বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

রাঙ্গুনিয়ার সাংবাদিক ইমরানকে পরিকল্পিত হত্যা?

প্রকাশিতঃ ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ | ১১:১১ পূর্বাহ্ন


এম মোয়াজ্জেম হোসেন, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) : ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর। সেদিন মধ্যরাতে মরিয়মনগর থেকে মোটরসাইকেলে করে সরফভাটার নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন দৈনিক আমাদের সময়ের রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি ইমরান হোসেন (৩০)।

সেদিন রাত দেড়টার দিকে রোয়াজারহাট মধুবনের সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা অবৈধ জ্বালানি কাঠবোঝাই দ্রুতগামী একটি চাঁদের গাড়ি (জিপ) ইমরানের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়।

ইমরানের মাথায় হেলমেট থাকলেও গাড়িটি জোরে ধাক্কা দেওয়ায় তিনি মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে ঘাড়ে প্রচণ্ড আঘাত পান। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

ইমরানের মৃত্যুর ঘটনায় এমন ‘সরল ভাষ্য’ এখন পুলিশসহ অনেকের মুখে মুখে; যদিও ঘটনাটি তাদের কেউ নিজ চোখে দেখেননি।

সরফভাটা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড সিকদারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক ইমরানের মৃত্যুর ঘটনা অনুসন্ধানে নেমে জানা যায়, দুর্ঘটনার পর ইমরানের মোটরসাইকেলে বিন্দুমাত্র আঁচড় লাগেনি। অথচ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি চন্দন কুমার জানান, ইমরানের ঘাড় ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

স্বাভাবিকভাবে দুর্ঘটনার ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগলে মোটরসাইকেলেরও ক্ষতি হওয়ার কথা।

এছাড়া ঘটনাস্থলের অদূরে থাকা ভিডিও ফুটেজে ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তে শোনা গেছে বিকট শব্দ। তবে এখন পর্যন্ত আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় সেই রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

উল্টো ইতিমধ্যে ইমরানের পরিবারকে চাপ দেওয়া হয়েছে মামলা তুলে নিতে।

নিহত সাংবাদিক ইমরান হোসেনের বাবা রুস্তম আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘটনার এক মাস পার হলেও এখনও ঘাতক গাড়ির চালক, হেলপার ও গাড়ির মালিক- কেউই আইনের আওতায় আসেননি। অন্যদিকে স্থানীয় বিভিন্ন নেতা আমাদের বলছেন, এসব করে আর লাভ হবে না। তার চেয়ে গাড়ির মালিকের কাছ থেকে আমাকে কিছু টাকাপয়সা নিয়ে দিবে। আমি যেন মামলা তুলে নিই। কিন্তু আমি বলেছি, আমি টাকা চাই না। সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার ছেলের মৃত্যুরহস্য উদঘাটন হোক।’

এর আগে ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণের খবর প্রকাশ করায় ইমরানকে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। হুমকির ঘটনায় রাঙ্গুনিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি হলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ইমরান হোসেনের বাবা রুস্তম আলী বলেন, ‘আমার ছেলের মৃত্যুর ঘটনার আগে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাই ঘাতক গাড়ির চালক, হেলপার অথবা মালিককে আইনের আওতায় আনা হলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এটা কি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি পরিকল্পিত হত্যা।’

মৃত্যুর মাসখানেক আগে কে বা কারা হুমকি দিয়েছিল সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উপজেলার মরিয়মনগর এলাকায় সরকারি খাস জায়গায় মো. ফারুক নামের এক ব্যক্তি ঘর করছিলেন। আর ইমরান যেহেতু সাংবাদিক সে এ বিষয়ে প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে যায় এবং এ বিষয়ে এসিল্যান্ড সাহেবের সাথেও কথা বলে। আর এসিল্যান্ড বিষয়টি জানতে পেরে সরকারি খাস জায়গা উদ্ধার করে ঘরের পাকা দেয়াল ভেঙে দিলে ইমরানকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় ফারুক।’

রুস্তম আলী বলেন, ‘আমি খবর নিয়ে জেনেছি ফারুক বিদেশ থেকে এসে এখন সিএনজি অটোরিকশা চালাচ্ছে। এর আগে বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি চাঁদের গাড়ি চালাতেন। বলা হচ্ছে, আমার ছেলের মৃত্যুও হয়েছে চাঁদের গাড়ির ধাক্কায়। তাই এই মৃত্যু নিয়ে আমার আরও সন্দেহ হচ্ছে।’

‘প্রশাসন যদি ঘাতক গাড়ির চালক, হেলপারকে আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু তদন্ত করতো তাহলে আসল ঘটনা জানা যেত, এটা কি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি পরিকল্পিত হত্যা।’ বলেন নিহত সাংবাদিক ইমরান হোসেনের বাবা রুস্তম আলী।

ইমরানের বাবার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. ফারুক একুশে পত্রিকাকে বলেন, প্রায় দুই মাস আগে ইমরানের কারণে এসিল্যান্ড আমাদের ঘর ভেঙে দিয়েছিল। আর তখন রাগের মাথায় ইমরানকে গালাগালি করেছিলাম। কিন্তু হুমকি দেইনি। গালাগাল দেয়ার পরে আবার ইমরানের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলাম। ইমরানের সাথে ভালো সম্পর্কও হয়েছিল।’

বিদেশ যাওয়ার আগে চাঁদের গাড়ি চালাতেন কিনা- জানতে চাইলে ফারুক বলেন, ‘না, আমি কখনও চাঁদের গাড়ি চালাইনি। বিদেশ যাওয়ার অনেক আগে পিকআপ চালাতাম।’

ইমরানের মৃত্যুর ঘটনার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নন বলেও দাবি করেন ফারুক।

এদিকে নিহত ইমরানের স্বজনদের অভিযোগ, ইমরানকে চাপা দেওয়া ওই গাড়ির চালকসহ অভিযুক্তরা প্রকাশ্যেই ঘুরছেন। গাড়ি চালাচ্ছেন। তবুও তাদেরকে পুলিশ ধরছে না।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্ত চাঁদের গাড়ির চালক শহিদুল্লাহ উত্তর রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণ রাজানগর সেলিম মেম্বার বাড়ির ফিরোজ আহমদের ছেলে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ওই গাড়ির মালিক উত্তর রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর ইউনিয়নের মো. মফিজ।

ইমরানের মৃত্যুর ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও কেউই এখন পর্যন্ত আইনের আওতায় আসেননি।

জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি চন্দন কুমার চক্রবর্তী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আসামিরা এখনো পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’