উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। এসএসসি পাসের পর কলেজে ভর্তি হয়ে নিবন্ধন করলেও আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না সোয়া চার লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। ফলে চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়াকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা।
আগামী ২৬ জুন থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮২ হাজার কম। তবে মোট পরীক্ষার্থী কমার চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ হলো, যেসব শিক্ষার্থী দুই বছর আগে এসএসসি পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিল, তাদের একটি বিশাল অংশই চূড়ান্ত পরীক্ষা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।
ঝরে পড়ার ভয়াবহ চিত্র
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে প্রায় ১৪ লাখ ৮৪ হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ১০ লাখের কিছু বেশি। অর্থাৎ, নিবন্ধন করার পরও চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসছে না সোয়া চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী।
এই ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে, প্রায় ৪০ শতাংশ। এখানে নিবন্ধন করা প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়ে ৬৩ হাজারই ফরম পূরণ করেনি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও এই হার উদ্বেগজনক, প্রায় ৩৯ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এই হার প্রায় ২৭ শতাংশ, সংখ্যায় যা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই ৭৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষা দিচ্ছে না।
দারিদ্র্য, ব্যয় ও বাস্তবতার চাপ
হঠাৎ করে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ল? এর কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, পড়াশোনার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের চাপকেই প্রধানত দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, “এইচএসসি পর্যায়ে পড়াশোনা নানা কারণে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে, যা অনেক অভিভাবকের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, কেউ কেউ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহও একটি বড় কারণ।”
এসএসসি পাসের পর এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়াকে তিনি ‘জাতির জন্য বিরাট ক্ষতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার এই হারকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে স্বীকার করেছেন আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান খন্দোকার এহসানুল কবির। তিনি বলেন, “এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ দারিদ্র্য এবং বিয়ে হয়ে যাওয়া। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে। আমরা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের ওপর একটি জরিপ করে এমন তথ্য পেয়েছি। এখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ জানতে আমরা একটি জরিপ পরিচালনা করব।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জরিপের মাধ্যমে কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে, এই বিপুলসংখ্যক তরুণের স্বপ্নভঙ্গের দায় এড়ানো কঠিন হবে। দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের স্বার্থেই এই ‘শিক্ষার্থী-শূন্যতা’র পেছনের কারণগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা প্রয়োজন।