
বছরের পর বছর ধরে চলা গুঞ্জন আর চাপা আতঙ্ক অবশেষে প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে। ‘আয়নাঘর’ – এই নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালাগুলোতে চালানো অকথ্য নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসছে একের পর এক। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেরিয়ে আসছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এসব অন্ধকার অধ্যায়। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন গুম থাকা এবং পরে মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উন্মোচিত হয়েছে আলো-বাতাসহীন কুঠুরিতে বৈদ্যুতিক শক, মারধরসহ নানা উপায়ে ভিন্নমত দমনের চেষ্টার নির্মম কাহিনি।
বিবিসির অনুসন্ধানে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুব কাছেই এমন একটি গোপন নির্যাতন কেন্দ্রের সন্ধান মিলেছে। গুমের শিকার হয়ে আট বছর পর ফিরে আসা আইনজীবী মীর আহমেদ বিন কাসেমের স্মৃতিচারণার সূত্র ধরে এই কেন্দ্রের খোঁজ পাওয়া যায়। কাসেম জানান, বন্দিদশায় তার চোখ বেশিরভাগ সময়ই বাঁধা থাকত, কিন্তু তিনি বিমানের ওঠা-নামার শব্দ পেতেন। এই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা বিমানবন্দরের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটির ভেতরে মূল ভবনের পেছনে একটি জানালাবিহীন, সুরক্ষিত কনক্রিটের কাঠামো খুঁজে পান, যা বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রটির প্রবেশমুখে নতুন ইট বিছানো, যা ভেতরের কাঠামো আড়াল করার চেষ্টা। ভেতরে সরু করিডোর, দুপাশে ছোট ছোট কুঠুরি, পুরোটাই মিশমিশে অন্ধকার। প্রতিবেদনে এই গোপন কারাগার পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) অন্যতম দায়ী করা হয়েছে।
সাত মাস আগে মুক্তি পাওয়া আহমেদ বিন কাসেম বিবিসিকে বলেন, “আমার মনে হতো, আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। বাইরের জগৎ থেকে আমি ছিলাম পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।” তার ঘরটিতে আলো ঢোকার কোনো পথ ছিল না, দিন-রাতের পার্থক্য বোঝার উপায় ছিল না। টর্চের আলোয় দেখা গেছে, ঘরগুলো এতই ছোট যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোও কঠিন, বাতাসে ভাসছে দুর্গন্ধ। ভাঙা দেয়াল আর ছড়িয়ে থাকা ইট-পাথরের টুকরো প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
বিবিসির সাথে কথা বলেছেন আরও পাঁচজন ভুক্তভোগী। ৩৫ বছর বয়সী আতিকুর রহমান রাসেল জানান, গত জুলাইয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়। কোথায় রাখা হয়েছিল তা তিনি জানেন না, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আটককেন্দ্র পরিদর্শনের খবর দেখে তার ধারণা, তাকে হয়তো আগারগাঁও এলাকার কোনো কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।

৭১ বছর বয়সী ইকবাল চৌধুরী জানান ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, মুখ খুললে চিরতরে গায়েব করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আমাকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। শকের কারণে একটি আঙুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পায়ের জোর, শরীরের শক্তি কমে গেছে। আমি এখনও আতঙ্কিত।” ২৩ বছরের রহমতুল্লাহ বলেন, “ওরা আমার জীবন থেকে দেড়টা বছর কেড়ে নিয়েছে। আমাকে এমন জায়গায় রেখেছিল, যেখানে কোনো মানুষের থাকা উচিত নয়।” মাইকেল চাকমা ও মাসরুর আনোয়ার নামে আরও দুই ভুক্তভোগীর বর্ণনায়ও উঠে এসেছে একই ধরনের নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালার চিত্র।
একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবে, ২০০৯ সাল থেকে অন্তত ৭০৯ জন গুম হয়েছেন, ১৫৫ জন এখনও নিখোঁজ। গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের কাছে জমা পড়েছে ১,৬৭৬টিরও বেশি অভিযোগ। ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিবিসিকে জানিয়েছেন, দেশজুড়ে এমন শত শত (৫০০-৭০০ বা তারও বেশি) সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এটি ছিল এক বিস্তৃত ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নেটওয়ার্ক।
এসব সেলে নির্যাতনের অভিযোগে ১২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিচারের বিষয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, “বিচার সম্ভব এবং একদিন তা হবেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রুখতে এবং অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করা ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
আয়নাঘরের অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচনের সাথে সাথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে দেশজুড়ে।