রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

ভিসির বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রক্টরকে ‘শিবির’ তকমা

| প্রকাশিতঃ ৮ এপ্রিল ২০২৩ | ৮:৩৪ অপরাহ্ন


একুশে প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদার ছাত্রজীবনে শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ফেসবুকে লেখালেখি করে আসছেন ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতা; যদিও এখন পর্যন্ত ওই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি তারা।

আওয়ামী পরিবারের সন্তান নুরুল আজিম সিকদার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের সদস্য। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৯৫-১৯৯৬ সেশনের শিক্ষার্থী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদান করেন নুরুল আজিম সিকদার।

রাঙ্গুনিয়ায় আওয়ামী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদারের পরিবার। তার প্রয়াত চাচা সাদেকুন্নুর সিকদার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই দফা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯১ সালে রাঙ্গুনিয়া আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। যদিও পরবর্তীতে দলীয় সিদ্ধান্তে ৮ দলীয় জোটের প্রার্থীকে সমর্থন করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার দুদুবারের নির্বাচিত মেয়র শাহজাহান সিকদার প্রক্টর নুরুল আজিম শিকদারের চাচা। তার আরেক চাচা শামসুদ্দোহা সিকদার আরজু রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ও উত্তর জেলা যুবলীগের ১নং সহ সভাপতি।

তার ভাই আল হেলাল পুকুল সিকদার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি, প্রয়াত ভাই সাজিবুল ইসলাম সিকদার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদারের ভাই আল মামুন পিনু সিকদার রাঙ্গুনিয়া পৌরসভা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, আরেক ভাই আল জায়েদ সিকদার সম্রাট চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি।

প্রক্টর নুরুল আজিমের আরেক চাচা বিপ্লব উদ্দিন সিকদার রাঙ্গুনিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার আরেকজন চাচা জাফর ছালেক সিকদার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক।

এমন একটি পরিবারের সন্তান নুরুল আজিম সিকদারকে ‘শিবির’ তকমা দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১২ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি প্রশাসনিক পদ থেকে প্রক্টর অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়াসহ ১৬ শিক্ষক একযোগে পদত্যাগ করেন। এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই উপাচার্য অবশ্য নতুন প্রক্টর ও দু’জন সহকারী প্রক্টর নিয়োগ দেন। ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক নুরুল আজিম সিকদারকে প্রক্টর ও একই বিভাগের প্রভাষক সৌরভ সাহা জয় ও ওশানোগ্রাফি বিভাগের প্রভাষক রুকন উদ্দীনকে সহকারী প্রক্টর নিয়োগ দেয়া হয়।

প্রক্টর পদে নুরুল আজিম সিকদার যোগদানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর জিয়াউল ইসলাম সজল ও মোহাম্মদ ইয়াকুব পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করা ওই দুই সহকারী প্রক্টর সদ্য সাবেক প্রক্টর রবিউল ইসলাম ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে।

এসব ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে, প্রক্টরের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহবুব এলাহী তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে নুরুল আজিম সিকদারকে ‘শিবির কর্মী’ আখ্যা দিয়ে পোস্ট দেন। মাহবুব এলাহীর ওই পোস্ট ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজনকে ফেসবুকে শেয়ার করতেও দেখা যায়। এরপর সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে কয়েকজনের নাম দিয়ে একটি বিবৃতির ছবিও পোস্ট দেন তিনি। তবে যাদের পক্ষ থেকে এই পোস্ট দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকেই এই বিবৃতিকে সমর্থন করছেন না।

বিবৃতিতে নাম থাকা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উত্তর জেলা যুবলীগের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও পাঠাগার সম্পাদক জয়নাল আবেদিন ওই বিবৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একে তিনি ‘ফায়দা লোটার বিবৃতি’ আখ্যা দেন। এরপর সংশোধিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি ফেসবুকে প্রকাশ করেন মাহবুব এলাহী। এতে জয়নাল আবেদিনসহ কয়েকজনের নাম বাদ দেওয়া হয়।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘নুরুল আজিম সিকদার আমার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। তার পুরো পরিবার রাঙ্গুনিয়ায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিভিন্ন পদে থেকে তারা সংগঠনকে এগিয়ে নিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা যারা তাকে নেতিবাচক কথা বলছে তারা তার পরিবারের বিষয়ে হয়তো জানেন না।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল টিপু বলেন, ‘প্রক্টরের দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় ভাইদের কেউ কেউ ওনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলছেন, তার সপক্ষে যদি প্রমাণ পাই তাহলে আমরাও তাদের সমর্থন করবো। প্রমাণ ছাড়া তো কার বিরুদ্ধে বলা যায় না।’

জানতে চাইলে প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদার বলেন, ‘আমার পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমার পরিবারের অন্তত ১১ জন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পদধারী। ছাত্রজীবনেও আমি এলাকায় ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে কোনো পদে ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট, অমূলক। আমার মানহানি করতেই এগুলো করা হচ্ছে। আমি দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের সঙ্গে প্রায় একবছর ধরে মতবিরোধের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছে শিক্ষকদের প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। মূলত ভিসি অধ্যাপক শিরীণ আখতারের বিরোধিতা করতে গিয়ে আওয়ামী পরিবারের সন্তান নতুন প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদারকে ‘শিবির’ তকমা দেওয়া হচ্ছে। আর নেপথ্যে থেকে এই প্রপাগাণ্ডা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালাচ্ছেন বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা শিক্ষকদের কেউ কেউ। তাদের সাথে আবার ফেসবুকে প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠতা আছে।

