
চট্টগ্রাম : দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে হঠাৎ পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বেঁধে দেয়ার খবর প্রচার হওয়ার পরপরই দেশের পাইকারি বাজারে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে অতি মুনাফাখোর পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
দেশের বাজারে এখনো বাড়তি দামের পেঁয়াজ ঢোকেনি। অথচ এরই মধ্যে আমদানি ও দেশি- দুধরনের পেঁয়াজের দাম রাতারাতি বেড়ে গেছে। খুচরায় প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম এখন ১৪০ টাকা। এমন আকাশচুম্বী দামে আবারও ভোক্তার গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে পেঁয়াজ।
খুচরা বাজার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত গত সোমবার দাম হঠাৎ এক লাফে কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ টাকা বেড়ে যায়। বাজারে এখন দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত। অথচ গত রবিবারও এ পেঁয়াজ ১১৫ টাকাতে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মাত্র এক রাতের ব্যবধানেই পণ্যটির দাম লাগামছাড়া বেড়েছে, যা বেশির ভাগ ভোক্তার নাগালের বাইরে।
কাজির দেউরি বাজারের ব্যবসায়ী মনির আহমদ বলেন, ‘রোববার ভারতে দাম বেড়েছে- এমন খবরের কারণে পাইকারদের কাছ থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় কিনছি।’ তিনি বলেন, ‘দাম বাড়ার খবরে আমদানি করা পেঁয়াজও পাওয়া যাচ্ছে না। দাম বাড়ানোর জন্য মজুত করে রেখেছেন পাইকাররা।’
খাতুনগঞ্জের পাইকার লোকমান হোসেন বলেন, ‘পূজার ছুটির কারণে বেশ কয়েকদিন বন্দর বন্ধ ছিল। তখন থেকেই দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি শুরু হয়। এরমধ্যে আমদানি মূল্য বাড়ানোর খবরে বাজার একদম অস্থির হয়ে গেছে। বাজারে পেঁয়াজের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।’
যদিও ভারতে নতুন দাম ঘোষণার পর সেই পেঁয়াজ এখনও দেশে এসে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ আগের দামে আমদানি করা পেঁয়াজই এখন বাজারে, তবুও দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে।
যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এভাবে অতিরিক্ত দাম বাড়িয়েছেন কতিপয় ব্যবসায়ী। তারা এই কারসাজি করে ভোক্তার পকেট থেকে স্বল্প সময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাড়তি দামে আমদানি করা পেঁয়াজ আসতে আরও তিন থেকে চারদিন সময় লাগবে। এরমধ্যে বাজারে যত পেঁয়াজ কেনাবেচা হবে, তা আগের দামেই কেনা।
জানা গেছে, ভারতে প্রতি টন পেঁয়াজের দাম ৮০০ ডলার হলে কেজিপ্রতি এর রপ্তানিমূল্য পড়বে ৬৭ রুপি। আগে ভারতের রপ্তানিকারকরা অনির্ধারিত মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারলেও নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশটির ব্যবসায়ীদের সরকার নির্ধারিত দামেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে।
এর আগে পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তখন থেকেই বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।
বজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ ছাড়া অন্য কোনো দেশের পেঁয়াজ নেই। ভারতে বন্যার কারণে পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তাই তাদের দেশেও পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ভারত নিজেদের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রতি টন পেঁয়াজ রপ্তানিতে ন্যূনতম ৮০০ ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর প্রভাবে মূল্য বাড়ছে।
ভোক্তারা বলছেন, ভারত মাত্র রপ্তানিমূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। পাইকারি কিংবা খুচরা বাজারে এসব বাড়তি মূল্যের এক কেজি পেঁয়াজও আসেনি। অথচ ভোক্তাদের কাছ থেকে দুদিনেই কেজিতে ৪০ টাকা বাড়তি নিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এটা অরাজকতা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের এক আড়তদার বলেন, ‘বর্তমানে খাতুনগঞ্জে যেসব পেঁয়াজ রয়েছে সেগুলো বাজার পর্যন্ত আসতে খরচ পড়েছে কেজিপ্রতি ৭০ টাকা। কিন্তু ভারত রপ্তানিমূল্য বেঁধে দেয়ার ঘোষণার পর থেকে প্রতি কেজিতে অন্তত ৩৫ টাকা মুনাফা করছেন আমদানিকারকরা।’
এদিকে পেঁয়াজের এমন আকশচুম্বী দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। অটোরিকশা চালক মো. কাশেম মোল্লা বলেন, ‘এই আগুনের দামে কজন মানুষ পেঁয়াজ কিনতে পারেন। দাম বাড়তেই পারে। তাই বলে এক রাতে ২০-২৫ টাকা!’
