শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মৌসুমের শেষে লবণের চড়া দাম: কারা লাভবান, কেন এই উত্থান?

‘সাদা সোনার’ দাম লাফিয়ে ৮০০ টাকা, মহেশখালীর লবণচাষিদের মুখে হাসি
ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ | প্রকাশিতঃ ১১ মে ২০২৫ | ২:৩১ অপরাহ্ন


দীর্ঘ লোকসান ও ঘাটতির কাঁটাপথ পেরিয়ে মৌসুমের শেষ লগ্নে এসে হঠাৎ করেই বেড়েছে দেশের ‘সাদা সোনা’ খ্যাত লবণের দাম। মাসখানেক আগেও যে লবণ প্রতি মণ ১৩০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন লাফিয়ে ৮০০ টাকায় পৌঁছেছে। প্রতি বছরই মৌসুম শেষে লবণের দাম বাড়লেও, চলতি বছর বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। মাঠের লবণ আকস্মিকভাবে লাভের খাতায় নাম লেখানোয় দীর্ঘদিনের নিরাশ চাষিদের মুখে এখন ফুটেছে আশার হাসি। ছয় মাসের পরিশ্রমে ঘাম ঝরিয়ে তিলে তিলে তৈরি করা লবণ বিক্রি করে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।

মহেশখালীর হোয়ানক, কালারমারছড়া, বড় মহেশখালী ও শাপলাপুর ইউনিয়নের মাঠে চলছে লবণ উত্তোলনের শেষ ধাপ। বাজারে দাম বাড়ায় উৎসাহিত হয়ে অনেক চাষি এখন আগের গর্তে মজুত রাখা লবণও বিক্রি করছেন। কেউ কেউ আবার দাম আরও বাড়ার আশায় আপাতত অপেক্ষা করছেন। গর্তে রাখা লবণ বিক্রি করে চাষিরা পুরোনো দেনা পরিশোধে কিছুটা স্বস্তিও পেয়েছেন। লবণের কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ সইতে না পেরে মৌসুমজুড়ে হতাশায় ছিলেন তারা। দাম বাড়ায় সেই হতাশা এখন কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একজন চাষি গড়ে তিন কানি জমিতে লবণ উৎপাদন করেন। জমি ইজারা, পলিথিন, পানি, লবণ ক্রিস্টালাইজার, লবণ তোলার যন্ত্র ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে এতে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হয়। এত খরচে উৎপাদন হয় প্রায় ৯০০ মণ লবণ। মৌসুমের প্রথম দিকে যখন লবণের দাম ছিল ১৩০ থেকে ২০০ টাকা, তখন বিক্রি করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা আয় হতো, যা ছিল লোকসানের সমান। কিন্তু এখন দাম ৮০০ টাকা হলে আয় হবে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা থেকে খরচ বাদেও ভালো মুনাফা থাকছে।

তবে এই লাভ সবাই পাচ্ছেন না। যারা মৌসুমের শুরুতেই লবণ বিক্রি করে দিয়েছেন, তারা এখন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। অনেক চাষি ধারদেনা পরিশোধের জন্য মৌসুমের মাঝপথেই লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ কম দামে বিক্রি করে দালালদের কাছে প্রতারিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখন যারা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন বা গর্তে মজুত রেখেছেন, তারাই মূলত লাভবান হচ্ছেন। বাজারে দাম হঠাৎ এমনভাবে বাড়বে— তা অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি। ফলে দামে স্বস্তি এলেও কিছুটা হতাশাও রয়ে গেছে।

স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মৌসুমজুড়ে দাম কম থাকায় চাষিরা আগেভাগে বিক্রি করতে চাননি, ফলে বাজারে সরবরাহ কমেছে। এছাড়া পরিবহন সংকট, শিল্পকারখানায় কাঁচামালের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং পাইকারি পর্যায়ে কিছুটা কারসাজির অভিযোগও রয়েছে। এদিকে, ক্রেতাদের একাংশ অভিযোগ করছেন, দাম বাড়ার ফলে নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়ছে, যদিও উৎপাদকরা তা অস্বীকার করছেন।

দামের এই উত্থান চাষিদের জন্য স্বস্তির হলেও, নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রতি বছরই মৌসুম শেষে দাম বাড়ে, অথচ সরকার মৌসুমজুড়ে কোনো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেয় না। ফলে উৎপাদক দাম পান না, ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়। তাই মাঠ পর্যায়ে সংগঠিতভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং দালালচক্র নির্মূল ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। দাম বাড়ার এই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তি যেন আগামীতে বিপর্যয়ে না রূপ নেয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে এখনই।

মহেশখালীর বড় মহেশখালী ইউনিয়নের চাষি আবদুল খালেক বলেন, ‘লবণের দাম এমন বেড়েছে, চোখে পানি এসে গেছে। সারা মৌসুমে দুশ্চিন্তায় ছিলাম, এখন কিছুটা হাসি ফুটেছে। তবে এমন দাম আগে থাকলে আরও বেশি লাভ করতে পারতাম।’ একই ইউনিয়নের আরেক চাষি রহিম উল্লাহ বলেন, ‘আমি শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। গর্তে লবণ জমিয়ে রেখেছিলাম। এখন ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। ধারদেনা শোধ করে এবার একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারব।’ তাদের মতে, দাম আরও বাড়লে নতুন করে চাষে উৎসাহ পাবেন সবাই।

কক্সবাজার বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, চলতি বছরে কেবল মহেশখালীতেই ১৭ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। এর অন্তত ২৫ শতাংশই আসে এই দ্বীপ উপজেলা থেকে। তিনি বলেন, উৎপাদন বেশি হলেও মাঠ পর্যায়ে চাষিরা বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে দাম পাচ্ছেন না। তবে এ বছর শেষ মুহূর্তে এসে কিছুটা স্বস্তি মিলছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছাড়া লবণ শিল্পের পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। মাঠভিত্তিক মজুত ও সংরক্ষণ সুবিধা, দালাল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদকদের সহজ ঋণ এবং সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা না থাকলে আগামী মৌসুমে চাষি কমে যাবে আশঙ্কাজনক হারে। এমনকি অনেক পুরোনো মাঠও পড়ে থাকবে খালি। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। অতএব, মৌসুমের শেষ মুহূর্তে বাড়া দামে খুশি হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার বিষয়েও এখনই উদ্যোগ নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।