বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ট্রেন…

প্রকাশিতঃ Sunday, October 1, 2017, 8:03 pm

মো: আবদুল মান্নান : আজকাল ট্রেন ও রেলস্টেশন নিয়ে অনেকেই লিখছেন। লেখাগুলো বেশ স্মৃতিজাগানিয়া। শৈশব-কৈশোরে বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের সাথে ট্রেনে ভ্রমণ নিয়ে এসব লেখা মাঝে মধ্যে পড়ি।

সম্প্রতি প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসনাত আব্দুল হাই এবং শওকত আলী’র এমন দুটো লেখা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় বেরিয়েছে। পড়তে পড়তে ভাবছি, সামান্য একজন লেখক হিসেবে নিজেও চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?

ট্রেনের সাথে আমার পরিচয় আজন্ম এ কথা বললে ভুল হবে না। কারণ আমার পাঁচ পুরুষের জন্মভিটার খুব কাছেই রেলস্টেশন। পদব্রজে মাত্র দশ মিনিটের পথ। শৈশব থেকে ট্রেন দেখা, ট্রেনের শব্দ শোনা, সারাদিন ট্রেনের হুইসেল, ট্রেনের চলাচলের সাথে সময় হিসাব করা বা হাজারো মানুষের আসা-যাওয়ার স্মৃতি কখনো ম্লান হওয়ার নয়। এটি চোখের সামনে সবসময় সতেজ, ঝলমলে হয়ে আছে।

আমাদের স্টেশনটির নাম মানিকখালী। এর নাম নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা জনশ্রুতি আছে। তবে ব্রিটিশ-ভারতের অনেক স্থানেই এমনটি হয়েছে। যেমন একই স্থানে থাকার পরও গ্রামের বা ইউনিয়নের নাম একটি আর রেলস্টেশনের নাম হয়েছে অন্য। আমাদের স্টেশনটিও তেমনি। এ স্টেশনের উপর দিয়ে কবে প্রথম ট্রেন চলে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। কারণ ঐ দিনটি সম্পর্কে কোন তথ্য আমার হাতের কাছে নেই। তবে এটুকু বলা যায়, আমার জন্মের অন্তত তেষট্টি বছর পূর্বে মানিকখালী স্টেশনের উপর দিয়ে প্রথম ট্রেন চলে।

একটি পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের প্রায় দুশ’ বছরের রক্তঝরা ইতিহাসে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান হিসেবে যদি কিছু সর্বাগ্রে বিবেচনায় আনা হয়, তবে সেটি হবে রেললাইন বা ট্রেন চালুকরণ। আজকের আমাদের এই বাংলাদেশ অংশে প্রথম ট্রেন চালু হয় ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর। সর্বপ্রথম কুষ্টিয়ার জগতী থেকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পর্যন্ত ৫৩ দশমিক ১১ কি.মি. ব্রডগেজ লাইন চালু হয়। ২৩ বছর পর ১৮৮৫ সালে ময়মনসিংহ-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইন চালু হয়। শুধু কাঁচা পাট কলকাতায় নেয়ার জন্য তা করা হয়। ১৮৯৫ সালে আসাম-বাংলা রেলের আওতায় চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ১৫০ দশমিক ৮৯ কি.মি. মিটার গেজ লাইন চালু হয়। একই বছর কুমিল্লা-লাকসাম-চাঁদপুর ট্রেনলাইন চালু হয়। সে হিসেবে ভৈরব বাজার হতে গৌরীপুর জং ট্রেন চালু হওয়ার কথা ১৮৯৭ বা ১৮৯৮ সালে। আর তখনই ট্রেন প্রথম মানিকখালী স্টেশনকে অভিবাদন জানায়।

ছেলেবেলায় আমাদের গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান আনন্দদায়ক বিষয় ছিল ট্রেন। কাজে, অকাজে, বিনা কারণেই স্টেশনে চলে যাওয়া, ট্রেন আসছে, থামছে, ক্রসিং করছে, মানুষের ঢল নামছে, প্লাটফর্ম উপছে পড়া যাত্রী। যেন দিনভর মানুষের মিলনমেলা। ট্রেন কোনো কারণে মিস করলে দীর্ঘ অপেক্ষার পালা। চা-স্টলে বসে অনিশ্চিত প্রহর গোণা, চা-বিস্কিট খাওয়া, কখনো বা নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া এসবই ছিল নিত্যদিনের চিত্র।

মানিকখালী স্টেশনের পেছনে সবচেয়ে পরিচিত স্টলটি ছিল বাক্কারের চা-স্টল। একেবারে স্টেশনসংলগ্ন থাকায় ওটাতে যাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকতো। অন্তহীন লোক সমাগম। বিরামহীন সার্ভিস দিয়ে যেতেন আমাদের বাক্কার কাকু। শৈশব থেকে তাকে আমরা কাবু বলে ডাকতাম। এমনকি মহকুমা শহরে গিয়ে কলেজে পড়ার সময়ও ট্রেনে উঠার পূর্ব মুহূর্তে কখনো বাক্কার কাকুর কাছ থেকে অতিরিক্ত পাঁচ দশ টাকা নিয়ে যেতাম। পরে আমার বাবা দিয়ে দিতেন। এখন কী এসব ভাবা যায়?

