শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ: দেশের অর্থনীতি কি হুমকির মুখে?

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৫ জানুয়ারী ২০২৫ | ১১:২০ অপরাহ্ন


বিশাল ঋণের বোঝা, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার ত্রিমুখী চাপে দেশের অর্থনীতি ক্রমশ নাজুক হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন সংকটের মুখে পড়তে হবে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ঋণের পরিমাণ ২০ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১০ লাখ ২০ হাজার ২০৫ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ১০ লাখ ১৩ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ২৫১ কোটি টাকা।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ঋণের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ।

কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ ৭ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে এই পরিমাণ আরও বাড়বে।

ঋণ খেলাপি বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ঋণ শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা। এই নীতিমালায় ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। ফলে, ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন এবং বাধ্য হচ্ছেন খেলাপি হতে।

এছাড়াও, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঋণের সুদহার কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সুদের হার ১৫ শতাংশের বেশি, যা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় বোঝা। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, সুদের হার এভাবে বাড়তে থাকলে একসময় ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতিকে “বাঁশ আর হারিকেন” ছাড়া আর কোন ভবিষ্যৎ দেখছেন না বলে মন্তব্য করেছেন। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেছেন, “দেশের অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাবে।”

ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ না থাকায় ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা ঋণের সুদহার কমানো এবং ঋণ শ্রেণিকরণের সময় বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে অনাগ্রহ – এসব কারণে দেশের ঋণ খাত ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সময় থাকতে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।