এই সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের ফেসবুক আইডিতে গিয়ে দেখা গেছে, তারা ভিসি শিরীণ ও নতুন প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদার- দুইজনের নামেই সমানে অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন। নতুন প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদারকে তারা হঠাৎ করে ‘শিবির’ তকমা দিলেও তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই নিয়োগ পেয়েছেন, এছাড়া তিনি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের সদস্য।

পদত্যাগ করা একজন শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২১ সালে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতিসহ কয়েকটি পদের প্রার্থী নিয়ে আওয়ামীপন্থী হলুদ দল বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষে ছিলেন হলুদ দলের নেতৃত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ্য শিক্ষকরা, অন্যদিকে উপাচার্যের নেতৃত্বে প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে থাকা শিক্ষকরা। উপাচার্যের সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে সভাপতিসহ দু’জন বিজয়ী হন।

তখন প্রশাসনিক পদে থাকা উপাচার্যের পক্ষের শিক্ষকরা তাদের সমর্থিত প্রার্থীকে জেতাতে ১৭ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে শিক্ষকদের অনর্জিত ইনক্রিমেন্ট পরিশোধ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেয়া, শিক্ষকদের আবেদনের তারিখ থেকে পদোন্নতি কার্যকর হওয়া ও শিক্ষকদের আবাসন সুবিধা নিরসন অন্যতম। পদত্যাগী শিক্ষকদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর এসব দাবি বাস্তবায়নের জন্য তারা উপাচার্যের সঙ্গে দফায় দফায় দেনদরবার করেও ব্যর্থ হন। দাবি মানার আশ্বাস দিয়েও পরে তিনি সরে যান।

সর্বশেষ শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী হলুদ দল তিনভাগে ভাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে একটি উপাচার্যের সমর্থিত, আরেকটি প্রশাসনিক পদে থাকা শিক্ষকদের সমর্থিত এবং একটি বিদ্রোহীদের প্যানেল। সেই নির্বাচনে উপাচার্য বিরোধী বিদ্রোহীরা অধিকাংশ পদে জয়ী হন। এরপর গত ৬ মার্চ সিন্ডিকেটের চারটি পদে নির্বাচন হয়। সেখানে উপাচার্যের সমর্থিত শুধু একজন জয়ী হন। শিক্ষক সমিতির নির্বাচন ও সিন্ডিকেট নির্বাচনে জয়ী উপাচার্যবিরোধী কেউ রীতি ভেঙে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাননি। এতে উপাচার্য আরও ক্ষুব্ধ হন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রক্টর হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে ভিসি শিরীণ আখতারের কাজে নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন নুরুল আজিম সিকদার। অন্যদিকে ভিসিকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করে আসছিলেন প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করা শিক্ষকদের কেউ কেউ।

এরই মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আসহাব উদ্দীন খালেদ ভিসির মেয়েকে আড়াই লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছেন দাবি করে সম্প্রতি বক্তব্য দেন। তার অভিযোগ, উপাচার্যের মেয়ে সেই টাকা ফেরত না দিয়ে অস্বীকার করছেন। তিনি উপাচার্য এবং তার মেয়ের কাছে টাকা ফেরত চেয়ে চিঠি দেন। এর আগে তিনি শিক্ষক সমিতি বরাবর চিঠি দিয়ে একই অভিযোগ করেন।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আসহাব উদ্দীনের এই অভিযোগটি সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে হাটহাজারী থানায় জিডি করেন নতুন প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদার। এতে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন ভিসি-বিরোধী শিক্ষকরা।

তবে সদ্য পদত্যাগী প্রক্টর অধ্যাপক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের দাবিদাওয়া নিয়ে ম্যাডামের কাছে কয়েকবার গিয়েছিলাম। এ সংক্রান্ত সকল তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে আছে। তিনি বারবার দাবি মানার আশ্বাস দিয়েছেন। পরে আবার সেই আশ্বাস থেকে সরে গেছেন। কিন্তু শিক্ষকরা আমাদের ভুল বুঝতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত যখন দেখলাম, অযথা কোনো দোষ না করেই আমাদের অবস্থান বিতর্কিত হচ্ছে, আমরা কয়েকজন সরে যাবার সিদ্ধান্ত নিই।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত তিনমাস ধরে আঁচ করতে পারছিলাম তারা আমার বিরুদ্ধে কিছু একটা করছে। রবিউল একমাস আগে অধ্যাপক হয়েছে। তার স্ত্রী জাপানে থাকে। হুট করে সে জাপানে চলে যায়। প্রক্টরিয়াল অফিস একটা সেনসিটিভ অফিস। তার জন্য কাজে ব্যাঘাত হয়। তখন আমি তাকে বলেছি যে, তোমরা আমাকে অনেকদিন সার্ভ করেছ, এখন যেহেতু সময় দিতে পারছ না, ছেড়ে দাও।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের কোনো দাবিদাওয়া নিয়ে তারা কখনোই আমার কাছে আসেনি। শুধুমাত্র নিয়োগের তদবির আর ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের তদবির নিয়ে আমার কাছে আসতেন। ইনক্রিমেন্ট, আবাসন নিয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে সব বোগাস। ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে না পেরে তারা আমাকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছে। আমি দুর্নীতি করিনি, কাউকে দুর্নীতি করার সুযোগও দিইনি। তাদের পদত্যাগে আমি খুব খুশি হয়েছি। এরপরও আমি তাদের সন্তানের মতোই স্নেহ করে যাব।’