ট্রেনে মালামাল পরিবহন ছিল অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সারাদিন কাঁচামাল-সবজী-মাছ পার্শ্ববর্তী বড় বড় হাট থেকে এসে প্ল্যাটফর্মে জমা হতো। সন্ধ্যায় বা রাতের মালাবাহী ট্রেনে শত শত বস্তা এসব মালামাল উঠিয়ে দেয়া হতো। যে সকল স্টেশন থেকে ট্রেনে বেশী মালামাল উঠানামা করতো সে সব স্টেশনই ছিল পোস্টিং পদায়নের জন্য অতি আকর্ষণীয়। স্টেশন মাস্টারগণ ঐসব স্টেশনের জন্য তদ্বীর করে পোস্টিং নিতেন। তাদের পরিবার, সন্তানগণ স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করতো। এমন অনেক স্কুলবন্ধু আজো আমাদের সাথে যোগাযোগ করে।

আজকাল হয়তো ভাবা যাবে না, স্টেশনের বড় মাস্টার সাহেব সন্ধ্যায় আমাদেরকে স্টেশন এলাকায় দেখলে অভিভাবকের মত শাসন করে বলতেন এ সময় স্টেশনে কী করছো? বাড়ি যাও। পড়াশুনা কর- ইত্যাদি।

আজো স্পষ্ট মনে পড়ে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের অব্যবহিত পরে প্রথম পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী দু’দিকে মেশিনগান তাক করে ধীরে ধীরে দীর্ঘ একটি ট্রেনে করে মানিকখালী স্টেশনে এসে থামে। হাফ প্যান্ট পরা শিশু বলেই হয়তো সেদিন ঐ ট্রেনটির একেবারে কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। পাকিস্তানী বর্বর আর্মিদের জীবনে প্রথম দেখি। তবে বয়স্করা ভয়ে দূরে সরে যায়। একটু পরে আমিও দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসে মাকে সব বলি। মা বলেছিলেন, আর কখনো ট্রেনের কাছে বা ইস্টিশনে যাবে না। ওরা কিন্তু মানুষ দেখলেই গুলি করে মেরে ফেলে। সাবধান।

স্কুলজীবনে আরও একবার ট্রেনে চড়ার কথা খুব মনে পড়ে। ১৯৭৩ সালের কথা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিশোরগঞ্জ আসেন। বিরাট জনসভা। সভাটি হয়েছিল গভ: স্কুলের মাঠে। এখন সরকারি মহিলা কলেজের পেছনটায়। এলাকাটিকে এখন আলোর মেলা বলে। সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা ওখানটায় অবস্থিত। আমার এক চাচার সাথে মানিকখালী থেকে ট্রেনে উঠি। ট্রেনে অভাবনীয় ভিড়। ভেতরে উঠার কোনো সুযোগ নেই। যাত্রীর আধিক্যের কারণ বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যাওয়া। বাধ্য হয়ে চাচা আমাকে নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠেন। প্রথমে তিনি উঠেন, পরে আমাকে টেনে উঠান। চাচা কোনো লেখাপড়া জানতেন না। তিনি ছিলেন সহজসরল একজন কৃষক। কাজেই সকলের মত তিনিও বিনা টিকেটে ছাদে উঠে বসেন। ট্রেন কিশোরগঞ্জ স্টেশনে থামতে না থামতেই চারদিক থেকে বাঁশি বাজিয়ে পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী স্টেশন ব্লক দেয়। বিশেষ করে যারা ছাদে ছিল তাদেরই বেশী ধরছে। চাচা তাড়াহুড়ো করে নেমে গিয়ে আমাকে সাবধানে নামতে বলে তিনি নিচে থেকে ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। আমি লাফ দিয়ে পড়ে যাই। হাঁটুতে ব্যথা পেয়েও দৌড়ে চাচাকে অনুসরণ করতে করতে কোনক্রমে প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করি।

ট্রেন থেকে নেমে চার-পাঁচ কি: মি: পায়ে হেঁটে সভাস্থলে পৌঁছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আংশিক শুনতে পেরেছিলাম। মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোতে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সভাশেষে বঙ্গবন্ধু জনতার মধ্য দিয়ে হেঁটে হাত নাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সে দৃশ্য দেখেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর গায়ের রং হলুদ ফর্সা। সবাইকে ছাড়িয়ে উচ্চতায় অসাধারণ এক সুপুরুষকে সেই প্রথম দেখি।

বাড়ির কাছে ট্রেন আর স্টেশন থাকায় আমার বিচিত্র রকম গল্প জানা। জীবনের প্রায় অর্ধশতাব্দীর নানা স্মৃতি একটিমাত্র লেখায় কি তুলে আনা সম্ভব? ভাবছি, নানা রংয়ের, নানা বর্ণের দিনলিপি পৃথক পৃথক ‘এপিসোড’ করে কখনো কখনো লিখে রাখলে মন্দ কী?

লেখক : বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম