রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

মুছা নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী কে?

| প্রকাশিতঃ ২৭ জুন ২০১৬ | ৬:৩০ অপরাহ্ন

Screenshot_26চট্টগ্রাম: পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে মোতালেব ওরফে ওয়াসিম জানিয়েছেন ঘটনার নির্দেশদাতা ‘পুলিশের বড় সোর্স’ আবু মুছা! কিন্তু ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী কে? এসপিপত্মীকে খুন করার জন্য মুছাকে কে নির্দেশ দিয়েছেন? এ রকম অনেক প্রশ্নের একটিরও জবাব মেলেনি ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে।

এছাড়া আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে মোতালেব ওরফে ওয়াসিম জানিয়েছেন আবু মুছার গুলিতেই মাহমুদা খানম খুন হয়েছেন। কিন্তু জবানবন্দি দেয়া অপর আসামি আনোয়ার জবানবন্দিতে বলেছেন, ওয়াসিমের গুলিতেই মিতুর মৃত্যু হয়েছে। পরষ্পর বিরোধী এ দাবি করার পর- জবানবন্দিতে আসা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যদিও রোববার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার ওয়াসিমের গুলিতেই মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মুছার গুলিতে এসপিপত্মীর মৃত্যু হয়েছে জানালেও ওয়াসিম একটি মিস ফায়ার করেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, খুনিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে এমন সব তথ্য পাওয়া গেছে, যা শুনে তদন্ত কর্মকর্তরা বিস্মিত হয়েছেন। মুছা কেন এ খুন করিয়েছে এ পর্যন্ত মামলার তদন্ত যাবে না। খুনি মুছাকে কে এ কাজ করতে বলেছে? সেই প্রশ্নের জবাব কেউ কখনো জানবে না।

রোববার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম হারুন অর রশীদ এর আদালতে মিতু হত্যায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন গ্রেপ্তার ওয়াসিম ও আনোয়ার। সেই জবানবন্দিতে খুনের কারণ কিংবা খুনের শিকার মিতুকে পূর্ব থেকে না চেনার কথা জানালেও শুধুমাত্র আবু মুছার নির্দেশে টাকার বিনিময়ে ভাড়াকে কিলার হিসেবে ৭ সদস্যের এই কিলিং স্কোয়াড এই হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল বলে জানান।

জবানবন্দিতে বলা হয়, আবু মুছার নির্দেশে জিইসি মোড় এলাকার এক নারীকে খুনের জন্য তারা গত ৫ জুন ভোরে জড়ো হন। এই হত্যা মিশনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল মুছার ওপরই। তার নির্দেশনা মতে টাকার বিনিময়ে মোট সাতজন এই হত্যাকা-ে জড়িত ছিল।

তারা হলেন, আবু মুছা, ওয়াসিম, রাশেদ, নবী, কাুল, শাহজাহান ও আনোয়ার। এদের মধ্যে ওয়াসিম ও আনোয়ার গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে ভোলা নামে একজনের নামও উঠে আসে তাদের দুজনের জবানবন্দিতে।

হত্যাকা-ের বিবরণ দিয়ে ১৪ পৃষ্টার দীর্ঘ জবানবন্দিতে ওয়াসিম জানান, গত ৫ জুন ভোরে জিইসি মোড়ের অদূরে ও আর নিজাম রোডে সাত জনের একটি দল মিতু হত্যার মিশনে অবস্থান নেয়। মূল হত্যা মিশনে অংশ নেন ওয়াসিম ছাড়াও আনোয়ার, মুছা ও নবী।

এরমধ্যে মিতুকে অনুসরণ করেন আনোয়ার। যাকে মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হতে দেখা গেছে পুলিশের উদ্ধার করা ভিডিও ফুটেজে। ভোর রাতে মুসা ও অন্য একজন মোটরসাইকেলে প্রবর্তক আসে। বাকিরা একটি সিএনজি অটোরিকশা যোগে প্রবর্তক মোড় আসে।

এর আগে কালামিয়া বাজারে মুসা সিএনজি ভাড়া বাবদ ৫শ টাকা দেয় ওয়াসিমদের। এভাবে ভোরে ৭ জন প্রবর্তক মোড়ে এসে জড়ো হয়। এরপর তারা হেটে গোলপাহাড় এলাকায় পৌঁছে। ওয়াসিম গোলপাহাড় মন্দিরের বিপরীতে রয়েল হাসপাতালের সামনে অবস্থান নিয়ে মিতু বের হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করে। আর মুছা ও আনোয়ার মোটরসাইকেল নিয়ে নিরিবিলি হোটেলের সামনে অবস্থান নেয়।

