রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

গুমের শিকারদের ওপর চলত ‘ওয়াটারবোর্ডিং’, কমিশনের প্রতিবেদনে ভয়াবহ তথ্য

‘নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত’, গুম থেকে ফেরা ব্যক্তিদের বর্ণনায় ভয়াবহ নির্যাতনের তথ্য
একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৫ জুলাই ২০২৫ | ৬:০৩ অপরাহ্ন

গুমের শিকার ব্যক্তিদের ওপর গোপন বন্দিশালায় ‘ওয়াটারবোর্ডিং’-এর মতো ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো বলে তথ্য উঠে এসেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্বাস্থ্যকর সেলে আটকে রেখে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, নখ উপড়ে ফেলা, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসিয়ে ঘোরানোসহ নানা পদ্ধতিতে বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো।

গত ৪ জুন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি তুলে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৮৫০টি অভিযোগ বিশ্লেষণ করে ২৫৩ জন গুমের শিকার ব্যক্তির ওপর চালানো নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে র‌্যাবের বন্দিশালা থেকে ফিরে আসা এক তরুণের জবানবন্দি উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি ‘ওয়াটারবোর্ডিং’ নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, “মুখের ওপরে গামছা দিয়ে পানি মারা শুরু করে। জগ ভরতি করে মুখের ওপর পানি দিয়েছে। এতে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে তিন-চারবার পানি দেওয়ার পর তারা থামে।”

নির্যাতনের জন্য ঘূর্ণায়মান যন্ত্র ব্যবহারেরও একাধিক বিবরণ পাওয়া গেছে। এর একটি হলো র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) ব্যবহৃত ‘ঘূর্ণায়মান চেয়ার’, যেখানে বসিয়ে ভুক্তভোগীকে দ্রুতগতিতে ঘোরানো হতো। আরেকটি হলো প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) ব্যবহৃত আরও ভয়াবহ ‘ঘূর্ণায়মান যন্ত্র’, যা দিয়ে পুরো শরীর ঘোরানো হতো।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদ্যুতিক শক ছিল র‌্যাবের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্যাতন পদ্ধতি। এক ভুক্তভোগী জানান, প্রস্রাব করার সময় তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো।

শুধু শারীরিক নয়, বন্দীদের ওপর অমানবিক মানসিক চাপও তৈরি করা হতো। তাদের দিনের পর দিন অস্বাস্থ্যকর ও অন্ধকার সেলে বন্দী রাখা হতো, যেখানে থাকা, খাওয়া ও শৌচাগারের জায়গা ছিল একইসঙ্গে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে চলত নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, যা শৌচাগার ব্যবহারের সময়ও বন্ধ হতো না। এছাড়া, ঘুমাতে না দেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখাও ছিল মানসিক নির্যাতনের অংশ।

মুক্তি পেলেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ট্রমায় ভুগছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালে অপহৃত ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ২০ মাস পর ফিরে এলেও আর ‘স্বাভাবিক’ হতে পারেনি। তার বাবা জানান, ছেলে এখন একা একা হাসে এবং ঠিকমতো কথা বলে না।

গুম কমিশনের সদস্য মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “গুম হওয়া ব্যক্তিদের নির্যাতন সম্পর্কে আমাদের যতটুকু ধারণা ছিল, বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা না শুনলে সেটি কল্পনাও করা যাবে না। নির্যাতনের এমন কোনো পদ্ধতি ছিল না, যেটা প্রয়োগ করা হয়নি।”