
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ‘গণহত্যা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে’ জড়িত থাকার অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে সরকারি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও জনগণের দাবির মুখে সরকার এ বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। একইসাথে, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, “সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও জনগণের পক্ষ থেকে স্বৈরশাসন এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ ব্যাপারে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন সরকার বিবেচনায় রাখছে।” বিবৃতিতে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করারও আহ্বান জানানো হয়।
গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে গুলি করে মানুষ হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। অভ্যুত্থানের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো সরকারি উদ্যোগ না থাকায় এবং গত বুধবার রাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় এই দাবি আবারও জোরালো হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নেন। শুক্রবার সকালে তাদের এই কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী, এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, হেফাজতে ইসলাম, এনডিএমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থন জানায়। এদিন বিকেলে শাহবাগে অবরোধ করে ছাত্র-জনতা এ কর্মসূচিকে ‘দ্বিতীয় অভ্যুত্থান’ আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন না আসা পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থানের ঘোষণা দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, বিষয়টি এত দূর পর্যন্ত গড়াতে দেওয়া উচিত হয়নি। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগকে পুনরায় সুযোগ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, গণ-অভ্যুত্থানকারীদের মেরে ফেলা। কারণ, দলটি আবার সুযোগ পেলে তাদের ছাড়বে না।”
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সরকারের জন্য একটি জটিল সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আওয়ামী লীগের মতো দলকে নিষিদ্ধ করতে হলে আগে ঠিক করতে হবে, তারা আসলেই অপরাধী কি না। হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিষিদ্ধ করলে এটা দেশে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।”
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় কোনো দল বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। এই আইনের অধীনে গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। একই আইনে বিগত সরকার গত বছরের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগকেও শিগগির এই আইনের অধীন নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টা জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা দলগুলোর মতামত নেবেন। সব দলের সঙ্গে ঐকমত্য হলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের পথে এগোবে সরকার। এক্ষেত্রে আইসিটি আইন সংশোধন করে সংগঠনের বিচারের বিধান যুক্ত করা হবে। দলগুলো সম্মতি দিলে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের সব ধরনের দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের আদেশও দেওয়া হতে পারে। এছাড়া, দলগুলোর সায় পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর অধীনেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হতে পারে।
এ বিষয়ে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, “আলোচনার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শিগগির হবে।”
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে চলমান বিক্ষোভে বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এ প্রসঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, “আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কি হবে না, তা বিএনপির বক্তব্যের বিষয় নয়। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কথা বলছে। আমরা বিএনপি হিসেবে তো এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নই।” তিনি আরও বলেন, জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলনের বিষয়টি তিনি অবগত, তবে দলীয় অবস্থান জানতে মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।