শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

জেনেটিকেলি মডিফাইড বিটি বেগুনের বীজ বিতরণ করবে কৃষি মন্ত্রণলয়

| প্রকাশিতঃ ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭:৩৫ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : বন্যা ও অতিবর্ষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে, অন্যান্য আরো ৮ জাতের শস্যের বীজের সাথে জেনেটিকালি মডিফাইড বিটি বেগুনের বীজ বিতরণ করতে যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রনালয়।

এ প্রেক্ষিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেলে চট্টগ্রামে স্টাডিসার্কেল সূত্রপাঠ এবং চাষবাস যৌথভাবে আয়োজন করে “প্রাণবৈচিত্র্য না জিএমও বাণিজ্য- প্রেক্ষিত: বন্যা পরবর্তী বীজ বিতরণে বিটি বেগুন” শীর্ষক আলোচনা সভা।

নগরীর মেহেদিবাগে চিটাগাং ইনস্টিটিউট অব ভিজ্যুয়াল আর্ট (সিআইভিএ) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনা সভায় বক্তারা বিটি বেগুন চাষের বিভিন্ন দিক এবং এর বিকল্প তুলে ধরে বেগুনসহ সকল শস্যের দেশীয় প্রজাতির বীজ বিতরণের আহবান জানান।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলোজির রেজিস্ট্রার এবং বায়োডারসিটি রিসার্চ গ্রুপ অফ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান প্রফেসর বদরুল আমিন ভূইয়া।

এতে আলোচনায় অংশ নেন নিরাপদ কৃষি আন্দোলনের সংগঠন চাষবাসের কর্ণধার ইসলাম মোহাম্মদ ও ‘প্রকৃতি’ পত্রিকার সম্পাদক মুশফিক হোসেন। সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন সূত্রপাঠের প্রধান সংগঠক দাউদুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর বদরুল আমিন ভূইয়া জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিটি ট্রান্সজেনিক প্লান্টের একটি সহজবোধ্য ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। একই সাথে তিনি বিদেশী প্রজেক্টের অধীনে দেশীয় শস্যের জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংং এর বদলে দেশের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় দায়বদ্ধ থেকে এসব বিষয়ে বাংলাদেশের স্বনির্ভর হয়ে উঠার উপর গুরত্বারোপ করেন।

সূত্রপাঠের প্রধান সংগঠক দাউদুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রোগ বিস্তারে জিএম শস্যের ভূমিকা তুলে ধরে বিটি বেগুন এবং জিএম শস্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরেন।

তিনি বিটি ট্রান্সজেনিক টেকনোলজির প্যাটেন্টের স্বত্বাধীকারী মার্কিন কর্পোরেশন মনোস্যান্টোর পরিচিতি এবং সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশে সিজেন্টার কার্যক্রম ব্যাখ্যা করেন। সারা বিশ্বের কৃষিকে কিভাবে কয়েকটি মাত্র কর্পোরেশন কুক্ষিগত করে গোটা প্রকৃতির প্রাণকে পুঁজি করে বাণিজ্য করছে, যার শিকার মানুষ নিজেই।

কৃষি সংগঠক ইসলাম মোহাম্মদ বীজের মূল্যের সাথে কৃষকের এবং ভোক্তার জীবনের সম্পর্ক তুলে ধরেন। কিভাবে বিদেশী কোম্পানীর প্যাটেন্ট করা বীজ উচ্চমূল্যে কিনে চাষ করে আমরা দেশীয় বীজের স্বত্ব হারাবো এবং যার ফলে খুব সস্তা শস্যও চলে যাবে নাগালের বাইরে। ফলে এভাবে বিটি বেগুনের মতো বিদেশী প্যাটেন্টেড জেনেটিকালি মডিফায়েড বীজ কিনে যদি আমরা চাষবাস করি তবে যথেষ্টের অধিক ফসল আমাদের মাঠে থাকলেও আমরা ক্রয় ক্ষমতা হারানোর সম্মুখীন হতে পারি কৃত্রিম দূর্ভিক্ষেরও।

বাংলাদেশে বিটি বেগুন বিতরণের প্রেক্ষিত এবং সম্ভাব্য ফলাফল তুলে ধরেন সুত্রপাঠ সদস্য শোয়েব করিম। তিনি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষি প্রণোদনার জি.ও এবং বাস্তবায়ন নীতিমালার বরাত দিয়ে বলেন, বন্যা ও অতিবর্ষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে যে সব শস্যের বীজ বিতরণ করা হবে তার মধ্যে কেবল বিটি বেগুনই বিতরণ করা হবে ৬৪ জেলায়, ৪০০১ বিঘা জমিতে চাষাবাদের জন্য ৪০০১ জন কৃষককে। ফলে পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী আবাদের সীমিত পরিসর ছেড়ে গোটা দেশে তৃণমূল কৃষিতে ছড়িয়ে পড়বে বিটি বেগুন। এবং দেশজুড়ে এর চাষাবাদ হলে বেগুনের দেশীয় জাতসমূহ বিপন্ন হবে।

তিনি ভারতে বিটি তুলা চাষের ফলে সর্বস্ব হারানো ঋণগ্রস্ত কৃষকদের আত্মহননের কথা স্মরণ করে বলেন, বিটি বেগুন চাষে প্রাণবৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের কৃষকেরাও বিপন্ন হবেন।

তাঁর মতে বাংলাদেশ জীবনিরাপত্তা বিধিমালা ২০১২ এর ৫ম ধারা অনুযায়ী জেনেটিকালি মডিফায়েড জীব বা দ্রব্যের মোড়কের গায়ে লেবেলিং এর বাধ্যবাধতা থাকলেও এক্ষেত্রে তারও লংঘন ঘটবে।

তাঁর মতে, আজকের এই বিটি বেগুন বিতরণ এবং জিএম শস্যের আগমন ১৯৯৮ সালের বীজনীতির মাধ্যমে বিদেশী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নির্ভর হয়ে পড়ারই ধারাবাহিকতা যার মাধ্যমে বীজ বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রের যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়া হয়েছিল।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে ‘প্রকৃতি’ পত্রিকার সম্পাদক মুশফিক হোসেন গুরত্বারোপ করেন প্রাণের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, কৃষকের সঙ্গে নিবিড় সংযোগের উপর। আর এই যোগাযোগের ফলেই আমরা এইসব সংকটের যে সত্যিকারের ভয়াবহতা তা টের পাবো।

আর এতেই তাঁর মতে একজন কৃষকের সংকট যে প্রতিটি মানুষের সংকট এবং একটি পোকার বিপন্নতায় যে আমরাও বিপদে পড়ি তা অনুভব করতে পারবো। তিনিও বীজ বিতরণে দেশী জাতের শস্যের বীজ বিতরণের আহ্বান জানান।