
ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলাকে অবশেষে তিন মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা বহিঃনিরীক্ষকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিভিন্ন গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পর নেওয়া হলো।
সূত্র মতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই মুনিরুল মওলার উত্থান শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ায় তিনি নতুন কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং দ্রুততার সাথে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরবর্তীতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে, যার প্রমাণ ব্যাংকের নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।
গত বছরের (২০২৪) আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বেশিরভাগ সদস্য এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (ডিএমডি) অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেলেও মুনিরুল মওলা তার পদে বহাল ছিলেন। তবে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাকে অপসারণের জন্য চাপ ছিল।
ইসলামী ব্যাংকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “নতুন পর্ষদ বহিঃনিরীক্ষকের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছিল। সেই প্রতিবেদন এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এতে এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং নাবিল গ্রুপের প্রায় ১৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকার জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মে এমডি মুনিরুল মওলার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একারণেই তাকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একসময়ের দেশের অন্যতম সেরা এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির আজকের ‘দুর্বল’ অবস্থায় আসার পেছনে মুনিরুল মওলার ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র এতদিন আড়ালেই ছিল। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২১.০৮ শতাংশ। মাত্র ছয় মাস আগে, গত জুনেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা (৪.৪২ শতাংশ)।
অর্থাৎ, ছয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে চারগুণেরও বেশি। ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এস আলম ও নাবিল গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বেনামে নেওয়া ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।