মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮

সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পে অস্থিরতা কেন?

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

শরীফুল রুকন : বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে অস্থিরতা কাটছে না। নানা সমস্যা রয়েছে সম্ভাবনাময় শিল্পটিতে। এর মধ্যে, দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প বিদেশীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়া। চাহিদার তুলনায় একদিন বয়সী বাচ্চার সরবরাহ না থাকা। পোল্ট্রি খাবারের দামে উত্থান-পতন। পোল্ট্রি শিল্পের কর অব্যহতি সুবিধা বাতিল। হঠাৎ করেই পোল্ট্রি সেক্টরে আয়কর, কাস্টমস ডিউটি, এআইটি আরোপিত হওয়া। পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল খালাসে কাস্টমসের জটিলতা ও ভোগান্তি। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ও পোল্ট্রি খামারিদের জন্য কোন প্রণোদনা বা সহায়তা তহবিল না থাকা ইত্যাদি। পোল্ট্রি শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এসব কারণ। এ অস্থিতিশীলতার কারণে এ শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানে থাকা অর্ধলক্ষাধিক মানুষের জীবিকায় রয়েছে অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে, আশির দশকে দেশের পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ছিল মাত্র ১৫শ’ কোটি টাকা। বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আমদানিনির্ভর খাতটি এখন অনেকটাই আত্ম-নির্ভরশীল। বর্তমানে পোল্ট্রি মাংস, ডিম, একদিন বয়সী বাচ্চা এবং ফিডের শতভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প। জিডিপি’তে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন এ শিল্পের সাথে জড়িত; যার প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। গার্মেন্টস শিল্পের পর দেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা পোল্ট্রি শিল্পে এখন চলছে অস্থিরতা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম উপাদান হলো একদিন বয়সী বাচ্চা। চাহিদার তুলনায় বাচ্চা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন বাচ্চা ও পোল্ট্রি উপকরণ উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। কোম্পানীগুলো নিজেরাই মাংস ও ডিম উৎপাদনের জন্য পরিকল্পিতভাবে এই কৃত্রিম সংকট তৈরী করেছে। ফলে বাড়তি দাম দিয়েও বাচ্চা পাচ্ছেন না অনেক খামারী। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে তৃণমূলের খামারগুলি বাচ্চার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে তারা বাজারে ডিম ও মাংসের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ইচ্ছা মাফিক মুনাফা করার সুযোগ পাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পোল্ট্রি শিল্পের কর অব্যহতি সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছর থেকে সারাদেশের পোল্ট্রি খামারি ও উদ্যোক্তারা চাপের মুখে পড়েছেন। পোল্ট্রি শিল্পের আয়ের ওপর বিদ্যমান কর হার ‘শূন্য’ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ করা হয়েছে। পোল্ট্রি ফিডের আয়ের ওপর বিদ্যমান কর হার ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০শতাংশ করা হয়েছে। হাঁস-মুরগির হ্যাচারির ক্ষেত্রেও ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়েছে। পোল্ট্রি ফিডের অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ভুট্টা, সয়ামিল এবং অয়েল কেকের আমদানি শুল্ক হার শূন্য থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল ভূট্টাসহ বেশকিছু কাঁচামাল এবং অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ ও পণ্য আমদানিতে নতুন করে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ধার্য্য করা হয়েছে। ফলে বাচ্চা, ফিড, ডিম ও মুরগির উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। এ চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ছে খামারিদের উপর।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এইচ.এস কোডের জটিলতায় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে পণ্য খালাস করতে জটিলতা ও ভোগান্তি বেড়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হার অনেক বেশি। বিদেশী কোম্পানীগুলো কম সুদ হারে ঋণ এনে এদেশে ব্যবসা করছে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে ঝরে পড়ছে। এছাড়া পোল্ট্রি খামারিদের জন্য তেমন কোন প্রণোদনা বা সহায়তা তহবিল নেই।

বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) আহবায়ক মসিউর রহমান বলেন, দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে কর অব্যহতি সুবিধা ২০২১ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা দরকার। হঠাৎ করে এ সেক্টরে আয়কর, কাস্টমস ডিউটি, এআইটি ইত্যাদি একসাথে আরোপিত হয়েছে। পোলট্রি শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়া উচিত। নয়তো পোল্ট্রি শিল্পের কাঙ্খিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।