রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

মিয়ানমারের আফিম-বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য নতুন বিপদ

মাদকের ভয়াল চক্রে বাংলাদেশ: ২ কোটি মাদকাসক্ত, বছরে ব্যবসা ৬০ হাজার কোটি টাকার
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২১ জুন ২০২৫ | ৮:৩৭ পূর্বাহ্ন

ইয়াবার সর্বনাশা ঢলের পর বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে এখন আসছে আরও ভয়ংকর এক মাদক-বিপদ—হেরোইন। আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর নীতির ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ করে মিয়ানমার এখন বিশ্বের বৃহত্তম আফিম উৎপাদনকারী দেশ। সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে হেরোইনের নতুন বাজার বানানোর চেষ্টা করছে, যা দেশের জন্য এক অশনিসংকেত।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন মিয়ানমারকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আফিম সরবরাহকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, হেরোইনের মূল উপাদান এই আফিম। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির চলমান যুদ্ধের কারণে সেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মাদক কারবারিদের জন্য পোয়াবারো। তারা ইয়াবার পাশাপাশি বাংলাদেশে হেরোইনের ব্যবসা বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান: মাদকের চক্রে দেশ

বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও, মাদক সংক্রান্ত অপরাধে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) তথ্য অনুযায়ী:

* মাদকের কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পাচার হয় প্রায় ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা।

* মাদক কেনাবেচা করে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম এবং এশিয়ায় শীর্ষে।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। এই বিশাল মাদকাসক্ত জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে দেশে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এক ভয়াবহ মাদকের বাজার তৈরি হয়েছে।

সীমান্তের নতুন বিপদ ও পাচারের অভিনব কৌশল

দেশের ভেতর পাচার হওয়া মাদকের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। গত ১৫ বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রায় ৩৮ কোটি ৭৮ লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেছে, যা প্রকৃত চিত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

বর্তমানে মিয়ানমারের পাশাপাশি ভারত থেকেও ইয়াবার বড় চালান আসছে। এই দুই সীমান্ত হয়েই দেশে ঢুকছে ইয়াবার চেয়েও ২৫-৩০ গুণ বেশি শক্তিশালী মাদক আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। সড়কপথে নজরদারি বাড়ায় কারবারিরা এখন বেছে নিয়েছে সমুদ্রপথ। ফলে উপকূলবর্তী এলাকাগুলো মাদকের নতুন ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

গত বছর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর পুলিশি ব্যবস্থা ও মাদকবিরোধী অভিযানে কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা তাদের তৎপরতা আরও বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, “পাঁচ-সাত বছর আগেও গ্রামগঞ্জের মাদক পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ছিল না। একদিকে মাদকের বিস্তার বাড়ছে, অন্যদিকে মাদকসেবীদের জন্য বিশ্বমানের চিকিৎসা বা ফলোআপের কোনো ব্যবস্থা নেই। এখনই মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে এর বিস্তার বাড়তেই থাকবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন এক বহুমুখী মাদক-সংকটের মুখে। একদিকে ইয়াবা, আইস, এলএসডি, অন্যদিকে হেরোইনের নতুন বিপদ—সব মিলিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্ম এক ভয়াল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে এই সর্বনাশা চক্র থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।