শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

বাংলাদেশের পোশাকে মার্কিন শুল্ক অযৌক্তিক, ক্ষতিগ্রস্ত হবে মার্কিন ক্রেতারাই: পল ক্রুগম্যান

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৮ এপ্রিল ২০২৫ | ১১:০১ পূর্বাহ্ন

Paul Krugman
নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান মনে করেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশের পণ্যের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করার মার্কিন পরিকল্পনা একটি ভুল পদক্ষেপ। এতে মার্কিন ক্রেতাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

পল ক্রুগম্যান জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার যে চেষ্টা চলছে, তা একপেশে। একটি শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য বন্ধু এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতেও উৎপাদন সচল রাখা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোর পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করাকে তিনি অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তাঁর মতে, এই নীতি মার্কিন নাগরিকদের জীবনকে নিরাপদ করার বদলে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

আলোচনায় ক্রুগম্যান মার্কিন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ রবার্ট লাইথিজারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, লাইথিজার বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি হয়তো বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করতেন, কারণ তিনি বাস্তব পরিস্থিতি বোঝেন।

উচ্চ শুল্ক আরোপ করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন শিল্প ফিরিয়ে আনা সম্ভব কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে ক্রুগম্যান সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুল্কের প্রভাবকে সীমিত করে দেয় এমন অনেক কারণ থাকায় উচ্চ হারে শুল্ক বসিয়েও বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো কঠিন। একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেই হয়তো তা সম্ভব।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাণিজ্য ঘাটতি দূর হলেই যে দেশে শিল্পায়ন ঘটবে বা উৎপাদন খাতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, এমনটা ভাবা ভুল। জার্মানির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দেশটির বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সেখানে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের হার কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার মূল কারণ বাণিজ্য ঘাটতি নয়, বরং অটোমেশন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। ক্রুগম্যানের হিসাবে, বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা গেলেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের হার হয়তো মোট কর্মসংস্থানের ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ১২ শতাংশ হতে পারে, কিন্তু অতীতের ৩০ শতাংশের পর্যায়ে ফেরা সম্ভব নয়।

পল ক্রুগম্যান মনে করিয়ে দেন যে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি থাকার মানে এই নয় যে উদ্বৃত্ত থাকা দেশটি অন্যায্য বাণিজ্য নীতি অনুসরণ করছে। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এমন ধারণার সমালোচনা করেন। তিনি ১৯৩৪ সালের ‘রিসিপ্রকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট অ্যাক্ট’-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি গত ৯০ বছর ধরে পারস্পরিকতার ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়েছে, যেখানে এক দেশ শুল্ক কমালে অন্য দেশও কমায়।

সবশেষে, ক্রুগম্যান বাণিজ্য ঘাটতিকে সংশ্লিষ্ট দেশের আমদানি দিয়ে ভাগ করে তার অর্ধেক হারে শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাবিত পদ্ধতিটিকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেন এবং জানান যে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও এ ধরনের পদ্ধতি পড়াননি।

ক্রুগম্যানের এই বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর একতরফা উচ্চ শুল্ক আরোপ কেবল মার্কিন ভোক্তাদের জন্যই ক্ষতিকর হবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শিল্প পুনর্গঠনের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক হবে না।