
আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, বাজারে এর প্রত্যাশিত প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়। আমদানি ও শিল্পখাতে শুল্ক ছাড়, এলসি মার্জিন শিথিলকরণ এবং বন্দরে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং, একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র এর থেকে লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও, খুচরা দোকানে সয়াবিন তেলের সংকট রয়েছে। তবে সুপারশপ ও বড় দোকানগুলোতে ভোজ্যতেলের ঘাটতি নেই। চালের ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও দাম বাড়ছে। সরকারের নীতি সহায়তার কারণে আমদানি বাড়লেও, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় টাকার অঙ্কে আমদানি কমলেও পরিমাণে বেড়েছে।
সরকার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরিমানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার পাশাপাশি, প্রয়োজনে অসাধুদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে কিছু পণ্যের দাম সামান্য কমলেও, নীতি সহায়তায় ব্যাপক ছাড়ের তুলনায় দাম কমার হার নিতান্তই কম।
অর্থ ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টারা সম্প্রতি চাঁদাবাজিকে দাম না কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আশা প্রকাশ করেছেন, রমজানে পণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকবে এবং খাদ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল থাকবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কারসাজি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন জানান, জানুয়ারী মাস থেকে রমজান-নির্ভর পণ্যের দাম কমতে শুরু করলেও, মূল্য আরও ভোক্তাসহনীয় করতে সরকারি সংস্থাদের কঠোর তদারকি প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, গত কয়েক বছর রোজায় পণ্যের ঘাটতি না থাকলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ নেওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চিনি, ডিম, পেঁয়াজ, আলু ও খেজুরের দাম কমেছে।
চিনি: পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে শুল্ক কমানোর ফলে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ১৩০ টাকা ছিল। তবে, শুল্ক কমার তুলনায় দাম কমার পরিমাণ কম।
ডিম: ডিম আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় দাম কমে প্রতি ডজন ১৩০ টাকায় নেমেছে, যা আগে ২১০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
পেঁয়াজ: পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে দাম কমে ৩৫-৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১২০ টাকা পর্যন্ত ছিল।
আলু: আলু আমদানিতে শুল্ক কমানো ও দেশি আলু বাজারে আসায় দাম কমে ২০-২২ টাকা কেজি হয়েছে, যা আগে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
খেজুর: খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর ফলে আজওয়া খেজুর ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত ছিল।
চাল: চাল আমদানিতে শুল্ক কমায় দাম কিছুটা কমলেও, এখনো গত বছরের তুলনায় বেশি। মোটা চাল ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ৫০ টাকা ছিল।
তবে, ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা কাটেনি। সরকার ভোজ্যতেলের উপর শুল্ক ও ভ্যাট কমালেও বাজারে দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেল ২০০ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ১৬০ টাকা ছিল। খুচরা ব্যবসায়ীরা কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কোম্পানিগুলোকে দৈনিক উৎপাদন জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং উৎপাদন দ্বিগুণ করার কথা বলেছেন। টিকে গ্রুপের পরিচালক ব্রাজিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সরবরাহ দেরির কথা জানিয়েছেন এবং রোজার জন্য দ্বিগুণ এলসি করার তথ্য দিয়েছেন।
ছোলা ও মসুর ডালের দাম গত বছরের কাছাকাছি থাকলেও, গরুর মাংস ও ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। গরুর মাংস ৭৫০-৮০০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খেজুর ও ফলের দাম কমতে শুরু করেছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চাঁদাবাজি, অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফা এবং সরকারের যথাযথ তদারকির অভাবে নীতি সহায়তায় ছাড় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ এবং তদারকি বাড়ানোর বিকল্প নেই।