকিছু তুলে আনতে ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। তাদের মতে, এবি ব্যাংক টেকনাফ শাখা এখন দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোন না কোন ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা এফডিডির তদবীর নিয়ে যাচ্ছেন। আর এ সুযোগে অনৈতিকভাবে ডলারে দর বেশি রাখছে এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নেতা বা বড় আমলার তদবির রক্ষা করতে গিয়ে সিরিয়ালে থাকা অনেক ব্যবসায়ী নিয়ম মতো এফডিডি পান না। তাদের মতে, এতে সময়মত এফডিডি না পেরে কাঁচামাল নষ্টের ঘটনাও ঘটছে।

সালাম এন্ড ব্রাদার্স’র স্বত্বাধিকারী আবদুস সালাম বলেন, আমি গত বছরের ডিসেম্বরে এফডিডির সিরিয়াল পেয়েছিলাম। এরপর থেকে ডলার সংকটের কারণ দেখিয়ে আমাকে এখন পর্যন্ত আর সুযোগ দেয়া হয়নি। তবে সরকার দলীয় নেতা দিয়ে যারা তদবির করছে তারা নিয়মিত এফডিডির সুযোগ পাচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় ডলার প্রতি বাজার থেকে ৭ থেকে ৯ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে।

ডলারের দাম বাড়তি নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবি ব্যাংক টেকনাফ ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মনজুর আলম চৌধুরী। তবে, তিনি এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে কোনো কিছু জানার থাকলে এবি ব্যাংকের হেড অফিসের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।