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকার দাম বেঁধে দিল ৬৫ টাকা। ভাবলাম এবার যদি দাম কমে। কিন্তু কই! সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও উঠে এসেছে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার চিত্র। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, গতকাল বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে যা ৯০ টাকাতে কেনা গেছে এবং গত বছর এ সময় দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
একইভাবে দাম বেড়ে গতকাল আমদানিকৃত পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১২০ টাকা বিক্রি হয়। গত সপ্তাহে ৭০ টাকা এবং বছর আগে এমন সময় দাম ছিল ৪৫ টাকা। সংস্থাটি বলছে, মাসের ব্যবধানে পণ্যটির পেছনে ৫০ শতাংশ এবং এক বছরে ১৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ খরচ বেড়েছে।
পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, দেশি পেঁয়াজ ফুরিয়ে আসছে। তাই আমদানিকৃত, বিশেষ করে ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু পূজার ছুটির কারণে বেশ কিছুদিন আমদানি বন্ধ ও ভারতীয় পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, নিজ দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ ও দাম ঠিক রাখতে গত ২৯ অক্টোবর প্রতি টন পেঁয়াজের রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য ৮০০ ডলার বেঁধে দেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, যা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।
যদিও এ বর্ধিত দামের পেঁয়াজ এখনো দেশে আসেনি। তারপরও রাতারাতি দাম কীভাবে বাড়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পাইকারি বিক্রেতা জানান, মূলত রপ্তানিমূল্য বাড়ার খবরেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে সরবরাহকারীরা। অতীতেও এমনটা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালপুর ইসলামপুর উপজেলার আড়তগুলোতেও দিনের ব্যবধানে দাম বেড়ে গেছে। গত সোমবার সকালের দামের চেয়ে বিকালের দামে ৫০ টাকা পর্যন্ত ফারাক দেখা গেছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেয়, এরপর তা গোটা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগেও দেখা গেছে, বাজারে দেশি ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানিকৃত পেঁয়াজ থাকার পরও ভারত রপ্তানিমূল্য বাড়ালে দেশের বাজারে চড়ামূল্য দিতে হয় ভোক্তাদের। ২০১৯ সালেও ভারত রপ্তানিমূল্য ৮৫০ টাকা বেঁধে দিলে দাম বেড়ে ইতিহাস গড়ে পেঁয়াজ। সেসময় বাজার সামাল দিতে না পেরে বাধ্য হয়ে দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপকে পেঁয়াজ আমদানি করতে অনুরোধ করে সরকার। একপর্যায়ে বিমানে করেও আমদানি হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার ব্যবসায়ীদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। তারা একেক সময় একেক অজুহাতে দাম বৃদ্ধি করেন। এখন বলছেন, ভারত রপ্তানিমূল্য বাড়িয়েছে তাই দাম বেড়েছে। বাজারে বর্তমানে যেসব পেঁয়াজ আছে, সেগুলো তো দুই সপ্তাহ আগে আমদানি করা। প্রশাসনের উচিত পেঁয়াজের ক্রয় ও বিক্রয়মূল্য যাচাই করে অভিযান পরিচালনা করা।’