
ঢাকা: দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঊর্ধ্বগতি এবং উচ্চ ক্ষমতার ইঞ্জিনের মোটরসাইকেল অনুমোদনের ইস্যুতে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই চাকার বাহনটি।
অথচ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। টানা তিন বছর ধরে দেশে মোটরসাইকেল বিক্রি ও নিবন্ধন কমছে।
২০২৩ সালে বিআরটিএ থেকে ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়, যা ২০১৬ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৮টি মোটরসাইকেল।
বাজারের এই মন্দার মধ্যেও ভারতীয় ব্র্যান্ড রয়্যাল এনফিল্ডের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্য। গত ২১ অক্টোবর থেকে রয়্যাল এনফিল্ডের প্রি-বুকিং শুরু করে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ইফাদ মোটরস লিমিটেড।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার ইউনিট মোটরসাইকেলের অগ্রিম অর্ডার হয়েছে।
রয়্যাল এনফিল্ডকে ঘিরে মোটরসাইকেলপ্রেমীদের উদ্দীপনার মধ্যেও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছর মোটরসাইকেল বিক্রি গত বছরের তুলনায় আরও খারাপ। তবে ‘মূল্য’র দিক থেকে বাজারে তার খুব একটা প্রভাব পড়েনি।
রানার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, “বাজার ক্ষুদ্র হচ্ছে এটা ঠিক। তবে বাজার মূল্য-নির্ভর হচ্ছে। যে মোটরসাইকেলগুলোর দাম বেশি, সেগুলোর বাজার ভালো করছে। আগে যেটা ছিল, ‘বটম অব দ্য পিরামিড’ যদি বলেন, তাহলে নিচের দিক থেকে চাহিদা কমছে, ওপরের দিকে চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে বাজারে সংখ্যা কম হলেও মূল্য বেশি।”
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “বাহ্যিক কারণ অবশ্যই আছে। অবস্থা ভালো থাকলে মানুষ মোটরসাইকেল বা দামি ইলেকট্রনিক জিনিস কেনে। অবস্থা খারাপ থাকলে অপেক্ষা করে। বর্তমানে এ ধরনের একটা প্রভাব তো আছেই।”
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৫ লাখ ৬ হাজার ৯১২টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছিল। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা কমে ৩ লাখ ১০ হাজার ৪১৮-তে দাঁড়ায়। চলতি বছরের ১১ মাসে ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৮টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, “২০২২ সালে রাইডশেয়ারিং জনপ্রিয়তার কারণে মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়েছিল। পরে রাইডশেয়ারিং চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিকল্প হিসেবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জনপ্রিয় হওয়ায় মোটরসাইকেলের চাহিদা কমেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও এর জন্য দায়ী। তবে মোটরসাইকেল নিবন্ধন কমলেও বাংলাদেশে বিদ্যমান যানবাহনের তুলনায় সড়কের সংখ্যা অপ্রতুল। এ অপ্রতুল সড়কে মোটরসাইকেল ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাহনটির ওপর নীতিগত নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”
বিআরটিএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর অন্যান্য যানবাহন নিবন্ধনে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। অটোরিকশা ও বাসের নিবন্ধন কিছুটা কমলেও জিপ, কার্গো ভ্যান, মাইক্রোবাস এবং ট্রাকের নিবন্ধন বেড়েছে। চলতি বছরের ১১ মাসে ৩ হাজার ৯৬৭টি অটোরিকশা নিবন্ধিত হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৯ হাজার ২৫৭টি। একইভাবে, চলতি বছর ১ হাজার ৩৯৫টি বাস নিবন্ধিত হয়েছে, গত বছর যা ছিল ২ হাজার ২৮০টি।
অন্যদিকে, জিপ নিবন্ধনের সংখ্যা গত বছর ৭ হাজার ৭৬৫টি থেকে বেড়ে চলতি বছর ৮ হাজার ১৪টি হয়েছে। কার্গো ভ্যান নিবন্ধন গত বছর ১ হাজার ৮৪৭টি থেকে বেড়ে চলতি বছর ২ হাজার ৬৫৮টি হয়েছে। মাইক্রোবাস নিবন্ধন গত বছর ৫ হাজার ৫২টি থেকে বেড়ে চলতি বছর ৫ হাজার ৩২২টি হয়েছে।
এই তথ্যগুলি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে মোটরসাইকেল বাজারে একটি মন্দা চলছে, তবে অন্যান্য যানবাহনের চাহিদা এখনও তুলনামূলকভাবে ভালো। রয়্যাল এনফিল্ডের মতো দামি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের চাহিদা থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অন্যান্য কারণে প্রভাবিত হচ্ছে।