নবী মিতুদের বাসার রাস্তার পাশে টিঅ্যান্ডটি বাক্সের পাশে অবস্থান নেন। অন্যরাও গোলপাহাড় থেকে জিইসি মোড়ের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। যাতে হামলাকারীরা আক্রান্ত হলে অন্যরা ছুটে আসার পরিকল্পনা নেয়। মিতু ছেলে মাহিরের হাত ধরে মূল রাস্তায় বের হলে নিরিবিলি হোটেলের সামনে থাকা মুছা বিপরীত দিক থেকে মোটরসাইকেলে মিতুকে ধাক্কা দেয়।

আর মোটর সাইকেল থেকে নেমে গুলি করেন ওয়াসিম। যদিও সেটি মিস ফায়ার হওয়ায় তার কাছ থেকে গুলি নিজ হাতে নিয়ে মিতুর মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করেন মোটর সাইকেলে চালকের আসনে থাকা আবু মুছা নিজেই। এরআগে ছুরিকাঘাত করে গলির মুখে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া নবী।

ঘটনাস্থলেই মিতুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মুছাসহ মোটরসাইকেলে করে তিনজন নির্বিঘেœ ঘটনাস্থল ত্যাগ করে প্রথমে ষোলকবহর যান।

সেখান থেকে মুছার কালামিয়া বাজারের বাসায় চলে যায়। সেখানে হত্যাকান্ডে ব্যাকআপ টিমের অন্য তিন সদস্য ও নবীও যোগ দেয়। এদের কাউকে তাৎক্ষণিক ২ হাজার থেকে তিন হাজার টাকা দেয় মুছা। এরপর সবাই নিজ নিজ বাসায় চলে যায়।

জবানবন্দিতে ওয়াসিম আরো বলেন, ঘটনার আগের রাতে ৭ জন মুছার বাসায় মিটিং করে। মিতু জঙ্গিদের অর্থ সহায়তা করে এবং জঙ্গি নেত্রী, তাই তাকে মেরে ফেলতে হবে উল্লেখ করে তাকে হত্যার মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মুছা। তবে মূল পরিকল্পনাকারীর নাম তারা না জানলেও হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে মুছার নামই উল্লেখ করেছেন।

মূলত মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই হত্যাকান্ডে অংশ নিলেও হত্যার পর দুই তিন হাজার টাকার বেশি কোনও টাকা পায়নি তারা। হত্যাকান্ডে অংশ নিতে মুছার মাধ্যমে ভোলা নামে একজন তাদের একটি রিভলবার ও একটি পিস্তল সরবরাহ করে। এ দুটি অস্ত্র ওয়াসিম ও আনোয়ার গ্রহণ করে ঘটনার আগের দিন রাতেই। তবে এই ভোলা ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

১০ পৃষ্টার জবানবন্দিতে আনোয়ার জানান, মিতুকে তারা খুন করলেও ভিকটিমের পরিচয় সম্পর্কে তারা জানতোনা। হত্যাকান্ডের পরে টিভিতে যখন নিহত ওই নারী এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী বলে নিশ্চিত হয় তখন তারা ভয় পেয়ে মুছাকে ফোন দেন। এসময় মুছা নিজকে এক বড় পুলিশ অফিসারের সোর্স দাবি করে তাদের হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চুপ থাকতে বলেন। এরপর তারা উভয়ে জামা-কাপড় পাল্টিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ রাখে।

জবানবন্দিতে আরো বলা হয়, হত্যার উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে না জেনেই মূলত টাকার জন্য ওই ‘জঙ্গি নেত্রীকে’ হত্যা করতে তারা অংশ নিয়েছিল মুছার নির্দেশেই। এমনকি মিতুকে ছুরিকাঘাত করার সময় তার সাথে থাকা ছেলে মাহিরকে আনোয়ার নিজে ধরে রাখেন। সেসময় মাহির তার মাকে না মারতে আনোয়ারের পা ধরে করজোড় আকুতি করে বলে, ‘তোমরা আমার মাকে মেরে না, তাকে ছেড়ে দাও।’ এরপরও নবী তার ছেলের সামনে উপর্যপুরি আটটি ছুরিকাঘাত করে এবং ওয়াসিম মিতুর মাথায় গুলি করে বলে উল্লেখ করে জবানবন্দি দেন গ্রেপ্তার আনোয়ার। তবে অস্ত্র সরবরাহকারী ভোলা ঘটনাস্থলে ছিলেন কিনা সেটি দুজনেই নিশ্চিত না করলেও মুছার নির্দেশেই টাকার বিনিময়ে এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তারা দুজন।

প্রসঙ্গত, গত ৫ জুন নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত ও গুলিতে নিহত হন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। পরদিন পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব, সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিআই)। তবে মামলার মূল তদন্তে আছে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।